মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সদাসতর্ক প্রহরা

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫
  • শান্তনু কায়সার

১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যারা ছিলাম বিশ-একুশ বছরের তরুণ তারা এখন মধ্য-ষাটে এসে পৌঁছেছি। মুক্তিযুদ্ধ যে প্রত্যাশা আমাদের মনে জাগিয়েছিল তার আদৌ অথবা কতটা বাস্তবায়ন ঘটেছে এর কোন জবাব চট করে আমাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি ভাববার ও বোঝার জন্য তার পশ্চাৎপটটাকে একটু দেখে নেওয়া দরকার।

চল্লিশের লাহোর প্রস্তাবোত্তর ‘নবযুগ’ পত্রিকায় নজরুল পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছিলেন এবং কার্যত একে ‘ফাঁকিস্তান’ বলেছিলেন। কিন্তু কলকাতায় সত্যজিৎ রায়, ফররুখ আহমদ প্রমুখের শিক্ষক গোলাম মোস্তফা নতুন এই রাষ্ট্রে এসে পালন করেছিলেন বিপরীত ভূমিকা। তিনি যেমন একদিকে বাংলা হরফ বদলে পাক বাংলা সৃষ্টির প্রস্তাব করেছিনে তেমনি ১৩৫৯-এর অগ্রহায়ণে প্রকাশিত ‘মুসলিম লীগ’ কবিতায় বলেছিলেন :

থামাও তোমার ভাষার দ্বন্দ্ব, তুলো না ও কথা

দিও না লাজ

মুহাব্বতের রাষ্ট্রভাষায় দিলে-দিলে কথা

কহিব আজ।

উদীয়মান সাহিত্যিকদের তিনি তাদের রচনায় ‘পাকিস্তানবাদ’ প্রচারের উপদেশ দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক এই ধারাবাহিকতায় কবি আইয়ুব খানকে তাঁর কবিতায় আমিরুল মুসলিমীন বলেও স্বাগত জানিয়েছিলেন।

এই চিত্রের অন্য আরেক দিকের প্রকাশ লক্ষ করা যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় যে দলটি পাকিস্তানের পক্ষে তার ঘৃণ্য ভূমিকা পালন করেছিল তা থেকে। এর প্রতিষ্ঠাতা মওদুদী স্বজাতি ও স্বদেশীয় শাসন প্রতিষ্ঠাকে প্রয়োজনীয় মনে করেননি। ‘মানুষের সার্বভৌমত্বের অবসান হয়ে’ সেখানে আল্লাহর প্রেরিত ন্যায়নীতির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়াকে তিনি তার নিজের ও দলের লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছিলেন। আপাত নির্দোষ মনে হলেও তিনি যখন বলেন, ‘জনগণের দ্বারা জনগণের জন্য জনগণের শাসনে’ তিনি বিশ্বাস করেন না। তখন বোঝা যায় তার আসল উদ্দেশ্য কী। ইহলৌকিক রাষ্ট্রের পারলৌকিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে জনগণকে বিভ্রান্ত ও প্রতারণা করা সহজ বলেই তিনি তার দল ও অনুসারীরা এই ভেক ধরেছিল, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৭১-এ। নির্বাচন কমিশন মৌলিক এই বিভ্রান্তির কারণে দলটির নিবন্ধিত হওয়ার বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করেছিল।

তাদের একটি বৌদ্ধিক চাতুরির উদাহরণ থেকে এই ভ-ামিকে অধিকতর স্পষ্ট করা যায়। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ২০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পশ্চিমাংশে চারটি আসনে নির্বাচিত হলেও পূর্বাংশে একটি আসনেও নির্বাচিত হয়নি। অর্থাৎ শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। ঢাকার একটি আসনে প্রাদেশিক আমির গোলাম আযম আশি হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়। তবু নির্লজ্জের মত প্রায় সব কয়টি আসনে দ্বিতীয় হওয়ার গৌরব প্রচার করে। এই শয়তানী চূড়ান্ত রূপ লাভ করে তথাকথিত উপনির্বাচনের ঘোষণায়।

দলটি প্রস্তাব করে ‘বিগত নির্বাচনের (অর্থাৎ সত্তরের নির্বাচনে) যারা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিল তাদের শূন্য আসনগুলোতে নির্বাচিত ঘোষণা করা হোক।’ দালাল শিরোমণি ও রাজাকার শ্রেষ্ঠ গোলাম আযম টিক্কা খানের সুরে সুর মিলিয়ে ১৯৭১-এর ১৪ আগস্ট তথাকথিত আজাদী দিবসে বলেন, দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর আর মানুষকে বোঝানোর দায়িত্ব শান্তি কমিটির। মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি বলেন, ঘরে ঘরে তৈরি দুশমন। তার দৃষ্টিভঙ্গিটি স্পষ্ট হয় এই বিবৃতি থেকে, ‘পাকিস্তান টিকে থাকলে আজ হোক কাল হোক বাঙালী মুসলমানের হক আদায় হবে।

কিন্তু পাকিস্তান ধ্বংস হলে মুসলমানদের শৃগাল কুকুরের মত মরতে হবে।’ ১৯৭১-এ তিনি ও তার দল কী ভূমিকা পালন করেছিল তা তৎকালীন প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় তাদের যোগদান প্রসঙ্গে তার দেয়া ২৫ সেপ্টেম্বরের বক্তৃতা থেকে বোঝা যাবে। ‘বর্তমান প্রদেশের জনসংখ্যার যে ২০ ভাগ লোক সক্রিয় রয়েছে তারা দুই ভাগে বিভক্ত। একদল পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে চায় আর একদল পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। জামায়াতে ইসলামী শেষোক্ত দলভুক্ত।’

প্রাণ দিতে গিয়ে তারা যে কত নিরীহ দেশপ্রেমিক নাগরিককে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও নির্যাতনের কত নির্মম পথ অবলম্বন করেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তার অসংখ্য চিত্র ও দলিল রয়েছে। বাংলাদেশ হওয়ার পর মালেক মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী বলেছিল, ‘বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানের সঙ্গে বিচ্ছেদের কারণে অনুতপ্ত।’ আর তাদের দল নিজেদের সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছে, ‘তাই বলে টিক্কা খানের সেনাবাহিনী পাকিস্তান রক্ষার নামে যত অমানবিক কাজ করেছে তা কখনই জামায়াত করেনি।’ একথা একমাত্র ভ-দের পক্ষেই বলা সম্ভব। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে যাবতীয় নৃশংস ও সন্ত্রাসী কর্মকা-, হত্যা ও লুটতরাজ করে যারা দেশ ও জাতিকে কলঙ্কিত করেছে তাদের পক্ষেই শুধু এই ধরনের জঘন্য মিথাচার ও নির্লজ্জ অপপ্রচার করা সম্ভব।

এই দলের চিন্তাগত শয়তানীর একটি উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার। জিন্নাহর সঙ্গে একটি সাক্ষাতকারের উল্লেখ করে রাজাকারশ্রেষ্ঠ ‘ভাষাসৈনিক’ হতে চেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের তৎকালীন সহসভাপতি অরবিন্দু বসুর হিন্দু পরিচয়ের কারণে সদ্য সৃষ্ট পাকিস্তানে কৌশলগত প্রয়োজনে তার পরিবর্তে একটি হলের ভিপিকে জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য পাঠানো হয়। পরবর্তীকালে এতে যুক্ত হওয়ার জন্য গোলাম আযম দুঃখ প্রকাশ করেন। এর আগে-পরে কখনো এ ক্ষেত্রে তার আর কোন ভূমিকা ছিল না। অথচ বাংলাদেশ-উত্তরকালে এর সুযোগ নিয়ে তিনি ‘ভাষা সৈনিক’ হয়ে উঠতে চান। দুর্জনের ছলের অভাব নেই আবার তিনি মওলানা ভাসানীর অর্জিত অভিধা ‘মজলুম জননেতা’ চুরি করে তাও হয়ে উঠতে চান। কিন্তু উভয় চুরিতেই তিনি ধরা পড়ে যান। ১৯৮১’র জানুয়ারি মাসে বায়তুল মোকাররমে প্যালেস্টাইনে বাংলাদেশর দুই শহীদের জানাজা পড়তে এসে তিনি যেমন লাঞ্ছিত হন তেমনি তার দুই মিথ্যাও তাকে পরবর্তী জীবনে মিথ্যাচার ও ভ-ামির যুগ্ম প্রতীক হিসেবে গণধিকৃত করে রাখে।

দুই.

দেরিতে হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়ে তার কোন কোন দ- কার্যকর হয়েছে। শোষোক্ত ক্ষেত্রে যদিও ধীরগতির প্রশ্ন উঠেছে এবং মানুষ সম্পূর্ণ সংশয়মুক্ত হতে পারেনি, তবু এই উদ্যোগকে জনগণ সাধারণভাবে ইতিবাচক ও ন্যায়বিচারের সহায়ক বলেই বিবেচনা করছে। একাত্তরে যে গণবিরোধী অত্যাচার ও নির্যাতন চলেছিল এবং চলেছিল দেশ ও মানুষের বিরুদ্ধে এবং পশুশক্তি শোষণ ও অত্যাচারের পক্ষে তাকে কোন অজুহাতেই ছোট করে দেখা যায় না। যাঁরা দেখেন এবং জাতিকে তথাকথিক বিভক্ত করার কুযুক্তি দেখান তারা আর যাই হোন জনগণের মিত্র ও তাদের পক্ষেও নন। যে দল ও জোট বলে তারাও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও অপরাধীদের বিচারের পক্ষে শুধু চান তা যেন স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের হয়। তাদের কথা এদেশের মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। একাত্তরের যারা অপরাধী তাদের সঙ্গে জোট করে তাদের কোলে বসিয়ে রেখে যারা এর স্বচ্ছ বিচার করতে চায় তাদের এই স্বচ্ছতাই বরং ঘোরতর অস্বচ্ছ। আর যে অপরাধীরা জোট বেঁধেছে তারাই বা কেন তা হতে দেবে। যে মূল দলটি এ কথা বলছে তারা কি কখনও সৎভাবে এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে কিংবা ক্ষমতায় থাকার সময় এই বিষয়ে ন্যূনতম কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে? বরং স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল ঐ চক্রকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতার অংশীদার ও জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছে। সেজন্য আমরা দেখি মূল দলের যতগুলো বড় বড় জনসভা হয়েছে তাদের প্রত্যেকটিতে প্রতিক্রিয়াশীল ঐ দলের পোস্টার ও ব্যানার ব্যবহার করে এবং সেøøাগান দিয়ে দ-প্রাপ্ত ও বন্দী ঐ অপরাধীদের মুক্তি দাবি করা হয়েছে এবং মূল দলটি তার প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। এভাবে তারা কাদের স্বার্থ রক্ষা এবং জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধীদের কতটা পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং সে কারণে জনগণের বিরুদ্ধে তাদের কী ও কতটা অবস্থান তা না বোঝার মতো বুদ্ধিহীন এদেশের তৃণমূলের মানুষ নয়। আর আন্তর্জাতিক মানের অর্থ- অর্থ দিয়ে কেনা লবিস্টদের কথা শুনে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের স্বার্থ রক্ষা করা। তবে একথাও আমাদের বুঝতে হবে, সামগ্রিক ন্যায়বিচারের বাস্তবতাই শত্রুদের কুৎসা রটনার ভ্রান্ত পথকে রুদ্ধ করতে পারে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জে বলেছেন, শিগগিরই সাত খুন ও ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে। এ মাসের শুরুতেই ত্বকী হত্যার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। তার আগেই কিংবা ঐ সময়ের মধ্যে যদি অভিযোগপত্র দাখিল করা যেত তাহলে জনগণের আস্থা কি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত না? চাঞ্চল্যকর মামলা সাগর-রুনির হত্যাকা- অনুল্লিখিত থাকায় মানুষ হতাশ হয়েছে। তাদের মনে হয়ত এ প্রশ্নও জেগেছে, তাহলে কি ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে গেল? হয়ত নারায়ণগঞ্জের নয় বলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ব্যাপারটা সেখানে উল্লেখ করেননি। কিন্তু যারা মানুষকে সংবাদ দিতে গিয়ে নিজেরাই সংবাদ হয়ে গেলেন মৃত্যুর এতদিন পরেও যদি তারা বিচার না পান তাহলে সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাস কি করে টিকে থাকবে?

এখানে ‘শিগগির’ কথাটার ওপর জোর দিতে চাই । শিগগির যেন শিগগিরই থাকে। বিলম্বিত হতে হতে তা যেন বিস্মৃত হয়ে না যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন আমাদের জীবনের অংশ না হয়। সম্প্রতি বাসে শিশুর লাশ পাওয়া গেছে। পুলিশ হত্যা করেছে চতুর্থ শ্রেণীর শিশু শিক্ষার্থীকে। দুটিকেই হয়ত বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে কিন্তু নারায়ণগঞ্জের সাত খুনে যেহেতু র‌্যারেব মতো এলিট ফোর্সের উর্ধতন কর্মকর্তারা জড়িত থাকে সেহেতু তাকে বা এ ধরনের ঘটনাকে এভাবে আর অগ্রাহ্য করা যাবে না। আর অপরাধ বা দুষ্টের দমনের নামে পুলিশ ও গ্রেফতার বাণিজ্যের কথা তো সর্বজনবিদিত। নিরীহ অথবা জনগণের হেনস্থা কোনমতেই ন্যায় বিচারের সহায়ক নয়। বরং তার ঘোরতর প্রতিবন্ধক। অন্যায় ও অপরাধের শত্রু এবং ন্যায় ও সাধারণের মিত্র হয়েই কেবল পুলিশ জনগণের বন্ধু হতে পারে।

একুশের বইমেলার শেষদিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশের খুব নিকটবর্তী জায়গায় অভিজিত রায়ের নৃশংসভাবে খুন হওয়ার ঘটনা আমাদের মোটেই স্বস্তি দেয় না। তাঁর স্ত্রী বন্যার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ আমাদের অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। প্রকৃতি শূন্যতাকে ঘৃণা করে। ইতিবাচকতার অভাব নেতিবাচকতাকে আক্রমণ করে। প্রগতির শূন্যতা প্রতিক্রিয়া চাষের উপযুক্ত ক্ষেত্র। যেখানে বাংলাদেশ নেই সেখানে তার উল্টো ফল ফলবেই। ফসলের অভাবে আগাছা তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবনা কেন?

তিন.

১৩ মার্চ বিরোধী নেতার ‘সংবাদ’ সম্মেলনকে জনগণ হতাশ হয়েছে বলে সংবাদ ভাষ্যে প্রকাশ। তিনি যে লাগাতার অবরোধ ও হরতাল চালিয়ে যাচ্ছেন শুক্র ও শনিবার দয়া করে তা স্থগিত অথবা শিথিল করে যে এসএসসি পরীক্ষা হতে দিচ্ছেন তাতেই বোঝা যায় তার কত দয়ার শরীর। তাতে ফেব্রুয়ারি মাসের একুশে ফেব্রুয়ারিও বাদ যায়নি। আগামী ২৬ মার্চ অন্তর্ভুক্ত হলেও আমরা অবাক হবো না। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কাছে সবই তুচ্ছ। নিজে তিনি কতটা অবরুদ্ধ আছেন তা আমরা জানিনা। তবে জনগণকে অবরুদ্ধ করার তাঁর চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই। তবে জনগণও সেই শৃঙ্খল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসছে। তারা মোটেই বন্দী ও জিম্মি হতে চায় না। তবে ক্ষতি করার শক্তি দুর্বৃত্তের থাকেই। তাদের পেট্রোলবোমা মেরে হত্যা করা কিংবা ঝলসে দেয়া মোটেই কঠিন কাজ নয়। কঠিন নয় তাদের চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া ও তাদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলটি ১৯৭১-এ যেমন জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এখনও তেমনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গণতন্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

সেই যুদ্ধের স্ববিরোধিতার একটা প্রকাশ সংবাদ সম্মেলনে কোন প্রশ্ন করতে না দেয়া। তবু কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে একজন সাংবাদিক নেতাকে প্রশ্ন করেছিলেনÑ এভাবে আপনা কি জনগণের সমর্থন পাচ্ছেন? তিনি স্বভাবতই ইতিবাচক জবাব দেন। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

তবে এ সংবাদ সম্মেলনে তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। এ জীবনে তিনি যা পেয়েছেন (দুইবারের প্রধানমন্ত্রিত্ব কেউ কেউ বলে, তিনবারের) তাতে আর তাঁর চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। এখন তিনি শুধু গণতন্ত্র উপহার অথবা ফেরত দিতে চান। তবে নির্বাচনী আমলে আদৌ অথবা কতটা গণতন্ত্র থাকে সেটা একটা প্রশ্ন বটে।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে প্রকৃত জনগণ প্রধানমন্ত্রিত্ব, মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্যরা তো নয়ই, এমনকি ক্ষমতার উচ্ছিষ্টও পায় না। সিংহভাগটা তিনি তাঁর দল অথবা জোট পায় এবং তাদের তল্পিবাহক ও অনুগৃহীতরা কিংবা একই ভাকে তাদের প্রতিপক্ষরা। সেজন্যই জনগণকে গণতন্ত্র দেয়ার তাদের এত আগ্রহ। তহবিলের ও ক্ষমতার নাগাল তো জনগণ পায় না, জনগণের নামে তারাই পান। তারা ভাল করেই জানেন, গাছটা যে রোপণ অথবা পরিচর্যা করুক ফলটা তারাই ভোগ করবেন। লক্ষ্য করে দেখবেন, এখন ভুল করেও বা প্রথা হিসেবেও কেউ বলে না, নেতার চেয়ে দল ও দলের চেয়ে দেশ বড়।

আরও প্রত্যক্ষ উদাহরণ দেয়া যাক, যিনি অবরোধ ও হরতাল চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সেই দলের কার্যালয়ে টাঙানো তিনটি ছবি দ্রষ্টব্য, প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা, বর্তমান চেয়ারপার্সন তাদের পুত্র অর্থাৎ দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। পুত্র না বলে ভাইস চেয়ারম্যানই বলা উচিত ছিল। কিন্তু ঐ পদের অধিকারী অন্য কারও তো সুযোগ হয়নি ছবিতে উত্থানের। সুযোগ হয়েছে তিনি পুত্র বলেই। ফলে ব্যাপরটা কি পারিবারিক কাঠামাতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে না? পরিবারতন্ত্রের এই বিষয়টা কি ক্ষমতাকে ধারণ করারই ইঙ্গিত নয়? তার হয়ত চাওয়া পাওয়ার শেষ হয়েছে কিন্তু উত্তরসূরির তো নয়। অতএব যতই জনগণের জন্য গণতন্ত্র উদ্ধারের কথা বলা হোক আখেরে তা গিয়ে দাঁড়াবে পরিবারতন্ত্রে। এভাবে যে ধরনের ‘তারুণ্যে’র প্রতিষ্ঠা হবে তা কি বার্ধক্যের চেয়ে উন্নত হবে। নাকি হবে প্রথার প্রথা ও ভুলের ভ্রান্তি। ঘরপোড়া জনগণের কী ধারণা অথবা প্রাপ্য? অতএব ২৬শে মার্চ আমাদের বলছে, সতর্ক হও। ইটারনাল ভিজিলেন্স ইজ দ্য প্রাইস অব লিবার্টি।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: