মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উচ্চারণের সাহস ও সঙ্কট

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫
  • প্রশান্ত মৃধা

আমাদের বিশ্বাসের অতীত স্মারক নির্মাণ করে উনিশশ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। জাতি হিসাবে বাঙালির লড়ে-মেরে জিতে নেয়ার ইতিহাস কোনওদিনই ছিল না, থাকলে এক ইংরাজ বেপারি রবার্ট ক্লাইভ যেদিন মুর্শিদাবাদ লুট করে কলকাতার দিকে হাতিঘোড়া-লোকলস্কর নিয়ে ফিরছিলেন, সেদিন পথের ধারে যত লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাতরনয়নে ওই অদৃশ্যপূর্ব দৃশ্য দেখেছিল, তারা যদি তাদের পায়ের কাছে থেকে তুলে একএকখানা করে ইট ওই হাতিঘোড়া-লোকলস্করের দিকে ছুঁড়ে মারত তবে নাকি সাত সমুদ্দুর তের নদীর ওপার থেকে আগত চরবাসী সবাইকেই অকুস্থলে ভূমিস্যাৎ হত। সেই ইতিহাস আজও কি আমাদের সাহসী করে তোলে অন্য কোনওভাবে? সেদিন কোনোমাত্র প্রতিরোধের উপায় জানা থাকলে অথবা জাতি হিসাবে আমাদের রক্তে প্রতিরোধের ঐতিহ্য থাকলে, অন্তত দুশ বছরের এক নীরব ধর্ষণের ইতিহাস আমাদের বয়ে বেড়াতে হয় না। সিরাজুদ্দৌলার পতনের দিনে বা তারও অনেক অনেক দিন আগে ইকতিয়ারউদ্দিনের মাত্র সতেরজনের বাহিনী নিয়ে একটি দেশ পদানত করার ভিতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে খুব সহজেই অন্যের হাতে আমাদের অধিকার দিয়ে দেয়ার। সেদিন রাজা লক্ষ্মণ সেনের পিছন দরজা দিয়ে পলায়ন অথবা পলাশি প্রান্তরে মির মদন-মোহনলালের প্রাণঘাতী যুদ্ধের পরও পরাজিত হয়ে সিরাজের পালিয়ে গিয়ে ধরা পড়া, নিহত হওয়া ও সিপাহসালার মির জাফরের পুতুল নবাব হিসাবে গদিতে বসার পরে এক সামান্যক্ষণের ইতিহাসে আমাদের সামনে মীর কাশিম দাঁড়ান [২৩ অক্টোবর ১৭৬৪]; কিন্তু সেই চেষ্টায়ও বক্সারের পরাজয়ের সঙ্গে প্রমাণিত হল যে, আমরা লড়ে মরতে জানি, লড়েমেরে আদায় তখনও শিখিনি। অথবা সিপাহী মাহাবিপ্লব, নীল বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ রদ থেকে সব ধরনের ভারতছাড় আন্দোলন, সবই কিন্তু কোনওপ্রকার সফলতার মুখ দেখেনি। দেখলেও এইসমস্ত আন্দোলন যে প্রতিরোধের স্মারক নির্মাণ করে তাতেও আমাদের হাতে চাইলেই ধরিয়ে দেয়া যায় বিভক্ত বাংলা! হয়েছেও তাই। আমাদের যে কোনো অধিকারের আপোষকামিতার সুযোগ নিয়ে হোক অথবা হোক আমাদের নেতৃত্বহীনতার দুর্বলতা অথবা হোক লড়ে ভুলে যাওয়ার জাতিগত ঐতিহ্যের কারণেই, আমাদের কোনো আন্দোলন কখনওই নানা অর্থে কোনওপ্রকারের সফলতার মুখ দেখেনি। হয়তো আমাদের ইতিহাস তার ঐতিহ্যের পরম্পরায় ভাষা আন্দোলন পরবর্তী ইতিহাস থেকে আমাদের শিখিয়েছে জিতে নেয়ার ভাষা। বাঙালির খ-িত ভূখ-ে ভাষা আন্দোলই সেই ঐতিহ্যের ধারক, যে ঐতিহ্যই আমাদেরকে দিয়েছে জ্ঞাতিসত্তার সেই অভিজ্ঞান যা আমাদেরকে বহুপ্রকারে ভেদবুদ্ধির উপরে উঠে নিজেদের অন্তর আত্মাকে নিজেদের মতো করে ছুঁয়ে দেখার চূড়ান্তে পৌঁছে দেয়। ফলে যেভাবেই হোক ভাষা আন্দোলনের উত্তরণের ঐতিহ্য ধরেই ১৯৭১-এ বাংলাদেশ নামের এই স্বাধীন ভূখ- পাওয়া। এবং তা সম্পূর্ণই লড়ে-মেরে এবং মরে। হয়তো এই প্রথম বাঙালি জানল নিজের অধিকার আদায়ের কায়দা। বাঙালির ঐতিহ্যে এই প্রথম খোদিত হল সেই স্মারক যে আমরাও রক্তে প্রতিরোধের ইতিহাস বহন করি।

প্রায় সহস্র বছরের মরণ-বাঁচনের আত্মপ্রত্যয়ের ইতিহাস যখন আমাদের কাছে মাত্র নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস হয়ে নিজস্ব ভূখ- দেয়, সেই ভূখ- তার সাহিত্যের কাছে যে চেতনা দাবি করে আমাদের কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ কি সেই অবিস্মরণীয় চেতনায় আমাদের সামানে ধরা দেয়? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প-উপন্যাস কি আমাদের সামনে সেই স্মারক উন্মোচন করে যে, আমাদের হাজার বছরের সমস্ত সংগ্রামের অমল ছবি তার ভিতরেই আমরা দেখে নিতে পারি? একথা ঠিক, আরও বহু বহু অপ্রাপ্তির মতো আজও আমরা লিখতে পারিনি সেই উপন্যসটি যেটি আমরা লিখতে চাই; যে উপন্যাসটাই পৃথিবীর সামনে আমাদের দেশকাল প্রেক্ষিতের তাবৎ স্মৃতিচিহ্ন। আমাদের ভাষায় কি লেখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেই গল্পটি, যে গল্পটি লোকশ্রুতি হতে হতে পরিণত হবে কিংবদন্তিতে? যদিও কবিতা প্রচুর প্রচুর লেখা হয়েছে, তারপরও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুখেমুখে উচ্চারিত কবিতাটি কয়টিয়? অথবা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে নাটকের যে জোয়ার বয়ে গেল তার কয়টি নাটকে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত মূল্যবোধের কাছাকাছি আমাদের পৌঁছে দিতে পারে? এভাবে ধরে ধরে হিসাব করতে গেল যে চিত্র পাব তাতে আশার তুলনায় হতাশা জায়গা নেবে অনেক বেশি। কোনওপ্রকার পরিসংখ্যানকে মাথায় না রেখে খালি আবেগ আর ঔদ্ধত্যকে মাথায় রেখে যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে উঠে-পড়ে লেগে যান তাদের অন্তত এইটুকু ভাবা দরকার কোনওকিছুই রাষ্ট্রীয় আর সামাজিক মূল্যবোধের বাইরে নয়। ফলে যেভাবেই দেখি না কেন খুব সরল ও সিধেভাবে যদি বলে বসি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সাহিত্যের অর্জন উল্লেখযোগ্য, তবে তা বলার জন্যেই বলা হয়, সেই সমস্ত সাহিত্যকে হাতে নিয়ে তার সৃষ্টির শিল্পমূল্য বা গ্রহণযোগ্যতাকে দেখলে, এমন কথা খুব জোর দিয়ে বলা যায় না কোনওভাবেই।

তবে কি স্বাধীনতার পরে পাল্লা দিয়ে সামজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের দফায় দফায় স্খলনই এর কারণ? নাকি মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে সেই মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে পারে নি যে মূল্যবোধ আমাদের সামনে তৈরি করতে পারত জাতীয় জীবনে বেঁচে-ওঠার সমস্ত অবলম্বন। তবে কি এই এমন সৃষ্টিহীনতার ফাঁক মানে মূল্যবোধের অর্জনের ফাঁক মুক্তিযুদ্ধ বা যুদ্ধের সংঘটনের ভিতরেই লুকিয়ে ছিল?

একথা সত্যি যে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে দফায় দফায় মূল্যবোধের স্খলন, সামাজিক জীবনে আশাভঙ্গের সমস্তপ্রকারের ক্ষেত্র তৈরি হওয়া আর সামরিক শাসনের ফলে জাতীয় জীবনে সমস্তপ্রকারের নৈতিকতা বিসর্জন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমস্ত চিহ্ন বিলোপÑ সবমিলে ওই সময়ে জীবন বাংলাদেশ যাপন করেছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের মহত্বের কোনোমাত্র চিহ্ন এই দেশটির গায়ের উপর দিয়ে বয়ে যায়নি। ফলে সামাজিক জীবনে মানুষ যে জীবন যাপন করেছে তাকে তো যুদ্ধোত্তর সংগ্রামের জীবনই বলা যায়। দশকের পর দশক ধরে ধন নয় মান নয় শুধুই জীবনের নিরাপত্তা আর সুস্থজীবনের তাগিদে জীবনের সমস্তরকমের স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিতে দিতেই মানুষ বুঁদ। তরুণতরুণীরা কেউই রাষ্ট্রের কাছে থেকে এমন আশ্বাস পায়নি যা তাদের দেখাতে পারে দিশা। নারীর সমঅধিকারের প্রশ্ন তো পরের কথা তার শরীরই নিরাপত্তার কোনও রাষ্ট্রীয় আশ্রয় পায়নি। এই চিত্র বিত্তভেদে সবার জন্যে সমান। তবে রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোয় বারবার পরিবর্তনের ফলে উন্নতি হয়েছে একমাত্র মধ্যবিত্তের উচ্চাাকাক্সক্ষী অংশের। যদিও মধ্যবিত্ত মাত্রই উচ্চাকাক্সক্ষী। তারপরও এদের ভিতরে যে অংশটি সমস্ত রকমের মূল্যবোধকে পায় দলে, রাষ্ট্রীয় শাসন কাঠামো দফায় দফায় বদলের সঙ্গে সঙ্গে বারবার নিজের খোলস বদলে নিতে পেরেছে তাদের অবস্থার সামাজিক উন্নয়ন ঠেকাতে পারেনি কেউ। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে যে মানুষ ছিল অর্থশূন্য সেও আজকের দিনে নিজস্ব বিত্ত বদল করে করে মহান উচ্চবিত্তে পরিণত হয়েছে! দেশে আজকের অর্থবান মানুষের সংখ্যা গোনার জন্যে রীতিমত গেজেট প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু ১৯৭১-এ যে মানুষ নিজের অস্তিস্ত রক্ষায়, অথবা বুঝে না বুঝে মাতৃভূমি রক্ষার তাদিগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সে কী পেল? হিসাবের খাতায় কোনওপ্রকার যোগবিয়োগ না-করেই জানা যায়, বলে দেয়া যায়, সেই মানুষের আশা-ভরশা কোনোকিছুরই কোনো মূল্য না দেয়ার ফলে তার ভাগে রয়ে গেল শুধু হতাশা আর বঞ্চনা! দেশজুড়ে যে লাখলাখ অনাহারী মুখ, তাদের সামনে কিস্তিতে কিস্তিতে শুধু আশ্বাসের কলাই ঝুলল এবং তারা বারবার নিজেদেরকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে সেই একই মুখ দেখতে দেখতে চোখ ধূসর থেকে ঝাপসা বানিয়ে আজ ক্লান্ত! শুধু এই মুখ দেখে দেখে কøান্ত হন না রাষ্ট্রনায়কেরা, এই ভুখানাঙা-নিরাপত্তাহীন মানুষগুলোর জন্যে বছর বছর নীতিরীতি বানানো মানুষেরাÑ তারা এই একটি ব্যাপারে অক্লান্ত। কিন্তু রাজনীতিকেরা ভুখাপেট দিয়ে কী করবেন? তাদের দরকার সহযোগী হিসাবে উচ্চকাক্সক্ষী মধ্যবিত্ত তাঁবেদার শ্রেণি। যারা শয়নে-স্বপনে-জাগরণে এই সমস্ত রাজনীতিক নামধারী রাষ্ট্রীয় টাউটদের দিয়ে যাবে উপযুক্ত ছায়া। মধ্যবিত্ত দিচ্ছেও তাই। নীতি নির্ধারণের আসনের আলোক-উজ্জ্বল রঙ্গমঞ্চ থেকে যারা ঢের দূরে, সেই না-খাওয়া ঝুলানো-কলা-দেখা মানুষেরা তবে পেল কী? একমাত্র ভোট ছাড়া আর কোনো সময়ই তাদের চেহারা আলোর মুখ দেখতে পায় না। তবে এই তেতাল্লিশ বছরে মুক্তিযুদ্ধ তাদের সামনে কোন মূল্যবোধ নিয়ে হাজির হবে? তাদের কাছে যদি মুক্তিযুদ্ধ আর ভোট সমাত্মক শব্দ হয়ে ধরা দেয় তাহলে? তাহলে এমন মূল্যবোধকে ভাষা দেবার কাগুজে ভাষা আমাদের কবি-কথাশিল্পীরা আয়ত্তে আনতে পারেননি? পেরেছেন। কিন্তু সেই পারার যে সংজ্ঞার্থ হতে পারত এমন একটি গল্প যা লোকশ্রুতিতে পরিণত হত, তা হয়নি। সেই পারার সংজ্ঞার্থ হতে পারত এমন একটি উপন্যাস, যে উপন্যাসে অনাগত মানুষ তার পূর্বপুরুষের বাঁচন-মরণে সেই ছবি দেখত : জীবনের মাত্র নয় মাস মানুষের স্বাভাবিক নব্বই বছরের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে! আর সেই উপন্যাস পাঠের ভিতর দিয়ে সেই মানুষ নিজের নতুন জীবনের যাপনের সংজ্ঞার্থ খুঁজে নিত। তাও হয়নি। ফলে কথাসাহিত্যে যে অর্জনের জিজ্ঞাসা প্রতিনিয়ত আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে আলোহাওয়ার জোগান দিত সেই অর্জন আমরা করে উঠতে পারিনি। এই জন্যে তেতাল্লিশ বছর সময় হিসাবে একদম কম ছিল?

তবে মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্যে আমাদের উল্লেখযোগ্য অর্জন ছোটোগল্পে। আমাদের সৃষ্টিশীল গদ্যলেখকেরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছোটগল্প লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সুশান্ত মজুমদার লিখেছেন, ‘...বয়োজ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ সব লেখক জাতির জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গল্প লিখেছেন। শিল্পসফল মুক্তিযুদ্ধের গল্প আমাদের গল্পের ভা-ার সমৃদ্ধ করেছে। আবার বাঙালির দেশ পাওয়ার আবেগ অনেক গল্পে লেখকের দুর্বলতার কারণে শিল্প ক্ষুণœ হয়ে কেবল ফাঁপানো বিষয় হয়েছে।’ এই উদ্ধৃত অংশের প্রথম দুটি বাক্যের সাফল্য সংবাদের পাশাপাশি একই সঙ্গে শেষবাক্যেই আছে মুক্তিযুদ্ধের ছোটোগল্প বিষয়ে আমাদের অগ্রগণ্য একজন গল্পলেখকের সম্পূর্ণ সংশয়ের প্রকাশ। দ্বিতীয়বাক্যে লেখকের যে অভিমত সেই অভিমতই যেন সাফল্যের পাশে ব্যর্থতাকে আঁকে শেষ বাক্যটিতে গিয়ে। এর কারণ খোঁজার জন্যে অথবা এই অভিমতের যথার্থতা নিয়ে নতুন করে ভাববার দরকার নেই, এজন্যে প্রচুর প্রচুর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছোটোগল্প পড়ে পড়ে আমাদের ক্লান্ত হবারও দরকার পড়ে না- শুধু রাষ্ট্রীয় উপর কাঠামোর খোলস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কথাসহিত্যিকদের মানুষের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উপরি খোলস দেখার যে-প্রবণতার নামে নিয়ত সাহিত্য ও রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের স্খলণ ঘটানোর ভাগিদার হতে দেখা যায়, তার দিকে একটু ভালোভাবে খেয়াল দিলেই চলবে। একথা তো ধ্রুব যে, মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে ৯৯.৯৯% গল্পই লেখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরে (হয়ত .০১% মুক্তিযুদ্ধকালীন)। তাতে রাষ্ট্রকাঠামোর অস্থিরতা আর মধ্যবিত্ত শ্রেণির সুবিধাভোগী অবস্থান, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী অংশের মানুষদের টাউট-বাটপারদের কাতারে নাম লেখানো- সবেমিলে লেখকদের অবস্থানকেও অনেকাংশে যে অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে তাতে সৃষ্টির তুঙ্গস্পর্শী বা যাকে বলা হয়ে লোকশ্রুতিতে পরিণত হওয়ার মতন ছোটোগল্পটি লেখার যোগ্যতাও যেন আমাদের লেখকেরা হারিয়ে বসেন! নয়তো মুক্তিযুদ্ধের কথাসহিত্য বা বিশেষত গল্পে যে শিল্পসফলতার আশ্বাস মুক্তিযুদ্ধের সফলতা আমাদেরকে দেয়, আমাদের কথাসাহিত্য সেই সাফল্য অর্জন করতে পারে না কেন? লেখকের ক্ষমতার ভেদ থাকে, গায়ের চামড়ার রঙের মতন তা সত্যি; তা বলে সেই ক্ষমতার যে প্রকাশ জাতি পেতে পরত কথাসাহিত্যিকদের কাছ থেকে তা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্য পায়নি। এ ক্ষেত্রে শুধুই কথাসাহিত্যকে দোষী করার জন্যেই দোষী করা নয়, আবারও লিখলেও বাহুল্য হবে না যে, আমাদের সাহিত্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দিতে পারেনি সেই চৈতন্য যা সমস্তপ্রকারের রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে, সামজিক মূল্যবোধহীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারত; যা হতে পারত আমাদের জাতিগত সাংস্কৃতিকচেতনা-মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরুদ্ধতার বিপরীতে প্রধান অবলম্বন। আমাদের কথাসাহিত্য সেই ঐতিহাসিক বিন্যাসে নিজেকে দাঁড় করাতে পারেনি যা রাষ্ট্রবিজ্ঞান আর ইতিহাসকে দিতে পারত নতুন পর্বান্তর। মুক্তিযুদ্ধেরও একটা ভূগোল ছিল, ছিল অর্থনৈতিক শ্রেণিগত ব্যক্তি-অবস্থান, যেটি পরবর্তীকালে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কেও ছাপিয়ে দিয়ে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানগত দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে তুলেছিল; আমাদের কথাসাহিত্যে সেই ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বিন্যাসের ইতিহাসও লেখা হল না, খুঁজে দেখা হল না মুক্তিযুদ্ধ-করা ব্যক্তি-ব্যক্তিত্বে দ্বন্দ্বের কারণগুলোকে। কথাসাহিত্য ইতিহাসের সেই পাঁক থেকে মুক্তি পাক সেই প্রত্যাশাকে জাগিয়ে রেখেও মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্য, বিশেষত গল্প কি দিতে পেরেছ বাঁক বদলের ইঙ্গিত? অথবা উপন্যাস কি স্বাধীন দেশ-পাওয়ার বিশ্বাসে বদলে নিতে পেরেছে প্রভুদের দেয়া নিজস্ব কাঠামোকে?

অথচ মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সাহিত্যকে দিয়েছে জীবন। ভাষা আন্দোলনে পূর্ব বাংলার বাঙালি মানস যদি প্রাণ পেয়ে থাকে, তবে সে প্রাণে চলমানতা সঞ্চার করেছে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ফলে সাহিত্য তথা জনজীবন যেভাবে প্রণোদিত হয়েছে তা বাঙালির জীবনে আর কোনো ঘটনায় ঘটেনি। সেখানে প্রত্যশাও তাই শিখর ছুঁয়ে থাকে।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: