রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইছামতির কোলে

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • বিকাশ কুজুর

অপূর্ব সুন্দর এদেশের নদীগুলোর নামও অপূর্ব। তেমনি একটি নদী ইছামতি। ঢাকা জেলার প্রান্ত সীমানা দিয়ে বয়ে চলা এ নদীটি বহু বছরের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সাক্ষী। পূর্বে নদীটি ছিল খুবই খরস্রোতা কিন্তু দেশের অন্য নদীর মতোই এটি ক্রমে ম্রিয়মাণ। অথচ এ নদীর তীরেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী গীর্জা, পর্তুগীজ বণিকদের রেখে যাওয়া পদচিহ্ন আর শত বছরের পুরনো বান্দুরা হলিক্রশ স্কুল এ্যান্ড কলেজ, সেন্ট ইউফ্রেজি স্কুল এ্যান্ড কলেজ এবং সেন্ট থেকলা হাইস্কুল এবং আরও অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান।

আমরা গত বছরের আগস্টে কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও হাসনাবাদ গীর্জার প্রধান যাজক এবং বেশকয়েকজন যুবকসহ ৪০ জনের একটি দল সকাল ৮ ঘটিকায় ঐতিহ্যবাহী বান্দুরা খেয়াঘাট থেকে নৌকাযোগে তুইতালের উদ্দেশে রওনা হই। মনের মধ্যে অনেক আগে থেকেই একটা ভিন্ন ধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম। কেননা ঢাকা শহরের কার্বন মিশ্রিত বাতাসে বসবাস করতে করতে ভুলেই গিয়েছিলাম আমাদের চিরায়ত বাংলার অপূর্ব ছবি। আমাদের নৌকার মাঝি প্রস্তুতই ছিলেন। কিন্তু আমাদের দলের কয়েকজন দেরি করায় আমরা চটজলদি রওনা হতে পারছিলাম না। অপেক্ষার প্রহর সব সময়ই পীড়াদায়ক! অবশেষে সকলে এসে পৌঁছালে মাঝি নৌকার বাঁধন খুলে দিতেই সকলের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম অন্যরকম অভিব্যক্তি। নৌকাটি বেশ গতিতে এগিয়ে চলতে লাগল কখনও বড় কচুরিপানার দলকে স্যালুট জানিয়ে পাশ কাটিয়ে, কখনও আবার প্রতিবেশী নৌকাকে পথ করে দিয়ে, আবার কখনও জেলের মাছ ধরার একাগ্র নিমগ্নতাকে ভেঙে। ফুরফুরে হাওয়া এসে গায়ে লাগছিল। নদীর পানির নিজস্ব আদিম এক গন্ধ এসে নাকে এসে ঠেকছিল।

নষ্টালজিয়ারা আমাকে তাড়া করছিল। বার বার ফিরে যাচ্ছিলাম শৈশবে। আহ! মাঠ দাবড়ে বেড়ানো সেই দিনগুলো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে সাঁতরানো, লাফালাফি, ঝাঁপাঝাঁপি করার দুরন্তপনা কতই না নির্মল ছিল! অথচ বর্তমান আইটি যুগে সেই নির্মলতা যেন বিস্মৃত হতে চলেছে। নদীর মাঝ দিয়ে চলতে চলতে চোখে পড়ছিল সাদা শাঁখা পরা গ্রাম্যবধূর প্রাতঃস্নানের অপূর্ব স্নিগ্ধতা, স্রষ্টাকে স্মরণের এক পরম মাহেন্দ্রক্ষণ। নদীর ঘাটে বধূ-কিশোরীদের থালা-বাটি ধোওয়ার বহু পুরনো দৃশ্য দেখে সত্যিই মনে হচ্ছিল এ আমাদের বাংলাদেশ, এ আমাদের পরিচয়, এটাই আমরা। হঠাৎ চোখে পড়ল চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর পুরনো একটি মসজিদ। নদীতে বিলীন হবার শঙ্কায়। কিন্তু এলাকাবাসীর চেষ্টায় আপাতত বোধহয় শঙ্কামুক্ত। দেখেই বোঝা যায় এটি যথেষ্ট পুরনো, নির্মাণশৈলীও অনেকটা মোঘল ধাঁচের। কিন্তু এলকাটির নাম জানা গেল না।

হঠাৎ তাকিয়ে দেখি সামনে বড় বড় কচুরিপানার বিশাল এক শ্রেণী। দেখে মনে হচ্ছিল মহান সম্রাট আলেকজান্ডার বোধহয় বিশাল এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আমাদের দিকে তেড়ে আসছেন। দক্ষ মাঝি সেই বিশাল কচুরির দল ভেদ করে যখন এগিয়ে চলছিলেন তখন হঠাৎ কচুরিপানার ভেতর থেকে শৈশবে দেখা অতি পরিচিত একটি পাখি আমাদের উদ্দেশ্যে কী যেন বলতে বলতে উড়ে চলল। ওহ! ডিস্টার্ব করলাম বোধহয়! অবশেষে আমরা এসে ভিড়লাম তুইতাল ঘাটে। নৌকা থেকে নেমেই দেখি একটি ছোট্ট গ্রাম্যবাজার। নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠা হোটেলে গরম গরম এক কাপ চা খাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। ধোঁয়া-ওঠা কাপে চুমুক দিতেই প্রাণ জুড়িয়ে গেল। কনডেন্স মিল্ক ও গুঁড়া দুধের চা খেতে খেতে ভুলেই গিয়েছিলাম চায়ের আসল স্বাদ।

যাই হোক, তুইতালে আমরা ‘নেতৃত্ব ও যুব নৈতিকতা’ শীর্ষক কর্মশালায় অংশ নেই। বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও অনেক যুবক-যুবতী সেখানে অংশ নিয়েছিল। কর্মশালা শেষে দুপুরের আহার সেরে আমরা আবার ফিরতি পথে। তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। ফিরতি পথে নানা রকম হাস্যরসে ডুবে ছিলাম বলে ফিরে চলার বেদনা ভুলেছিলাম। এক সময় আমাদের একজন মাঝিকে জিজ্ঞেস করল, তার নৌকার ক্যাপাসিটি কত। তখন আরেকজন স্বপ্রণোদিত হয়ে বলল, ৪০ জিবি। আর সঙ্গে সঙ্গে সকলে হেসে উঠল। বুঝলাম, ডিজিটাল যুগে প্রকাশভঙ্গিও ডিজিটাল হয়ে পড়ছে। এক সময় দূর থেকে আমাদের খেয়াঘাট দেখা যেতে লাগল। আর এতে বিদায়ের সুর যেন সকলের হৃদয়েই বাজতে শুরু করল। আমরা নৌকা থেকে নেমে পরস্পরকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে আপন আপন গন্তব্যে পা বাড়ালাম।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: