মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মৌলবাদ-জঙ্গীবাদ বিরোধী কবিতা

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

মৌলবাদী হুঙ্কারে

হায়াৎ সাইফ

কামুকের মতো প্রথমত ধক ক’রে ওঠে বুক

সমূহ অসুখ ধূপ-ধুনো সরল গরিমা যতো,

শরীরের ভাঁজে থাকে যোনি বা নিতম্বে থাকে

বাঁকে বাঁকে কোন এক বার্তা হেঁকে যায়।

বুকের কারো জন্যে করুণ কৃপায়

জমে সমূহ মৌতাত তাতে রচে কারো বৌভাত,

কারো ভ্রƒণচক্রে নড়ে চড়ে ওঠে প্রেম;

কোনো নিকষিত হেম নয় ক্রন্দনে

সফেদ চাদরে আদরে ভাদরে

এবং সাদরে ঘনিষ্ঠ আশ্বিনে কার্তিকে কখনো বা

হেমন্তের হিম বায়ু থেকে ঝরে জল,

শিশিরের ক্রমান্বিত হলাহল পরিশেষে

শ্বেত চন্দন হয়ে শোভে

রসকলি কাহার কপালে!

আর কাহার কপোল অমল ধবল হয় মাছরাঙা জলে

নীলগন্ধা স্রোতে ফোটে নীল উৎপল,

বরাভয়মুদ্রা নিয়ে থাকে বাঁকে মূল মূলাধার।

এই সব ঘোর কলরব তাহাদের লোল চর্মে

বহুতল দাম্ভিকতা আনে।

তাহার পরেও ভয়ঙ্কর দায়বদ্ধতায় থাকে কবি।

আর মৌলবাদী হুঙ্কারে আজকাল কাঁপেন ঈশ্বর।

অতএব কোথায় দোসর পাবে কবি?

ছুরি

ওমর শামস

ছুরিটা ছিন্ন হয়ে যায় - স্খলে, টলে ইব্রাহীমের টালহাত থেকে ...

কিভাবে ঝরে সেই হতোদ্যম খঞ্জর ?

মানসিক বৈকল্য, নিদ্রাহরণ নাকি জীব্রাইলের ডানার ঝাপ্টানি ?

হীম ইব্রাহীমের হাত থেকে ...

পলিতকেশ দ্যাখো নিকি তাকে?

সে না পয়গম্বর!

আর এখানে আমাদের ঘর ...

এখানে কোনো পতন নেই, এখানে কোনো ক্রন্দন নেই!

এখানে ভোজালি ঝ’রে পড়ে না বটের পাতার মতন,

পাখির পালকের মতন, সূর্যাস্তের পাটল রঙের মতন।

খঞ্জর এখন বলীয়ান ।

বরং রেখানে ছুরি, চাকু, দা, বটি, চাপয়াতি - সব

পাখা থাকুক আর না থাকুক উড্ডয়নশীল - উড়তে পারে ...

খাটের তলা থেকে, ছিকের থেকে, তোরঙ্গের ঘূর্ণি থেকে...

পাটা, পাটাতন এমন কি ঢেঁকির বুক ছিঁড়ে

বল্লম উড়ে যায় -

একে বলের মাহাত্ম্য বলাই ঠিক!

বৈরী সময়ে

সাযযাদ কাদির

কোথায় প্রাণের মেলা?

পথের মোড়ে-মোড়ে মৃত্যুর মরিয়া হানা

ঘাড়ের কাছে ঘাতকের নিঃশ্বাস

ফুটপাথে, ঘাসে রক্তাপ্লুত লাশ

সবই সদয় প্রভুর নামে

স্কুলে বাজারে

মঠ মন্দির গির্জা মসজিদে

বিহার প্যাগোডা দ্রগবা সিনাগগে

গুলি বোমা আগুন ভাঙচুর...

ছড়িয়ে ছিটকে পড়ে

ছিন্নভিন্ন শিশু বালিকা বৃদ্ধ প্রৌঢ়ার দেহ

নারী পুরুষের টুকরো-টুকরো পোড়া মাংস, হাড়...

মানবতা আজ মৃত, নিহত

সবই শান্তিধর্মের নামে

লজ্জায়, ঘৃণায় নির্বাক নিশ্চুপ থাকার সময় এ নয়

গোঁড়ামি এখন অন্ধ ও বধির

বর্ণবিদ্বেষ হননপ্রিয়

জাতিবৈরিতা নির্মূলকামী

সাম্প্রদায়িকতা রক্ত-মাতাল

ধর্মীয় মৌলবাদ চায় হত্যা বীভৎসতা

সবই করুণার প্রতিমূর্তির নামে

সন্ত্রাসের প্রেতাত্মারা আজ দেশে-দেশে

শিশুদের খেলার মাঠে

বিপণি বিতানে, পাঠাগারে, কীর্তি-নিদর্শনে

অহিংস অবতারের নামে

ইতিহাসের বুকে চেপে বসা এই হিংস্র দানো

আজ নির্মূল নিশ্চিহ্ন করতে চায় আমাদের

ওরা তাই ভাঙছে, পুড়ছে

মেতেছে খুনোখুনি হানাহানি ধর্ষণ-অত্যাচারে

গণহত্যায়, জাতি-উচ্ছেদে!

এখন কি লজ্জায়, ঘৃণায় নির্বাক নিশ্চুপ থাকার সময়?

না, আমরা মূক নই, বিমূঢ় নই

আমরা স্পষ্ট, দ্বিধাহীন!

আমি কথা বলছি, লড়ছি...

প্রতিদিন এই আমরা

হয়ে উঠছি এক থেকে অনেক

আমরা বলছি, লড়ছি...

মা তোর বদনখানি

দিলারা হাফিজ

শূন্য মেঘে বাতাস ভারী

অযথা বাড়াবাড়ি

স্বাধীন দেশের হিস্যা নিয়ে

চলছে কাড়াকাড়ি;

উপরতলার মানুষ গুলোন

যে যার মতো ভালো

চাষা-ভুষো শ্রমিক-মাঝি

তারাই শুধু কালো;

তুচ্ছতাদের জীবন যাপন

মূল্য কানাকড়ি

আসতে যেতে খাচ্ছে আগুন

স্বজন অনাহারি,

বোমার আগুন শরীর মনে

জ্বলছে দাউ দাউ

কাঁদছে দেশের বার্ন ইউনিট

কাঁদছে মাঝির নাও;

বোমার আগুন এজলাসে আজ

পুড়ছে কানুন-আইন

মলিন মুখের রাজনীতি আজ

খুঁজছে নতুন লাইন;

মা তোর বদনখানি মলিন দেখে

কাঁদছে আপন দেশ

সব ভুলে আজ পরেনে তুই

রণসজ্জার বেশ ॥

শোকগাথা

তারিক সুজাত

পতাকায় আচ্ছাদিত মুখ,

অজস্র কণ্ঠে একই গান

তবু কেন আত্মায় মর্মরিত সুরে

তোমাকে পাই না দেশ!

তোমার শিয়রে

এই পোড়া দেহখানি রাখি।

এইমাত্র আগুনে পুড়েছে যে

সে তো তোমারই সন্তান,

দু’ফোঁটা অশ্রু দাও মা

তোমার কোলে এই জন্মে যেন

আরো এক ফোঁটা বাঁচি।

২.

কোথায় আলো

এই অন্ধকার কারাগারে?

মুক্ত প্রান্তরে

ছোপ ছোপ দাগ আহত প্রহরের

এরই মাঝে

সূর্যাস্ত সূর্যোদয় ...

তুমি দেশ,

তোমাকে বিবস্ত্র করে যারা

তাদের ছদ্মবেশ যেন

উন্মোচিত হয় প্রজন্মান্তরে।

তোমার সন্তান আজ

তার প্রতিবিম্ব দেখে

রক্তমাখা ভাতে!

৩.

এখানে জন্মভূমি

আমার ঠিকানা!

উত্তরপুরুষ জেনো

এ মাটিতেই

আমাকে হত্যা করেছে

আমার স্বজাতির ভাই কোনো।

এ যেন খেলাঘরÑ

হত্যা হত্যা খেলা!

ট্রেনলাইন থেকে সন্তর্পণে

খুলে নেয়া হলো ফিশপ্লেট,

ধাবমান ট্রেনÑ

কক্ষচ্যুত নক্ষত্রের মতো

গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে অন্ধকার গহ্বরে ...

মুহূর্তেই একদল নর-নারী

মাংসপি-ের স্তূপে পরিণত হলাম,

মৃত্যুর ছায়ার নিচে দেখলাম

কালো রাজনীতির ভয়াল থাবায়

খুলে যাচ্ছে একটি জাতির মেরুদ-!

মৃত আমি নিজেকে প্রশ্ন করি

‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে’

আজও কেন নয়ন জলে ভাসি?

এখানে জন্মভূমি

আমার ঠিকানা!

তোর পুণ্যে জন্ম নিয়ে মা

এই মাটিতেই যেন আরো একবার মরি।

৪.

চিরদিনের ‘তোমার আকাশ তোমার বাতাস’

যে সুরে বাজতো প্রাণে

সে সুরে আবার বাজি

এসো ভাই, এসো বোন

একই মায়ের ললাট ছুঁয়ে

একসঙ্গে বাঁচি।

নম নম নম বাংলা

সালাম বাংলাদেশ ...

বাংলার বিরুদ্ধে

মারুফ রায়হান

মুক্তময়ী কাগজপুকুর ফুলতলি পারুলিয়া চাঁদগাঁ ভুবনডাঙা

সুন্দর সুন্দর সব নাম বাংলা গাঁয়ের নাম

নান্দনিক তার মুখ যেন জলরঙে আঁকা

ময়না শালিক মাছরাঙাÑ কী রূপের ছটা পাখিদের নামে চোখকাড়া পাখনায়

আমাদের নদীগুলো হোক তন্বী কিংবা বিগতযৌবনা কী আশ্চর্য ধ্বনিময়

মেঘনা যমুনা মধুমতী ভৈরব রূপসা কর্ণফুলি

জলপাখি ওড়ে তার সজল শরীর জুড়ে শূন্যে সাঁতরায় ডানাঅলা মাছ

কত গাছ বাংলা নামের গাছ অশ্বত্থ জারুল বট আহা কী ছায়া কী মায়া

সব নাম বাংলায় সব প্রাণ বাংলার

আর ফুলগুলোর কথা কী বলব

শেফালি বকুল যুঁথি গোলাপ রজনীগন্ধা

বাসর-সাজানো ঘ্রাণ হৃদয় রাঙানো রঙ

বাংলার স্বাচ্ছন্দ-নারীরা এত কোমল শ্যামল এত মায়াবতী এত কর্মলক্ষ্মী

ওই ঢেউয়ের ছন্দ গ্রামের প্রগাঢ় গান পাখিদের পেলবতা ফুলের সৌরভ

বাংলার নারীকে করেছে শ্রেয়া

চারদিকে এত বাংলা, এত ভালোবাসা এত শান্তি

আর কিনা শহর-শিখরে বসে একপাল শয়তান দেশকে ভিখিরি বানানোর

ফিকির আঁটছে; বাংলা ভুলিয়ে দেবে বলে নীল নক্শায় মেতেছে...

এসো শাহবাগ

শাহনাজ নাসরীন

(উৎসর্গ- অভিজিৎ রায়)

এসো শাহবাগ

সততায়, সত্যনিষ্ঠায়

প্রজন্ম চত্বরে আজ নৃ-উৎসব

তুমি দাও সুন্দর দাও অমিত প্রেম

আমাদের বেলে জীবনে

নাভির আগুনে পুড়ছে আমাদের জীবন

ব্যাখ্যাহীন অসূয়া মননে ও ময়দানে

হিংসার লাভা গড়িয়েছে ভুবনে ভুবনে

শহর থেকে গ্রামে; চরম অবাধ্যতায়

তোমাকে ভালোবেসে শাহবাগ

আগুন নিয়েছি বুকে

এলোকেশে জ্বেলেছি মশাল

গান্ধারীর তৃতীয় চোখের মতো

কপালে এঁকেছি দুর্দান্ত টীপ

তুমি এসো শাহবাগ

অন্তহীন পতনের কলঙ্ক পেরিয়ে

এসো প্রজন্ম চত্বরে

এসো সনিষ্ঠ দ্রোহের অমৃত প্রবাহে

জলদস্যুর কবলে পদ্ম

সুলতানা শাহরিয়া পিউ

শ্বেতপদ্ম বিছানো পুকুর ছিল বর্ষণমুখর বরিশালে

দুহাতে বিলোতো প্রেম বাধাহীন সেই পদ্যময় পদ্মশোভা

সেই পদ্ম বুঝি আজ জলদস্যুর কবলে

রংপুরে এক পুকুর ছিল স্বপ্নরঙিন

গাঁদার ঝোঁপে উড়ন্ত প্রজাপতি ছড়াতো রঙ

দুরন্ত বালকের কৃষ্ণকায় গামছায় ওদের পাখনা

বারবার পড়ে বাধা, বারবার থামে চঞ্চলতা

আমার বলিকামন ছিল উড়ন্ত পরাধীন প্রজাপতি

কুমিল্লার কোমল পুষ্করিণী মোহন মাছের ঝাঁপে টইটম্বুর

তবু ছিল প্রাণ গেঁথে ফেলা নিঠুর বড়শি

খলুইয়ে না তুলে হাত ফসকানোর ভানে

জলে ফিরিয়ে দেয়ায় যত না ভর্ৎসনা

মনের শান্তির পাশে নিতান্ত নগণ্য ছিল তা

আশ্চর্য এক পুকুরের কথা শুনেছিলামÑ মানুষখেকো পুকুর

ফিবছর দু-তিনটে মানুষ টেনে নিত তার রাক্ষুসে পেটে!

আজ ফেব্রুয়ারি বা মার্চ কি তেমনই কোনো পুকুর!

মানুষের মতো মানুষই যার নির্মম শিকার

জলদস্যুর কবলে আর কত নাকাল হবে জলপদ্ম!

ইস্তেহার

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

সবকিছু ধোঁয়াশায় চলে গেছে ভিন্ন লোকালয়ে......বহু দূরে ভেসে চলে গেছে সব আমাদের প্রার্থনার দিন আর স্মৃতি। চলে গেছে দূরে সেইসব স্বজাতীয়গল্প উন্মূল বীজের ! তখন বিহ্বলতায় রক্তকণিকার অলিন্দে অলিন্দে দেখি, ’আছে পড়ে বস্তুত পরিতাপ সভ্যতার দীর্ঘশ্বাসে মোড়ানো হয়ে। অবশ দেহ তার নিয়ে শকুনেরা সবল উৎসবে মাতে আঁধারে বানানো নিকষ কালো গৃহে ।’

সেই উৎসব গৃহে ঘোষণা করে চতুর শকুনেরা, ‘নদীর স্রোতকে আবার নিতে হবে পাঠ নতুন কলেমায়! মাটির বাতায়নে যে বীজেরা আছে, - তাহারাও যেনো নেকাবের ভেতর হতে আর না বাড়ায় মুখ!

তবুও বাহুতে বুঝে যাই ডাকে আমাদের পুঁথির পরাণ.....ডাকে খোলা মাঠে আবার বেঁধে নিতে বুকে সেøøাগানের গান। আমাদের মৃত্তিকায় সেইসব অনুলিপি পাঠ করে আবার দেখি মৃত্তিকার খাঁজে খাঁজে....জমির আলে আলে লেখা হয় লড়াইয়ের নতুন ইস্তেহার......ওখানেই জেগে ওঠে অপরাজেয় মানব পরাণ !

দেখি চতুর মুখোশের রঙ গলে পড়ে তখন তোমার......খসে খসে পড়ে যায় ঢেকে রাখা চেহারার আসল পরিচয়...! দেখি শেষতক আমার করপুটে রাখা প্রবল সূর্যালোক দুর্বার তোমার চতুর মুখোশের রঙ পুড়ে দিতে দিতে করে দেয় তোমাকেই নগ্ন ভীষণ ।

জিভের জল ও

জ্যোৎর দীপ্তি

শাহজাহান কাঞ্চন

বুজরুক ফতোয়াবাজের বাজখাঁই আওয়াজ

নারী হচ্ছে তেঁতুল, তেঁতুল, তেঁতুল।

আর কামান্ধ কতক পুরুষের জিভের জল দেখে

এক লোলচর্মের থুবড়ো ছেনালি

তুরীয়ানন্দে দেহ ঝাঁকাচ্ছে ধেই ধেই।

অপরাহ্নে কর্মজীবী স্ত্রীর ক্লান্তচরণ বিষাদশ্রান্ত মুখ

পুস্তকের বিশাল বোঝা নিয়ে অনাবিল স্বপ্নানন্দ বয়ে

পাঠমন্দিরে দৌড়ুচ্ছে আমার আত্মজা।

শ্যামল উঠোন কোনে কাঁঠাল ছায়ায় দাঁড়িয়ে

দূরে পুকুর, হেলেঞ্চার ঝোপ, বাঁশ ঝাড়, জঙ্গুল পেরিয়ে

বাবার কবরখানার দিকে মুখ করে আমার মা

অথবা বয়সন্ধিকালের অ¯পষ্ট গুম্ফরেখা নিয়ে

রূপালি নদীর মত রূপবতী যে অপ্সরী কিশোরীযুগলকে

দেখেছিলাম এক বর্ষায় শ্রাবণের স্ফটিক স্রোতে পুণ্যস্নানে।

প্রতিটি চিত্রে ঝরে পড়ে হৃদয় খামচেধরা জ্যোৎর দীপ্তি

অফুরাণ প্রাণস্পন্দনের অমল জলস্রোতে ভাসে

জীবনের সুগন্ধভরা উতল হাওয়ার

পানসি নাও

তবু কেন ওৎ পেতে থাকে লোলপড়া দাঁতাল আড়ালে অন্ধকারে!

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: