মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

স্বাধীনতার শত্রু-মিত্র

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

স্বাধীনতা বুদ্ধির ব্যাপার নয়। স্বাধীনতা মনের ও মেজাজের ব্যাপার। ইতিহাসে যদি প্রমাণ খোঁজা হয় যে স্বাধীনতা মানুষের প্রগতির একমাত্র পথ, তাহলে ব্যর্থ হতে বাধ্য। বাস্তব যে, ইতিহাসের নজির খুঁজে কিছুই প্রমাণ করা চলে না। ইতিহাসের কোন যুক্তি বা ছক নেই। কোন ঘটনা একবার কিংবা অনেকবার ঘটেছে, অতএব আবার ঘটবে-এই বক্তব্য যুক্তিগ্রাহ্য নয়। একই কারণ ইতিহাসে একই ফল নাও আনতে পারে। যারা ইতিহাসের আইনে বিশ্বাস করেন তাঁরা মূলত স্বাধীনতার শত্রু। তলিয়ে দেখলে, স্বাধীনতার প্রত্যয় মানুষের আত্মসম্মানের অনুভূতি। আত্মসম্মানজ্ঞানসম্পন্ন মানুষমাত্রেই কিছু কিছু অধিকার দাবি করবেন, অন্যকে দেবেন না এমনটি হওয়া উচিত নয়। সেজন্য আত্মসম্মানবোধ থেকে মানুষের মর্যাদা, ব্যক্তির অধিকার এবং সমাজে স্বাধীনতার প্রত্যয় জন্মায়। সমাজভেদে স্বাধীনতা এবং অধিকারের বোধ পাল্টায়। অবশ্য আধুনিক স্বাধীনতা বিশ্বজনীন হয়েছে। কার্যকর হচ্ছে কি না সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু বিভিন্ন সংস্কৃতিতেই একই স্বাধীনতা আজ স্বীকৃত। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতি দৃঢ় হয়। মানুষের মর্যাদা এবং শিক্ষার প্রয়োজন, এই দুই বস্তু স্বাধীনতাকে আধুনিক মানুষের মনে ধরে রেখেছে। সমাজ পাল্টালেও স্বাধীনতার ইচ্ছা যথারীতি থেকে যায়। স্বাধীনতার আচরণবিধিতে থাকা দরকার মানুষকে মানুষ বলে স্বীকার ও মর্যাদাদান। সমাজ জীবনে, দৈনন্দিন ব্যবহারে এই দুটি প্রত্যয় যদি ফুটে ওঠে, তাহলে নির্বাচনে চাতুরি বা রাজনৈতিক পটুত্বে রাষ্ট্রচালনা সম্ভব হবে না। স্বাধীনতা যেহেতু মানুষের মেজাজে থাকে, সেজন্য আইন করে স্বাধীনতা সৃষ্টি করা চলে না। আত্মসম্মান যদি না থাকে তবে স্বাধীনতার বোধ আসতে পারে না। সত্তরের নির্বাচন বাঙালীর মধ্যে আত্মসম্মানবোধকে ত্বরান্বিত করেছিল বলেই স্বাধীনতার স্পৃহা জেগেছিল। বাংলাদেশের সমাজের গঠন, বাংলাদেশের ইতিহাসে,বাংলাদেশের মানুষের মনে এমন কি শেষ দুর্লঙ্ঘ বাধা রয়েছে, যার ফলে যে স্বাধীনতাকে জেনেছিলাম, সেই স্বাধীনতা মরীচিকায় পরিণত হয়েছে।

সেই মরীচিকা যখন সরানোর কাজ চলছে, তখন প্রতিবন্ধকতার বাহুগুলো আঁকড়ে ধরতে চায় কণ্ঠ। স্তব্ধ করে দিতে চায়, স্বাধীনতা শব্দটিকে। বাংলাদেশের সমাজে, মনে এবং ইতিহাসে স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি কাজ করেছে এবং কাজ করছে। অজস্র দুর্গতিতেও স্বাধীনতা আঁকড়ে থাকতে হয়। স্বাধীনতার অভিশাপ কিন্তুস্বীকার্য। অধীনতার আতঙ্কও অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীন হয়েছে রক্তের বিনিময়ে, যুদ্ধজয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বাঙালী বংশজাত একদল সশস্ত্র বিরোধিতা শুধু নয়, গণহত্যা চালিয়েছে। এরা স্বাধীনতার পর এখনও তৎপর দেশকে স্বাধীনতাহীনতায় পরিণত করার অদম্য লক্ষ্যে।

বাঙালী নামক জাতি দীর্ঘদিন পরাধীনতায় বসবাসের কারণে ক্রমশ দুর্বলচিত্তের হয়ে ওঠে। দাসত্ব মানসিকতা আর অধীনতায় জাতিটির মানসিক বিকাশে ঘাটতি রয়ে যায়। ধারণাও করতে পারেনি তারা কোনদিন স্বাধীন সত্তা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। সেই জাতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানী শাসকচক্রের চরম নির্যাতনকে রুখতে বাঙালী জনগণ ব্যাপকভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়েছিল। বিশ্ববাসী অবাক হয়েছিল, বাঙালীর উত্থানে। স্বাধীনতার মিত্ররা ক্রমশ দুর্বলতর অবস্থানে চলে যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে নানা মতভেদ তাদের একতাকে রক্ষা করতে পারেনি।

“বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে (পাকিস্তানী) সেনাবাহিনীর দখলকারীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।” বাঙালীর মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার আগে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে স্বাধীনতার কঠিন অভিযাত্রায় সর্বাত্মক লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন। এই ঘোষণার শুরুতেই উচ্চারণ করেছিলেন চূড়ান্ত বাক্যটি, “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।” বাঙালী সেদিনই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দখলদার পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। তার আগে ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানী সামরিক জান্তা সারাদেশে গণহত্যা চালায়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালী জাতি রুখে দিয়েছিল হানাদার বাহিনীকে। অর্থাৎ পাকিস্তানী বাহিনীর শেষ সেনাটিকেও আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল বাংলার মুক্তিবাহিনী। সহায়তায় পেয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীকে। পাকিস্তানী হানাদারদের সহায়তায় বাঙালী নামধারী যারা এগিয়ে গিয়েছিল, পুরো নয় মাস তারা এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান শুধু নেয়নি; হত্যা, খুন, ধর্ষণ, লুট ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের কাজও করেছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদারদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন বাহিনী, সশস্ত্র সংগঠনও। শান্তি কমিটি, আলবদর, আলশামস, মুজাহিদ বাহিনীর নামে এরা পরিচালিত হয়। জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম, পিডিপি, কেএসপি, মুসলিম লীগের দুটি গ্রুপসহ ইসলামপন্থী নামধারী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সশস্ত্র সহায়ক শক্তি হিসেবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়। প্রত্যন্ত গ্রামে তারা পথঘাট চিনিয়ে নিয়ে গেছে পাকিস্তানী বাহিনীকে। মানুষ হত্যা, লুটপাট, তা-ব, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ- সবই চালিয়েছে তারা হানাদারদের সহযোগী হয়ে। মুক্তিবাহিনীর সদস্য যত না সম্মুখসমরে শহীদ হয়েছে তার চেয়ে কম নয়, পাকিস্তানী বাহিনীর সহায়তায় রাজাকাররা হত্যা করেছে। তাদের কাছে মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছে দুষ্কৃতকারী, ভারতীয় চর। গ্রামকে গ্রাম এরা উজাড় করে দিয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে লুট, অগ্নিসংযোগ শুধু নয়, লাইনবেঁধে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছে। হিটলারের ইহুদী জাতি নিধনের মতো এরা বাঙালী হত্যার নারকীয় তা-বে মেতেছিল। এই রাজাকার আলবদররা সহযোগিতা না করলে পাকিস্তানী হানাদাররা আরও আগে দেশ ছেড়ে যেত বা আত্মসমর্পণ করত এবং এত ক্ষতি হতো না। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘর তাদের হাতে লুণ্ঠিত ও দগ্ধ হয়েছে। এদের এই বীভৎসতার শিকার থেকে পারিবারিক পাঠাগারও রেহাই পায়নি। ধর্মীয় গ্রন্থও পুড়িয়েছে। ধর্ম তখন তাদের একমাত্র বাঙালী নিধন। অর্থাৎ জল্লাদ, কসাই ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়েছিল তারা। মুক্তিবাহিনীর হাতে মরণ কামড় খাওয়ার আগে এই নরঘাতক দল দেশের সেরা সন্তান চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পী, সাংবাদিকদের বাড়ি থেকে ধরে চোখবেঁধে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন শেষে রায়ের বাজারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বেয়নেটে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। নয় মাসের প্রতিটি ঘটনাই ছিল লোমহর্ষক।

১৯৭১ সালে বাঙালী জাতি চিহ্নিত করতে পেরেছিল কে তার শত্রু, কে তার মিত্র। কিন্তু সেই শত্রুকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। আর তা হয়নি বলেই আজ চুয়াল্লিশ বছর পর সেই শত্রু নিধন প্রসঙ্গটি বাস্তব ও জরুরী হয়ে পড়েছে। আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি গুরুত্ববহ হবার কারণও রয়েছে। তারা দেখছে, তাদের পিতা, পিতামহ, ভাই, পূর্বসূরিরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে যে দেশ মুক্ত করেছে, যে পতাকা এনেছে, সে সব ক্রমশ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। দুর্ভাগ্য কিংবা ব্যর্থতা আমাদেরই, নরঘাতকরা বসেছিল ক্ষমতার সিংহাসনে এই বাংলাদেশে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়, তাদের হাতেই উত্থান ঘটে একাত্তরের পরাজিত শক্তির। গর্ত থেকে, পলাতক জীবন থেকে একে একে সব বেরিয়ে আসে। তাদের তৎপরতাটা ছিল এমন যে, ‘হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের’ ব্রতে তারা বলীয়ান। পাকিস্তান আমলের মতোই ধর্মরক্ষার লেবাসে তারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সুফলগুলো একে একে নস্যাত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা কামিয়াব হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার কাজে বেশ অগ্রসর হয়। মতলবী কুচক্রী এই পাপশক্তির স্বার্থে বার বার ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে আবহমান ‘আমরা বাংলার’ উত্তরাধিকার, বাঙালিত্বের সেক্যুলার সত্তা এবং বাঙালীর একাত্তর মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্লীন মৌল সত্য। সর্বোপরি এদেরই শকুনি আঁচড়ে বিকৃত, খ-িত করা হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্বর্ণকমল পবিত্র সংবিধান। অথচ ১৯৭১ সালের ন’মাস ধরে সংঘটিত মুক্তিযুুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর পক্ষ নিয়ে গণহত্যাসহ যাবতীয় দেশ, জাতি, জনগণ ও মানবতাবিরোধী ঘৃণ্য অপকমর্, দুষ্কর্ম, নৃশংসতায় লিপ্ত ছিল হানাদারের এ দেশীয় সহযোগী আলবদর, আলশামস, রাজাকার, মুজাহিদ বাহিনী ইত্যাকার সশস্ত্র সংগঠন। যার প্রত্যক্ষ সংগঠন ছিল পূর্বোল্লিখিত ধর্মের ধ্বজাধারী রাজনৈতিক দলগুলো। বাঙালীর ভাষা-সংস্কৃতির উপর পঁচাত্তর পরবর্তী যে আক্রমণ, তাতে এই ফিরে আসা ও আবির্ভূত ঘাতকদের ইচ্ছে ও আকাক্সক্ষার প্রকাশ শুধু নয়, একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের কাজটিও চালায়। দেশকে পাকিস্তানী কায়দায় পশ্চাৎপদ করার জন্য সর্বত্র ধর্মের জিগির তোলা হয়। ক্রমশ তা সমাজের নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের ১৯৫ জন কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রায় ৯০ হাজার পাকিস্তানী সেনা আত্মসমর্পণ করেছিল। এদিকে পাকিস্তানে আটকেপড়া ৪ লাখ বাঙালীকে দেশে ফিরিয়ে আনার কাজটিও গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। তাদের পরিবারের সদস্যরা সরকারের উপর চাপ প্রয়োগে অনশন কর্মসূচীও নেয়। বঙ্গবন্ধু সরকার পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী এদেশীয় দোসরদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসেন। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত আটটি আদেশ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। বিচার কার্যক্রমও চলছিল। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ, ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) জারি হয়। ১৯৭২ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ দালাল বিশেষ ট্রাইব্যুনালস আদেশে তিনটি সংশোধনী আনা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত সারা বাংলাদেশ থেকে এ আইনের অধীনে ৩৭ হাজার ৪৯১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। যে সব মামলা দায়ের করা হয়েছিল তার মধ্যে ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৮শ’ ৪৮টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছিল। অভিযুক্তদের মধ্যে ৭৫২ জন দোষী প্রমাণিত হয়েছিল। ২ হাজার ৯৬ জন ছাড়া পায়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর দালাল আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ মেলেনি তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিল।

তখন দেশের পরিস্থিতি এমন যে, বাংলাদেশকে ঘিরে দেশীÑবিদেশী ষড়যন্ত্র শুরু হয়। পাকিস্তান, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান থেকে তখনও সরে আসেনি। আর দেশের বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থীরা আঁটঘাট বেঁধে দেশ ও সরকারবিরোধী তৎপরতা চালায়। পরস্পর বিরোধী দাবিতে রাজপথ মুখরিত করে তোলে। কেউ চায় পাকিস্তানী সেনাদের বিচার। কেউ চায় পাকিস্তানে আটক বাঙালীদের ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি। কেউ চায় ঘাতক দালালের বিচার। আবার দালাল আইন প্রত্যাহার না করলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলবেন বলে হুমকি দিয়ে অনশনে নেমেছিলেন স্বয়ং মওলানা ভাসানী। ১৯৭৩ সালে দালাল আইন বাতিলের জন্য ভাসানী ন্যাপ, আতাউর রহমান খানের জাতীয় লীগ, সর্বোপরি নবগঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এই দলগুলোর ছত্রছায়ায় তখন স্বাধীনতাবিরোধীরা আশ্রয় নিয়েছিল। স্বচক্ষে দেখা, তারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ ও মিছিল করত। ভাসানীর প্রাচ্যবার্তা , হক কথা, অলি আহাদের ইত্তেহাদ, চীন পন্থীদের নয়াযুগ এবং গণকণ্ঠ নামে জাসদ সমর্থিত সংবাদপত্রগুলো দালালদের পক্ষাবলম্বন করে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশকে মুসলিম বাংলা, বাংলাস্তান করার দাবিও তোলে। বামপন্থী বদরউদ্দিন উমরের পিতা ইতিহাসখ্যাত আবুল হাশিমও মুসলিম বাংলার পক্ষে কলম ধরেন। অবশ্য পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাকে তাদের পক্ষাবলম্বনে বাধ্য করেছিলেন। ভাসানী ন্যাপের সাধারণ সম্পদক মশিউর রহমান যাদুমিয়া পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে দালাল আইনে গ্রেফতার হন এবং জেলে আটক থাকাবস্থায় বিচারের মুখোমুখি হন। মুসলিম লীগ, পিডিপি ইত্যাদি দলের আটক ব্যক্তিদের পরিবার ও সহকর্মীরা জাসদের পতাকার নিচে আশ্রয় নিয়ে দালাল আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তারা দালাল আইন বাতিল ও আটকদের মুক্তির দাবিতে তোপখানা রোডে সমাবেশ করত। এই দাবিতে সমাবেশ জেলা ও থানা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। এসব সমাবেশ থেকে অভিযোগ তোলা হতো এখনকার মতোই যে এই আইনের মাধ্যমে সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করছে। নিরীহ লোককে দালাল সাজিয়ে সাজা দেয়া হচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে হাঙ্গামা চালানো হয়। এদের চাপেই সম্ভবত সরকার সাধারণ ক্ষমার পদক্ষেপ নেয়। তবে সাধারণ ক্ষমার প্রেসনোটে বলা হয়েছিল, “ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা, ঘরবাড়ি অথবা জাহাজে অগ্নিসংযোগের দায়ে দণ্ডিত ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হইবে না।” সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও দালাল আইনে আটক ১১ হাজারের বেশি ব্যক্তি এসব অপরাধের দায়ে কারাগারে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।

অপরদিকে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা শুরু হয় আটকেপড়া বাঙালীদের। যুদ্ধাপরাধী ও পাকি হানাদারদের স্বদেশে ফেরার বিনিময়ে প্রত্যাগত হন তারা। তবে পাকিস্তানী সেনাদের ফেরত নেবার সময় সিমলা চুক্তিতে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার অঙ্গীকার দিয়েছিল। কিন্তু তারা তা করেনি। বঙ্গবন্ধুর সরকার পাকিস্তান ফেরত প্রায় সকল সেনা অফিসারকে পুনর্বহাল করেন। এজন্য ‘স্ক্রিনিং বোর্ড’ করা হয়। বোর্ডের সদস্যদের কাছে এরা কেউ উর্ধতন কর্মকর্তা, অধঃস্তন বা সহকর্মী ছিলেন। তাই পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য যাদের মজ্জাগত, তেমন সামরিক-বেসামরিক আমলারাও পুনর্বাসিত হলো। যাদের বাদ দেয়া হয়েছিল, তাদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকেও সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। বোর্ড সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ‘অফ’ রেখেই ঢালাও নিয়োগ দেয়ায় সমস্যা বাড়ে। মুক্তিযোদ্ধা বনাম পাকিস্তান প্রত্যাগতদের মধ্যে পদ-পদবীসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব তীব্র ও প্রকট হয়ে ওঠে। সেসব অবশ্য ইতিহাসের অংশ।

১৯৭৫ সালের পনরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধের ইতিহাস উল্টে যায়। ক্ষমতায় আসীন হবার পর সামরিক শাসকরা প্রথমেই দালাল আইন বাতিল করে। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর আইনটি বাতিলের মাধ্যমে স্বদেশী যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। সামরিক ফরমান জারির মাধ্যমে এই ঘোষণার পর যারা এই আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করেছিল সেই ভাসানী ন্যাপ, জাতীয় লীগ, গোপন বামপন্থী সশস্ত্র গ্রুপ এমনকি পলাতক মুসলিম লীগসহ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলো ক্ষমতা দখলকারীর পেছনে জড়ো হলো। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসে। দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্তদের সাজার মেয়াদ শেষ হবার আগে কারাগার থেকে বের করে এনে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন করার প্রক্রিয়া চলে। দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্তদের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীও করা হয়। পরিস্থিতি এমন যে, স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাঙালীর রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে যে স্বাভাবিক গতি প্রত্যাশিত ও দেশবাসীর স্বপ্ন ছিল তার প্রবাহে প্রথম বাধা আসে ওই ১৯৭৬ সালে। আর ১৯৭৭ সালের মধ্যে দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত ও আটকদের মুক্ত করে দেশে গণধিকৃত নরঘাতকদের পুনর্প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৭১ সালে যে জাতি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই দেশটি আবার পরাধীনতায় শুধু নয়, একাত্তরের ঘাতক দালালদের কব্জায় চলে যায়। বাঙালীর সব ইতিহাস, ঐতিহ্য ক্রমশ বিকৃত ও বিলীন হতে থাকে। যে মুক্তিযুদ্ধ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল এবং ওরা পালিয়ে গিয়েছিল, সেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরায় স্বীকৃতি শুধু নয়, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত করা হতে থাকে একাত্তরে সবচেয়ে বেশি ঘৃণ্য ভূমিকা পালনকারী জামায়াতে ইসলামীকে। স্বনামে আত্মপ্রকাশ করতে না পেরে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ নামে মাঠে নামে। শুধু তাই নয়, এই দলটিকে ১৯৭৯ সালের সাজানো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১টি আসন দেয়া হয়। স্বাধীনতাবিরোধী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলামী, পিডিপির চিহ্নিতরা সংসদে আসন পায়। আর এভাবে তারা ৩০ লাখ বাঙালী ও ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফেরানোর জন্য প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালায়। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সময়টিতে স্বাধীনতার শত্রুরা রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে সমাজের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত অবস্থান নেয়। শাসকরা তাদের পুনর্বাসনকে সুদৃঢ় করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যকে বিনষ্ট করে। এরা নানা দলে, গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বড় আঘাতটা এই সময়ে হানা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর। লোভ, মোহ, লালসা, ক্ষমতার লিপ্সা এমন পর্যায়ে যায় যে, মুক্তিযোদ্ধারাও ভুলে যায় স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে জিম্মি তারা। বরং মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবার ক্ষেত্রগুলো প্রসারিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার শত্রু-মিত্র একাকার হবার এই কলঙ্কজনক সময়গুলোতে জনগণ বিস্মিত হয়েছিল বৈকি। কিন্তু জনগণের ব্যাপক অংশ এদের মেনে নিতে পারেনি। যারা একাত্তর সালে এদের নৃশংসতা ও নির্মমতার শিকার এবং প্রত্যক্ষদর্শী তারা কোনভাবে ক্ষমা করেনি, করতে পারেনি। তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষোভগুলো গত চার দশকের বেশি সময় ধরে সঞ্চিত হতে হতে ২০১৩ সালে বিস্ফোরিত হয়ে উঠেছে। ২০১৪ ও ২০২১৫তে স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশবাসীর বিরুদ্ধে একতরফা যুদ্ধ ঘোষণা করে মানুষ হত্যা করে চলেছে। তাই দেখা যায়, একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের গোড়ায় দেশের তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতার শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করে একাত্তরের চেতনাকে সমুন্নত রেখে বেঁচে থাকার প্রাণপণ লড়াই করছে। এই দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া নয়, এ যে দীর্ঘ ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হতে থাকার মুহূর্তে এসে ঘুরে দাঁড়ানো। সেই লড়াই খুব সহজতর নয়। কিন্তু তা অব্যাহত থাকবে এই কারণে যে, এদেশের মানুষ অসীম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন স্বদেশ পেয়েছিল। যার শিখরে ছিলেন তাদেরই আরাধ্য পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি এনে দিয়েছেন তাদের একটি ভূ-খণ্ড, একটি রাষ্ট্র, একটি স্বাধীন জাতির পরিচয়। সে সব কিছু ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া সহজ সাধ্য নয়। তা পাকিস্তানীরা বুঝেছিল। শুধু বুঝতে চায় না একাত্তরের নরঘাতকরা। ওরাই স্বাধীনতার বড় শত্রু।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: