মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাদার্ন ভিউ প্রকল্প

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫
  • মিলু শামস

ঘটনা শুরু বেশ ক’দিন আগে থেকে। ফাহিমের মনে হচ্ছিল তার অবয়ব ক্রমশ বদলাচ্ছে, কথা বলতে গেলে মুখ সুচালো হয়, শব্দ বেরোয় না। নাকের দু’পাশে চিকন শুঁড় লিকলিক করে। যা কিছু ধরতে যায় ধরা যায় না। দু’হাত সরু সুতার মতো বাতাসে দোলে। পাও যেন পরিচিত প্রকরণে কাজ করে না আর। হাতের মতোই সরু হয়। এ অনুভূতির কথা সে লুকিয়ে রাখে নিজের ভেতর। কারও সঙ্গে শেয়ার করে না। সবচেয়ে কাছের বন্ধু শাকিল কিংবা প্রেমিকা নবনীর সঙ্গেও না।

নবনী যে কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে কাজ করে তাদের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড সুনামে নবনীর অবদান কম নয়। কাজের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, কোম্পানির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে কোম্পানির সঙ্গে নিজের ব্যক্তিসত্তা একাকার করে দেয়ার অবিরাম প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করেছে কোম্পানিও। সদ্য তাকে দক্ষিণ এশিয়া জোনের বাংলাদেশ শাখার চীফ মার্কেটিং অফিসার পদে প্রমোশন দেয়া হয়েছে।

ফাহিমও সদাগরি আপিসে হরিপদ কেরানি নয়। প্রথম সারির আবাসন কোম্পানির সেলস উইংয়ে দায়িত্বশীল পদে কাজ করে। কথা সেটা নয়, ওই বদলে যাওয়া নিয়ে বিব্রত সে। দেশী-বিদেশী বন্ধুদের নিয়ে নবনী যেদিন প্রমোশন সেলিব্রেটের প্রথম পার্টি ডেকেছিল বিপত্তি ঘটেছিল সেদিন।

সাদার্ন ভিউ প্রকল্পের শেষ বাধা সেদিন দূর হয়েছে। তিনটি প্রতিবন্ধকতার জন্য দীর্ঘদিন প্রকল্পের পুরো কাজই প্রায় আটকে ছিল। এ ধরনের বেশ কয়েকটা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বেশিরভাগই টাকা-পয়সা লেনদেনে শেষ হয়েছে। এককালীনই পরিশোধ করেছে কোম্পানি। আর যাই হোক, টাকা-পয়সা নিয়ে ছোটলোকি পছন্দ নয় এমডির। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসীদের মধ্যেও কোম্পানি সুনাম কুড়িয়েছে। কিছু টাকার জন্য তা নষ্ট করা যায় না। যারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কোন না কোনভাবে তারা এখানকার আবাস তুলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বেঁকে বসে প্রকল্পের মাঝ বরাবর তিনটি পরিবার। কোন কিছুর বিনিময়েই পূর্বপুরুষের ভিটার আবেগ ছাড়তে রাজি নয় তারা। প্রথমে বাজারদর অফার করেছিল কোম্পানি। গা করেনি তারা। এরপর দ্বিগুণ, তিনগুণ, শেষ পর্যন্ত তারও বেশি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের এক কথাÑ আবেগের কোন বিনিময় মূল্য হয় না। অতএব বাধ্য হতে হয়েছিল কোম্পানিকে।

এত বড় প্রকল্প লোকসানে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বোর্ড মিটিং থেকে সিদ্ধান্ত এসেছিলÑ একবারে নয় এ্যাকশনে যেতে হবে সময় নিয়ে। পর্যাপ্ত বিরতির পর পর। প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এতে আপাতত পিছিয়ে যাবে তা যাক। লাভ-ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাবে প্রফিট এতেই বেশি। আর গুডউইলের ব্যাপার তো রয়েছেই। কোনভাবেই তা নষ্ট করা যাবে না। ধৈর্য এবং গুডউইল ব্যবসায়ের অন্যতম মূলধনÑ এমডি দৃঢ় গলায় বলেছিলেন। টেলিভিশন, রেডিও, বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন যেমন চলছে চলবে। পুরনোগুলোর পাশাপাশি নতুন বিজ্ঞাপনে যেতে হবে এবং টেলিভিশনের প্রাইম টাইমে প্রচার নিশ্চিত করতে হবে। সাদার্ন ভিউর আগমনী বার্তার টানটান ইমেজ থেকে দর্শকের মনোযোগ সরানো যাবে না। তা প্রকল্প বাস্তবায়নে যত দেরিই হোক। বিজ্ঞাপনের বর্ণাঢ্যে সম্ভাব্য ক্রেতার স্বপ্নের সিঁড়ি তরতর করে আকাশ ছোঁবে। সুন্দর একটি ফ্ল্যাটের অভাববোধ তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।

সেদিন বোর্ড মিটিংয়ে ফাহিমসহ আরও অনেকে উপস্থিত থাকলেও এমডি তার দুই সহযোগী নিয়ে একান্তে আরেক মিটিংয়ে বসেছিলেন। খুব জরুরী কিছু হলে এ ধরনের গোপন মিটিং হয়।

ফাহিমরা এটুকুই শুধু জানতে পারে। ওখানে আলোচনা কী হয়, সিদ্ধান্ত কিংবা কর্মপরিকল্পনাÑ কিছুই জানা যায় না। অবশ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বড়সড় কোন পরিবর্তন বুঝিয়ে দেয় মিটিংয়ের বিষয়বস্তু কী ছিল। এবারও তাই হলো। তবে এবারের ঘটনার ব্যাপ্তি ধারণ করা ফাহিমের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বোর্ড মিটিংয়ের মাস চারেক পর সেদিন ছুটির দিনের শুরুটা ঢিলেঢালাভাবে হলেও সন্ধ্যায় নবনীর নিমন্ত্রণে যাওয়া নিয়ে খানিক উত্তেজনাও ছিল। বিশেষ করে পার্টির বিষয় যখন প্রমোশন সেলিব্রেট। কিছুদিন ধরে ওই অদ্ভুত অনুভূতি হওয়ায় স্বস্তিতে ছিল না ফাহিমের মন। বহুদিন পর সকালটা একটু অন্যরকম শুরু হয়েছিল। মনে মনে গোটা দিনের পরিকল্পনা ছকে নেয়। ব্রেকফাস্ট সেরে হেয়ার ড্রেসারের কাছে গিয়ে হেয়ার ট্রিটমেন্ট ও ফেসিয়াল। তারপর উষ্ণ পানিতে লম্বা শাওয়ার। তারপর...

টেলিভিশনের স্ক্রলে চোখ আটকে যায় ফাহিমের। ‘গত রাতে পিকনিক থেকে ফেরার পথে মারাত্মক দুর্ঘটনায় তিন পরিবারের নয়জন নিহত।’

তিন পরিবার! হৃৎপি-ে রক্ত ছলকে ওঠে। সাদার্ন ভিউ কেন্দ্র করে তাদের অফিসে এ শব্দ দুটো এখন বার্নিং ইস্যু। টেলিভিশনের কোন চ্যানেলে নিউজটাইম এখন? কিছুতেই মনে পড়ছে না। ফাহিম দৌড়ে গিয়ে ল্যাপটপ খোলে। অনলাইন পোর্টালে পেয়ে যায় বিস্তারিতÑ তিন প্রতিবেশী পরিবার চন্দ্রায় পিকনিক করে মাইক্রোবাসে ফিরছিল। আরিচা রোডের ব্যাংকটাউন ও ফুলবাড়িয়ার মাঝামাঝি পৌঁছালে বালিভর্তি দুটো ট্রাক মাইক্রোবাসে পেছন থেকে পর পর ধাক্কা দেয়। ড্রাইভারসহ গাড়িতে মোট তেরোজন ছিল। ড্রাইভারও ঘটনাস্থলে নিহত। বেঁচে যাওয়া তিনজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় সাভার ঈমান আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে দু’জন শিশু একজন নারী। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন অবস্থা আশঙ্কাজনক। চব্বিশ ঘণ্টা পার না হলে...

ফাহিমের চেতনা মুহূর্তে বিবশ। অদ্ভুত সেই অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়ে শূন্যে ভাসে সে। শেকড়হীন। অবয়বহীন। নিজের অবস্থান ঠাওরাতে পারে না। সে কি বিকশিত সভ্যতার আরিচা রোডের নির্জন বাঁকে নাকি বিকাশমান নিউ ওয়ার্ল্ডের কৃষ্ণাঙ্গবাহী জাহাজের খোলে? নাকি কলম্বাসের সঙ্গে পৌঁছে গেছে আন্দেজ, গুয়াতেমালা কিংবা মেক্সিকোর ইন্কা, মায়া, আজটেক সময়ে?

দস্যু কলম্বাস যাদের রক্তের ধারার ওপর গড়েছিল ‘নতুন দুনিয়া’। সেকি তলিয়ে গেছে সেখানে? নাকি চাপা পড়েছে সাদার্ন ভিউ’র নগরায়নের নিচে? গত রাতে যেখানে একটি বসতির ইতিহাস মুছে গেল।

॥ দুই ॥

‘এসো এসো ফাহিম, চিয়ার আপ।’ এমডির ড্রয়িং রুমে পা দিয়ে ফাহিম থ। সফ্ট মিউজিক, হার্ড ড্রিংকস আর আলো-আঁধারির স্বপ্নময়তায় শুধু এমডি নন, ভাসছে তার দুই সহযোগীসহ অফিসের আরও ক’জন। -‘জেনে খুশি হবে আগামীকাল থেকে সাদার্ন ভিউ’র কাজ পুনরুদ্যোমে শুরু হচ্ছে।’ গম গমে গলায় বলেন এমডি। -অনেক দেরি হয়েছে। পুষিয়ে নিতে দু’গুণ তিন গুণ এফোর্ট দিতে হবে। সেভাবে তৈরি রাখতে হবে নিজেকে।’

আবার আক্রান্ত ফাহিম টের পায় নাকের দু’পাশে তেলাপোকার মতো চিকন শুঁড় গজিয়েছে। হাত নেই। পা নেই। মেরুদ- নেই। সে তো তেলাপোকাই আসলে।

তাহলে... তাহলে...

ফাহিম যাচ্ছে ডাইনিং টেবিলের তলা দিয়ে... চেয়ারের পায়া ঘেঁষে স্টোরের নির্জন কোনার দিকে। তেলাপোকাদের নিরাপদ আবাস খুঁজে পায় সে।

রাতে নবনী এসে নিয়ে যায় তাকে। তার পার্টিতে সেদিন যাওয়া হয়নি ফাহিমের। ‘আশা করছি সামনের সপ্তায় মিটিংয়ে উপস্থিত থাকবে ফাহিম।’

যাওয়ার আগে এমডিকে বলে যায় নবনী, বহুজাতিক কর্পোরেট অফিসের সফল কর্মকর্তা। ফাহিম এখন তার তত্ত্বাবধানে।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: