কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মেছুনি কালকেউটে ও জলাশয়ের গল্প

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫
  • স্বদেশ রায়

সে এক আশ্চর্য জলাশয় ছিলো, সূর্য আর চাঁদের আলোর

ঝরণায় ঝাঁক বাঁধা রূপালী মাছের দেহ আর জলের কণা

মিলে হয়ে উঠতো রুপোর কাজ করা এক নিপুণ হাতের নকশীকাঁথা।

খয়েরি, সবুজ, সোনালী বুনোহাঁস পাখনার উদ্দাম উচ্ছ্বাস তুলতো

সারাদিন ওই জলাশয়ে। পানকৌড়ি, বিলবিলি পাখির ডুবসাঁতার,

জলের গভীর থেকে মায়ের ঠোঁটে নিয়ে আসা রূপালী, সোনালী মাছ

আর তা নিয়ে কত কাড়াকাড়ি নতুন পাখনার ছানাদের

কাকচক্ষু জলে সারাদিন এসব খেলা দেখতে দেখতে সূর্য যেতো পশ্চিম

আকাশে হেলে, তার লাল আলোর আভায় গৃহস্থ বাড়ির মরাল

উঁচু গলায় যেতো ভেসে, ময়ূরপঙ্খীর ছন্দ তুলে-যেন রাজকুমারকে

নিয়ে যাচ্ছে সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে রাজকন্যার খোঁজে।

আঁধার রাতে জলাশয়ের পানিতে নামতো গভীর সুন্দর কালো নীরবতা

কেউ ভাঙতো না ওই নীরবতা, মাছেরাও তখন নীরবে করতো চলাচল

পাছে ঘুম ভেঙে যায় জলের। ওই নীরব সুন্দর আঁধারে নিজের

শরীরের ঘোর কালো ভয়াবহ অন্ধকার নামিয়ে মেছুনি কেউটে

লখিন্দরের বাসরে প্রবেশের কুটিল চোখে আলোহীন সর্পিল পথে

এক রাতে এসে স্থান গাড়ে জলাশয়ের পাশে ভেঙ্গে পড়া এক খাদে।

জলাশয়ের রূপালী, শুভ্রদেহী মাছেরা একে একে শিকার

হতে থাকে মেছুনির বিষাক্ত দাঁতে, যারা বেঁচে যায় তাদেরও শরীর

হয়ে ওঠে নীল বিষে জর্জরিত। পানকৌড়ি, আর বিলবিল পাখি

কোন এক রাতের আঁধারে বাতাসে শাঁ-শাঁ শব্দ তুলে চলে যায়

জলাশয় ছেড়ে দূর কোন এক সবুজ বন আর জলাশয়ের আশায়।

সবুজ আর সোনা রঙের রানীর মত মাছরাঙারা মরে ভেসে থাকে ওই জলে।

প্রতি অমাবস্যায় মেছুনি কালকেউটে পাড়তে থাকে শত শত ডিম

আরেক অমাবস্যার নিকষ অন্ধকারে কিলবিল করে বেরিয়ে আসে

কেউটের বাচ্চারা তাদের বিষাক্ত নতুন দাঁত নিয়ে। জলাশয়ের

মাছেরা এখন ভীত-সন্ত্রস্ত সাঁতারে চলে, পাশে কিলবিল করে

মেছুনির কালো কালো সন্তানেরা- তাদের বিষাক্ত দাঁত আর

কুটিল চলাচলে, গৃহস্থের মরাল অনেক আগেই গিয়েছে

এ জলাশয় ছেড়ে। এখন বাতাসেও ভাসে মেছুনি কেউটের

বিষের গন্ধ। ভয়েও জলাশয়ের পাড় মাড়াতে চায় না নরম শ্যামল

পায়ের গাঁয়ের বধূরা, যাদের শরীরের ঢেউ মিলে যায় জলাশয়ের

ঢেউয়ের সাথে। এমনি ওই দম বন্ধ হয়ে আসা গুমোট

বিষাক্ত বাতাসে দিন ও রাত মিলিয়ে, মেছুনির ছোবল ভ্রক্ষেপ না করে

ওই জলাশয়ের পাড়ে বসে অদ্ভুত এক মানুষ, যার চুলে সমুদ্রের ঢেউ

চোখে সূর্যের গড়ন, হাতের পেশীতে জেগে উঠেছে পাথরের শিলা

আর নদীর পাড় ভাঙ্গা মাটির চাঁই- সে এঁকে চলেছে এক ছবি;

যেখানে রঙ ও তুলির টানে জলাশয় হয়ে উঠেছে দুগ্ধদাত্রী মায়ের দেহ,

যার জলের প্রতিটি রেখা জড়িয়ে ধরেছে বড় এক মেছুনি কাল কেউটে

আর তার শত শত কালো কালো সন্তানেরা অবিরাম ফুটিয়ে যাচ্ছে

বিষাক্ত দাঁত মায়ের দুগ্ধ আধারের প্রতিটি কোষে কোষে।

আরেক দিকে একটি মানবী হাত বিশাল থেকে বিশাল হচ্ছে

দারুণ দৃঢ়তায়, কোন সশস্ত্র সৈনিকের পদক্ষেপে নয়,

সন্তানের মাথায় অভয় হাত রাখা মায়ের বীরত্বে-

একটি একটি করে সাপ মুক্ত করে এগিয়ে যাচ্ছে

তোবড়ানো মুখে বের হয়ে আসা লক লকে দাঁতের মেছুনি

কালকেউটের গলা টিপে উপড়ে ফেলতে, শিল্পীর তুলির

টানে প্রতি মুহূর্তে বীর মাতৃহাতে শক্তির রেখা উঠছে জেগে।

জলের রেখাকে জড়িয়ে ধরা মেছুনি ও তার বাচ্চাদের

দাঁতের ছোবলে কালো হয়ে যাওয়া রূপালী মাছগুলো

শিল্পীর রেখায় ভর করে আশ্রয় নিচ্ছে ওই নির্ভয় মাতৃহাতের নিচে

আর দূরে কাঁখে কলসী নিয়ে গাঁয়ের বধূদের অপেক্ষার চোখ

চেয়ে আছে অদ্ভুত ওই মানুষটির তুলির দিকে, কখন তাঁর

রঙ শেষ হবে, কখন মেছুনি কাল কেউটের গলার ওপর

গিয়ে পড়বে ওই বীর মাতৃহাত, কখন তাঁর তুলির টানে আবার

জলাশয়ের জল হবে কাকচক্ষু, গাঁয়ের বধূ কলসীর জল ভরার ছন্দে

জলাশয়ে বাজবে জলতরঙ্গ, তার কাঁখের কলসী গাইবে ছলাৎ ছলাৎ।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: