কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

উত্তর ইরাকের বিচিত্র রূপ

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে বেশ দূরের পথ উত্তরের কিরকুক প্রাদেশিক শহরের দিকে এগুতেই এক আলাদা অনুভূতি মনকে দোলা দিতে থাকে। পথে সামান্য কিছু মরু অঞ্চলের পাশাপাশি সবুজ গাছপালা ভরা বিস্তীর্ণ এলাকা চোখে পড়ে। বাসের জানালার কাঁচ গলিয়ে দেখা প্রাকৃতিক পরিবেশ যেন সবই আলাদা মনে হয়। সমতল ভূমি থেকে গাড়ির চাকা ক্রমশ উঠতে থাকে ওপরের দিকে। ছোটবড় পাহাড় আর সবুজের সমারোহ উত্তর ইরাকের শহরগুলোকে করে তুলেছে মোহনীয়। কিরকুক উত্তর ইরাকের তেল সমৃদ্ধ সবচেয়ে বড় প্রদেশ। উত্তর ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত এ শহরগুলো দেখতে মনোরম। মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশের কথা মনে হলে চোখের সামনে যেমন ধূধূ মরুভূমির চিত্র ভেসে ওঠে গোটা ইরাক আসলে তেমনটি নয়। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে এর সত্যতা অনুভব করা যায়। বসরাসহ ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের বেশকিছু অংশজুড়ে মরুভূমি থাকলেও বাগদাদ থেকে শুরু করে সারা উত্তর ইরাকজুড়ে রয়েছে প্রচুর সবুজে ঘেরা পাহাড়, নানাবিধ গাছপালা। কিরকুক, মসুল, আরবিল, সুলেমানিয়া এবং দুহকের মতো শহরগুলো মূলত সবুজেঘেরা। সেখানে পাহাড়ও রয়েছে অনেক। পাহাড় বেয়ে আসা ঝরনা ধারার অপরূপ দৃশ্য দেখলে মন জুড়িয়ে যায় মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটিতে। আরবিলের ‘গালিয়ালি বেগ’ ও ‘বেখাল’ নামের বিখ্যাত দুটি ঝরনা ধারার শীতল পরশ পেতে সেখানে সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। শীতকালে বেশ ঠা-া আবহাওয়া থাকে উত্তর ইরাকের শহরগুলোতে। বৃষ্টি পড়ে শীত মওশুমে। বিদেশের মাটিতে বরফ পড়ার দৃশ্য দেখার আনন্দ আমি সর্বপ্রথম ইরাকের আরবিলের তকতক গ্রামে বসে অনুভব করি। কাজের প্রয়োজনে আমি সেখানে থাকতাম মাটির একটি ছোট্ট এক ঘরে। সেখানে অবশ্য রুম হিটার থেকে শুরু করে আধুনিক জীবনযাপনের সকল উপকরণই ছিল। এক সকালে পাহাড়ের চূড়ায় সাদা পেজা তুলার মতো বরফ দেখে চমকে উঠেছিলাম। মনে এক রকম শিহরণ জেগেছিল। পরে ইউরোপ, আমেরিকার এতো বরফ দেখেও তেমন অনুভূতি জাগেনি।

সত্তর দশকের শেষদিকে ইরাকের সুবর্ণ সময়ে সেখানে চাকরি করতে গিয়ে সমৃদ্ধ, ঐতিহাসিক ইরাক সম্বন্ধে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানুষজন সবই যেন একটু আলাদা। সবুজ শ্যামল গাছপালা আর নানা ধরনের ফলের বাগানের মাঝে কখনও বা তেলকূপ থেকে বেরুনো গনগনে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে বিস্মিত হতে হয়। কিরকুকসহ উত্তর ইরাকের বেশ ক’টি শহরে রয়েছে সবচেয়ে বড় অনেকগুলো ওয়েল-ফিল্ড। ইরাক সরকারের ’রোডস’ এবং ’অয়েল’ মন্ত্রণালয় দুটিতে কাজ করার সুবাদে প্রায় সারা ইরাক ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার মতো সুযোগও ছিল প্রচুর। তাই আরবি ও কুর্দি ভাষাও অতি সহজে রপ্ত করে ফেলেছিলাম। বিদেশী ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারলে সে দেশের মানুষের সহজে প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠা যায়। উত্তর ইরাকের মানুষজনের একটি বিশাল অংশ কুর্দি। কুর্দিদের সহজেই অন্যান্য ইরাকীদের থেকে আলাদা করা যায়। কুর্দিদের ভাষা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাওয়া-দাওয়া সবকিছুতে রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। কুর্দি ভাষার সঙ্গে আরবির কোন মিল নেই। কুর্দিরা প্রয়োজন ছাড়া সহজে আরবিতে কথা বলতে চায় না। কুর্দি এলাকা ছেড়ে সহজে যেতে চায় না ইরাকের অন্য প্রান্তে। কুর্দি পুরুষরা ঢিলেঢালা জামাকে ডোলা পায়জামার মাঝে ঢুকিয়ে কোমরে একটি বিশাল কাপড় বেল্টের মতো করে জড়িয়ে রাখে। মাথায় বাঁধে বড় পাগড়ি। কুর্দি নারীরা বর্ণালি জামা-পায়জামা এবং ওড়না পরে, মাথা বেঁধে রাখে এক টুকরো রঙ্গীন কাপড়ে। কুর্দি মেয়েরা দেখতেও ভারি সুন্দর। ওরা লিঙ্গনির্বিশেষে মাঠে-ঘাটে সব ধরনের কাজ করে থাকে। কৃষি কাজ থেকে শুরু করে মেষ চড়ানো এসবের কিছুই বাদ যায় না। দক্ষিণাঞ্চলের ইরাকী আরবীয়দের চেয়ে কুর্দিরা বেশি পরিশ্রমী। কুর্দি ভাষার কিছু শব্দের সঙ্গে বাংলা শব্দের মিল রয়েছে। আরবির চেয়ে কুর্দিভাষা রপ্ত করা অনেক সহজ। উত্তর ইরাকের অনেক স্কুলে কুর্দি ভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া চলে। কুর্দি ভাষার ওপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণও সম্ভব।

ইরাকের পাহাড়ি অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে গাড়ির পাশাপাশি ঘোড়া ও গাধাকে মানুষ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হয়। পাহাড়ের গায়ে চাষ করা হয় শাক-সবজি এবং ফলমূল। ঝরনা বয়ে আসা স্বচ্ছ শীতল জল যখন সমভূমিতে গড়ায়, তখন সেখানে মেলে হরেক রকমের মাছ। আর ছাগল, ভেড়া, দুম্বা চড়ানো, মুরগি পোষা ইরাকের গ্রামীণ জনপদের মানুষের অন্যতম প্রধান কাজ। বিদেশী অতিথি পেলেই পাহাড়ি ঝরনার ঠা-া জল দিয়ে প্রথমেই শুরু হয় অভ্যর্থনা। এরপর আপ্যায়ন করা হয় ভাজা মুরগি, মাছ, ভাত, রুটি, খাঁটি দুধের তৈরি দই, বাগানের মিষ্টি তরমুজ, আঙ্গুর, মাল্টা আরও কত কী দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে চলে উন্নত সুগন্ধি চা পানের পর্ব। ইরাকীদের আতিথেয়তাকে এত সহজে ভুলে যাবে কে! আর অতিথি ভিনদেশী, এবং বিশ্বাসভাজন হলে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে একেবারে অন্দর মহলে। সেখানে বিশাল এক প্লেটে পরিবারের সকলের সঙ্গে কার্পেট বিছানো মেঝেতে আয়েশের সঙ্গে বসে মিলেমিশে খাওয়ার মতো দুর্লভ সুযোগটি মিলবে। হয়ত খাঁটি ঘিয়ে ভাজা একটি আস্ত বিশাল দুম্বার রোস্ট এনে হাজির করা হবে অতিথির সামনে। দুম্বার পেটের ভেতরে থেকে মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে পেস্তা, বাদাম, কিসমিসে ভরা ঝরঝরে পোলাও। বাংলাদেশীদের প্রতি ইরাকীদের আলাদা একটা মমত্ববোধ ছিল। কাজকর্ম শেষে প্রায়ই পাহাড়ের পাশ ধরে রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। ইরাকীরা তখনও আমাকে ভারতীয় বলেই মনে করে। তবু কৌতূহলবশত সম্ভবত একদিন এক ভদ্রলোক আমার পরিচয় জানতে চান। আমি আমার সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মাতৃভূমি বাংলাদেশের নাম বলতে উনি যা ব্যক্ত করেন তাতে লজ্জায় মাথা নুয়ে যায়। উনি জানতে চান আমি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সেই দেশের মানুষ কি না যেখানে তাদেরই কেউ জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমি কি বলব ভেবে পাইনি। সেদিনের দুঃখ আর লজ্জার কথা আজও আমি ভুলিনি।

সত্তর-আশির দশকে আমার দেখা সমৃদ্ধ, পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন দজলা, ফোরাত বিধৌত ইরাক আজও আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। পুরনো ধাঁচের স্থাপত্যে গড়া বেশিরভাগ ভবন, পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, সাজানো-গোছানো দোকানপাট যেন এক বিস্ময়। সেখানে কেউ খাবারে ভেজাল মেশায় না। ওজনে কম দিয়ে ক্রেতা ঠকায় না। সাধারণ মানুষ দিন কাটায় পরম হাসিখুশিতে। বিশেষ করে কঠোর আইনশৃঙ্খলা, আইন পালনে মানুষের শ্রদ্ধাবোধ আমাকে মুগ্ধ করেছে। দেশের কোথাও চুরি-ডাকাতি নেই। দরজা খোলা থাকে দোকানপাটে। নিশ্চিন্তে ঘুমায় দেশের জনগণ। সারা ইরাকজুড়ে বেঁধে দেয়া মূল্যে পণ্যসামগ্রী বিপণনের বিরল দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে আমি কোথাও দেখিনি।

আমার স্বপ্নের দেশ ইরাক অর্থ-বিত্তে আর আগের মতো নেই। রাজনীতির কূটচালে আজ বিদগ্ধ ইরাকের নির্দোষ, অসহায় সাধারণ মানুষ। সেখানকার ঘরবাড়ি, দোকাপাট, এমনকি সাধারণ মানুষেরও চেহারাও যেন আজ পাল্টে গেছে। বোমা, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত অসংখ্য ইরাকী জনগণ। ঘরবাড়িতে জ্বলছে আগুন। প্রতিদিন সহিংসতায় শতশত লোক মারা যাচ্ছে ইরাকের বিভিন্ন শহরে। সবকিছু পরিণত হয়েছে ধ্বসস্তূপে। বিধ্বস্ত ইরাকের মুদ্রা দিনারের মূল্যমান কমেছে অনেক। জিনিসপত্রের দাম আজ অকাশছোঁয়া। সেখানে সাধারণ মানুষের অভাব-অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় কাজ করতে গিয়ে একজন ইরাকী প্রকৌশলীর কাছে তাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা শুনে আমার মন দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে গেছে। একজন উঁচুমাপের প্রকৌশলী হয়েও একটি যেনতেন পদে কাজ করতে এসেছেন বিদেশ বিভূঁইয়ে। অথচ তার দেশে চাকরি নিয়ে গেছে পৃথিবীর কত দেশের মানুষ। মালয়েশিয়ায় চাকরির বেতনের সামান্য বাঁচিয়ে তা দিয়ে কিছু ডলার নিয়ে দেশে যেতে পারলে তার বিনিময়ে অনেকগুলো ইরাকী দিনার মিলবে। তাতে বেশকিছু দিন চলে যাবে তার পরিবারের ভরণপোষণ। এতকিছুর পরও তার স্বপ্ন আবার সুযোগ পেলে ঘুরে দাঁড়াবে তার দেশ। গড়ে উঠবে স্বপ্নের ইরাক। দজলা, ফোরাতে টলটলে জল বইবে। আলোয় ঝলমল করবে গোটা দেশ। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমি তাকে বলি, আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় তোমাদের দেশে। দেখতে চাই কেমন হয়ে গেছে আমার স্মৃতির শহর বাগদাদ, কিরকুক। হাজারো স্মৃতিচিহ্ন আঁকা জনপদ। একবার বড্ড দেখতে মন চায় সেখানকার অন্তরঙ্গ মানুষগুলোর চেহারা, আমার সেই প্রিয় চিকিৎসকের সুন্দর মুখচ্ছবি। সত্যি কি তিনি বেঁচে আছেন। আজ দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত ইরাকের সংবাদ শুনি, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, আমার একান্ত পরিচিত জনপদের ছবি দেখি, আমার বিদীর্ণ মন কেঁদে ফেটে পড়ে ক্ষোভে, দুঃখ-বেদনায়। বোমা, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত অসংখ্য মানুষের ভিড়ে আমার ইরাকী আপনজন, বন্ধুবান্ধবের মুখ খুঁজে ফিরি। একই দেশের মানুষের আঞ্চলিক বিভেদ ভেঙ্গে দিয়েছে ওদের দীর্ঘকাল ধরে গড়েওঠা সামাজিক বন্ধন। একই ধর্মের মানুষের মাঝে নানা মতোবিরোধ নষ্ট করে দিয়েছে মানবিক মূল্যবোধ। মানুষের মাঝে জন্ম নেয়া বিভিন্ন মতাদর্শের বিভেদ কেমন বিপাকে ফেলে দিয়েছে সাধারণ মানুষগুলোকে। গোটা সামাজিক পরিস্থিতিকে করে তুলেছে অশান্ত। ভেঙ্গে টুকরো হয়ে গেছে দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ, প্রাচীন সভ্যতা। ভাবি, আর কি কোনদিন ইরাক ফিরে পাবে তার আগের রূপ। ঐতিহ্যবাহী ইরাকের প্রাচীন সভ্যতার আলো জ্বলে উঠবে, ফিরিয়ে দেবে মানুষের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আর মানবিক মূল্যবোধ। শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে দজলা, ফোরাত বিধৌত আরবের সুন্দর দেশটি।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: