হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলা মায়ের বীরকন্যারা

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • রুখসানা কাজল

পিরোজপুর। বরিশাল। ১৯৭১, জুনের কোন একদিন। মহাদেবের জটা থেকে জন্ম হয়নি এই সাহসী নারী ভাগীরথীর। এই বিধবা এক সন্তানের জননী ভাগীরথীর জন্ম বরিশালের পিরোজপুরে। রাজাকারদের সহায়তায় তাকে ধর্ষণ করে পাকিস্তানী শয়তানরা। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠেছিল বাংলা মায়ের এই মেয়ে। মৃত্যু সুনিশ্চিত জেনেও ধর্ষিত ভাগীরথী মাতৃভূমির শত্রুদের মেরে মরার পণ করে।

পাকিস্তানী হানাদারদের সঙ্গে ভাব করে জুনের কোন একদিন ৪৫ জনের একটি গ্রুপকে দাওয়াত করে নিয়ে আসে তার গ্রাম বাগমারা কদমতলীতে। তৈরি ছিল মুক্তিবাহিনী। বুলেটের ক্ষত নিয়ে ক্যাম্পে ফিরে যেতে পেরেছিল মাত্র ৪/৫ জন পাকিস্তানী সৈন্য। পাকিস্তানী হানাদার আর দেশীয় রাজাকাররা বুঝেছিল কার কাজ। পলাতক ভাগীরথীকে ধরে দেয়ার জন্য এক হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ধরা পড়ে ভাগীরথী। রাজাকাররা তাকে নিয়ে আসে পিরোজপুর সামরিক ক্যাম্পে।

হাটবারের দিন শহরের চৌমাথায় উলঙ্গ করে দুটি পা সামরিক জীপের সঙ্গে বেঁধে নির্লজ্জ মহা উৎসবে সমস্ত শহরজুড়ে ভাগীরথীকে টেনে বেড়াল পাকিস্তানী হানাদাররা। এক ঘণ্টা পরে চৌমাথায় ফিরে এসে দেখে তখনও বেঁচে আছে ভাগীরথী। এবার নরপশুরা আরও উন্মত্ত উল্লাসে দুটি পা দুটি জীপের সঙ্গে বেঁধে চালিয়ে দিল উল্টো দিকে। দু টুকরো হয়ে গেল ভাগীরথী। টুকরো দেহাংশ দুটি নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে আবার চৌমাথায় ফেলে রেখে গেল ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ভাগীরথীকে। বাংলামায়ের বীরকন্যার দেহ আস্তে আস্তে মাটি হয়ে মিশে গেল বাংলা মায়ের বুকের সঙ্গে।

ভয় কি বাংলাদেশ

এবার চেনা যুদ্ধে চেনা মানুষ।

চেনা পথে চেনা আঘাত!

ভাগীরথীরা পেরেছে। আমরাও পারব সুনিশ্চিত।

কুড়িগ্রাম। ১৯৭১ সাল। শংকর মাধবপুরের ১১ নং সেক্টরের মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প। সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের বীর উত্তম।

দেশেজুড়ে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। কুড়িগ্রাম জেলার শংকর মাধবপুরের তের কি চৌদ্দ বছর বয়সের এক সাহসী কিশোরী পাশের গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের গৃহস্থালি কাজে সাহায্য করার জন্য। যে হাতে কিশোরী রান্নার কাজ করেছে সেই হাতই তুলে নেয় অস্ত্র। শক্তিমতি মেয়ের সাহসে মুগ্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধা হাবিলদার মুহিব অস্ত্র চালানোর ট্রেনিংয়ের সঙ্গে দেশকে শত্রুমুক্ত করার শপথ দেয়। তারামন ১১ নং সেক্টরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের সঙ্গে সমান পারদর্শিতায় লড়াই করে। কুড়িগ্রাম জেলার নদী-তীরবর্তী অঞ্চল মোহনগঞ্জ, তারাবর, কোদালকাটি ও গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়িতে অগ্রবর্তী দলের হয়ে কয়েকটি সশস্ত্র যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন।

কেবল যুদ্ধ করেই এই কিশোরী ক্ষান্ত হয়নি। রাজিবপুর খাড়িয়াভাঙ্গা ও ভেলামারি খাল এলাকায় ভিখেরী, পাগল, পঙ্গুর সাজে গোয়েন্দাগিরি করে পাকিস্তানী শত্রুদের সঠিক অবস্থান এনে দিত মুক্তিযোদ্ধাদের। কতখানি রণকৌশলী জ্ঞান থাকলে ওই এতটুকু মেয়ে এমন অসম সাহসী কাজ করতে পারে ভাবা যায়! ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবির এই দৃপ্ত সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

ভয় কি মাতৃভূমি জননী জন্মভূমি আমাদের।

এবার চেনা যুদ্ধে চেনা মানুষ।

চেনা পথে চেনা আঘাত!

আমাদের তারামন পেরেছে। আমরাও পারব।

কিশোরগঞ্জ জেলার ইসরাইল মঞ্জিল। ১৯৭১।

এই পরিবারের সেতারা বেগম নামের মেয়েটি সবেমাত্র পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ডাক্তারী কোরে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দিয়েছে। বড় ভাই এবং ছোট ভাইও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত। তিন ভাই বোনই সমস্ত পিছুটান আর ভয়কে তুড়ি মেরে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে কমান্ডিং অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাঁচশত বেডের এই হাসপাতালটি সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত ছিল। যে সময়ে সামরিক বাহিনীর অনেকেই ভয়ে নির্লিপ্ত ছিল সেই সময়ে এই নারী সবরকমের বিপদকে অগ্রাহ্য করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন। প্রতিদিন আহত রক্তাক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের হাহাকারের ভেতরে সাহসের অগ্নিপ্রদীপ হয়ে ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম তাদের সুস্থ করে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য ফের রণাঙ্গনে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম বীর প্রতীক। আমাদের আলোকস্তম্ভ।

ভয় নেই বাংলাদেশ। জননী জন্মভূমি।

এক সেতারার প্রেরণা থেকে হাজার সেতারার জন্ম হবে, ভয় নেই মা।

পাবনা। ১৯৭১। ২৫ মার্চ তারিখেই পাকিস্তানী বাহিনী ঢুকে পড়ে শহরে। প্রতিরোধ গড়ে ওঠে শহরের ঘরে ঘরে। মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। হাতা, খুন্তি, ছুরি , দা, কুড়াল, বটি, গরম জল নিয়ে প্রস্তুত পাবনা শহরের নারীরা। তাদের প্রতিজ্ঞা, মেরে তবে মরবো। এক সময় প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে । পাকিস্তান বাহিনী দখল করে নেয় শহর। সেই সময় পাবনার দুই সাহসী মায়ের সন্তানেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ছুটে গেছে রণাঙ্গনে। এর মধ্যে একজন মেয়ে। পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী শিরিন বানু মিতিল। দেশমাতৃকার বিজয় ছিনিয়ে আনতে ভাইদের সঙ্গে ছেলেদের পোশাক পরে রণাঙ্গনে ছুটে গিয়েছে শিরীন। আকাশ বাণী থেকে এই অসম সাহসী নারীর কথা প্রচার করা হয়েছে বার বার। অনুপ্রেরণায় উদ্বেল হয়ে উঠেছে মুক্তিকামী বাঙালী। আছে আছে আমাদের অমিত তেজি ছেলে সন্তানের পাশে আমাদের অমিত সাহসিনী কন্যারা আছে।

ভয় কি স্বদেশ আমার।

যতবার প্রয়োজন হবে আমরা রুখে দাঁড়াবোই।

যুদ্ধ ত অচেনা নয় তোমার সন্তানদের কাছে।

কাঁকন হেঞ্চিলিয়াত। খাসিয়া নারী। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের সাহসী মেয়ে কাঁকন। কাঁকন আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বলিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দুরিনটিলা, আধারটিলাসহ প্রায় নয়টি সন্মুখযুদ্ধে তিনি অংশ নেন। ধরা পড়ে পাশবিক অত্যাচারের শিকার হয়ে, নারীত্বের চরম অবমাননায় ধর্ষিত লুণ্ঠিত হয়েও ভেঙ্গে পড়েননি কাঁকন। কমান্ডার মীর শওকত আলীর নির্দেশে বেছে নেন গুপ্তচরবৃত্তি। আবার ধরা পড়ে অমানবিক অত্যাচারে মৃত ভেবে রাস্তায় ফেলে যায় শত্রুরা। কিন্তু না বেঁচে উঠে খাসিয়া কন্যা কাঁকন। বার বার মৃত্যুর মুখে গিয়ে দেশ রক্ষার জন্য তিনি উঠে দাঁড়িয়েছে। কোন ভয় বা পুরস্কার পাওয়ার জন্য নয়। কেবল দেশের জন্য নারীর পরম ধন ইজ্জত লুটে নেওয়ার পরেও কাঁকন মুক্তিযুদ্ধ করেছে। এই দেশ বাঁচলে কাঁকনের সম্প্রদায় খাসিয়ারাও স্বাধীন স্বদেশ পাবে। দেশ তো সবার। একই মায়ের সন্তান সবাই।

টাঙ্গাইল, মধুপুরের জানজালিয়া গ্রামের সন্ধ্যা রাণী সাংমা মৃত। ১৯৭১ এ নার্সিং পড়ছেন হালুয়াঘাট জয়রামকুড়া মিশনারী হাসপাতালে। সেই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার ডাঃ প্রেমাংকুর রায় এবং ক্যাপ্টেন আব্দুল মান্নান ১১ নম্বর সেক্টরে ৪৫ শয্যার একটি অস্থায়ী বাঁশের বেড়ার হাসপাতাল গঠন করেন। পাকিস্তানী শয়তানদের ভয়ে সন্ধ্যারাণীরা তখন ভারতের মেঘালয়ে শরণার্থী। ডাঃ প্রেমাংকুরের আহ্বানে সন্ধ্যা খালাতো বোনসহ হাসপাতালের মেডিকেল ও সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় যোগ দেন। সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি বলতে ছিল ছুরি, কাঁথাসেলাইয়ের সুঁচ, দাড়ি কাটার কাঁচি। চিকিৎসার জন্য রাতে ভরসা ছিল কেবল হারিকেন বা টর্চলাইট। দেশের সেবা ছাড়া সেই সময় আর কিছুই ছিল না সন্ধ্যা রানীর মনে।

এমন মেয়ে যার আছে সে মায়ের ভয় কি মাগো!

যে শত্রুই আসুক ঘরের কিংবা পরের তোমার মেয়েরা তাকে তোমার বুকে ঠাঁই দেবে না।

এই সাহস রাখো জননী জন্মভূমি গরবিনী মা আমার।

ঢাকা, এলিফ্যান্ট রোড। ১৯৭১। ছেলে রুমি মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছে। মা জাহানারা ঈমাম বুকে পাষাণ বেঁধে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন, যা রুমি, তোকে দেশ মায়ের রক্ষার জন্য কোরবানী দিলাম। মায়ের কথা মিথ্যে হয়নি। রুমি শহীদ হয়ে হাজার লক্ষ শহীদের সঙ্গে মিশে আছে এই মাটির বুকে। এমন মা যে দেশের মাটিতে জন্ম নেয় বলতে পারিস আমার মা, মাট্,ি মাতৃভূমি তোর কিসের ভয়? তোর দুই লক্ষ মেয়ে লড়েছে তাদের নারীত্বের চরম ধনকে বিসর্জন দিয়ে। ওদের কি আমরা চিনি না? রাজাকার, আলবদর, আল শামসদের তো আমরা যুগে যুগে জানি চিনি। যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে মা, বোন, মেয়ে, স্ত্রীর ইজ্জতের সঙ্গে দেশ মাকে বিক্রি করে বেঁচে থাকে বেহায়ার মতো! ভয় নেই মধুক্ষরা প্রিয় মা আমাদের।

ভয় নেই। প্রীতিলতা, ইলা মিত্র, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালের এই সাহসী মানসকন্যাদের মতো আরও কত শত কন্যাশ্রী আছে তোমার! তোমার ছায়ায় তোমার মায়ায় বেড়ে ওঠা তোমার মেয়েরা তোমার মান রাখবেই। এই স্বাধীন দেশে আবারও ঘরের শত্রুদের সঙ্গে মার এই মেয়েরা বীরের মতো লড়তে প্রস্তুত হচ্ছে । ভয় পেও না জননী মাতৃভূমি আমার।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: