মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিজেই যখন অভিভাবক

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • পাঠকের কলাম

স্বামীর সাজানো সংসারের এতদিনের মায়া ত্যাগ করে তিন কন্যার জননী রুবি বাবার সংসারে এসে আশ্রয় নেয়। তিন মেয়েকে নিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবার সংসারে এসে পড়ে। কেননা স্বামী তাকে না জানিয়ে আরেকটি বিয়ে করেছে। যে কিনা তাদেরই বাসায় কাজ করত। কাজের মেয়েই আজ তার বউ। এ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে অগত্যা চলে আসে বাবার সংসারে। ছোট দুই ভাই, দুই বোন ও মাকে নিয়ে ছয়জনের সংসার। তার ওপর রুবি তিন মেয়েকে নিয়ে উঠেছে। তাই বাবার সংসারে ঢুকেই সমস্ত কাজের বোঝা কাঁধে তুলে নেয়। দিন-রাত হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটে। তবু দুঃখ নেই। বড় ভাইকে বলে মেয়ে তিনটিকেই স্কুলে ভর্তি করাতে পেরেছে এটাই তার পরম পাওয়া। স্বামীর ডিভোর্স লেটার হাতে নিয়ে, নিজের সুখস্বস্তিও দুরে ঠেলে তিন মেয়ের ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবার অবকাশই সে পেয়েছে। সংসার নামের এই পটভূমিতে এই যুদ্ধটুকু করার প্রয়াসই সে পেল। প্রাইমারীর পড়া শেষ হলে বড় মেয়ে নদী ও সেজো তন্বিকে ওদের চাচা এসে নিয়ে যায়। ওরাও মার ব্যথা বুঝতে পারে। কষ্ট হবে জেনেও চলে যায় চাচার সংসারে। নদী চাচার কাছে থেকে এসএসসি পাস করে। তন্বি ফুপুর কাছে থেকে এসএসসি পাস করে। রুবির কাছে থেকে যায় ছোট মেয়ে মেঘলা যদিও সে সূর্যের মতো উজ্জ্বল লাবণ্যময়ী আর সুনয়না। বাবা-মা সন্তানকে ভালবাসলেও মেয়েকে নিয়ে রুবিকে এই সংসারে অনেক লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়। নদী এইচএসসি শেষ করে মায়ের কষ্ট আর সহ্য করতে না পেরে তন্যির সঙ্গে পরামর্শ করে দু’জনে চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে আসে। অনার্সে ভর্তি হয়ে দু’জনেই পাশাপাশি কখনও কিন্ডার গার্টেন কখনও কোচিং সেন্টার আবার কখনও সেলসমেনের চাকরি শুরু করে। এভাবেই তার নিজের আয় করে ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে ছোট্ট সংসার গড়ে। এরপর মাকে বোঝাতে শুরু করে এখন তারা বড় হয়েছে নিজের রোজগারে সংসার চালাতে সক্ষম। তারা এখন মার দুখিনী মায়ের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। মাকে আর কোন কষ্ট করতে দিতে পারবে না। এতদিন পর্যন্ত মাকে আড়ালে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে দেখেছে তারা। এবার মায়ের দুঃখ ঘুচিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলে হাসি ফোটাতে চায়। নদী আর তন্যিকে দেখে তার মায়ের মনে হলো, জীবন সংসারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সে এখন ক্লান্ত। এত দিনে তার যুদ্ধের অব্যাহতি দেয়ার সময় এসেছে। মেয়ে দুটির মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখের পানি আর বাঁধ মানল না। নদী আর তন্যি তার মেয়ে নয় ছেলে। তার দুটি ছেলে রোজগাড় করে। এখন আর তার কষ্ট কিসে। সে গ্রামের সবাইকে দেখিয়ে দেবে আজ তার সেই দিন ফিরে এসেছে, যে দিনটির জন্য তার এত অপেক্ষা ছিল। যে দিনটির জন্য সে গ্রামের অশিক্ষিত, অজ্ঞ, মূর্খ, উঁচু-নিচু এমনকি ভাই ভাবিদের শত লাঞ্ছনা, আঘাত দেয়া কথা সহ্য করছে। সবাই তাকে বলেছে এত বড় বড় মেয়েদের শহরে পাঠিয়েছ কি করতে? বিয়ে দিতে পার না। ফকিরের ছেলে আর চাষার ছেলে যাই পাও বিয়ে দিতে দোষ কি? ধর্মের কাজ কর। তোমার মেঘলাও তো হাতে পায়ে কম বড় হয়নি। তিনটি বিবাহযোগ্য মেয়ে ঘরে রেখে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাও কি করে? তাও কিনা শহরে পাঠিয়ে বসে চুপচাপ আছ। তোমার সোয়ামি তো এখন ফকিরের হালে চলে। সেও তো এখন তোমার নয়, অন্যের। এমনি নানান কথা শুনে চুপ থেকেছে রুবি শুধু আজকের এই দিনটির জন্যই কি? হ্যাঁ তা-ই তো। আজ তার শ্বশুরবাড়ির মানুষরাও দেখুক সে আজ আর দুঃখিনী স্ত্রী নয়। এখন সে সন্তানের ভালবাসার পরশে পরম সুখী মাতা। ছোট মেয়েকে নিয়ে তাই রুবি পারি জমায় শহরে, একটি ভাড়া বাসায়, যেখানে তার দুই মেয়ে ছোট্ট সংসার পেতেছে। অনেক কষ্টের পর আজ আবার নিজের একটি সংসারের মুখ দেখতে পেল। তার স্বামী যে সংসার তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল, আজ তার মেয়ে তাকে আবার সেই সংসার উপহার দিল। তবে এখানে স্বামী আর তার অভিভাবক নন। এখানে তিন মেয়ের অভিভাবক সে নিজে।

এলিজা ইসরাত

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: