কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

যে আঁধার আলোর অধিক

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫
  • তাপস মজুমদার

বর্তমান নিবন্ধটি প্রকৃতপক্ষে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত নিবন্ধ ‘সব ক’টা জানালা...’র সম্প্রসারণ অথবা আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণও বলতে পারেন। পূর্ব প্রকাশিত ওই নিবন্ধে আমরা মূলত রাজধানীর অনতিদূরে সাভারে সুমহান মহীমায় অধিষ্ঠিত ও প্রতিষ্ঠিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ নিয়ে মোটামুটি আলোকপাত করেছিলাম। সেইসঙ্গে এও বলার চেষ্টা করেছি যে, জাতীয় স্মৃতিসৌধের সুউচ্চ সাতটি স্তম্ভ মূলত বাঙালীর মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সাতটি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিকী উপস্থাপনা। পর্যায়গুলো হলো যথাক্রমে- ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬’র শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬’র ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি ১৯৭১’র সুমহান মুক্তিযুদ্ধ। স্তম্ভগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোটটি ’৫২ এবং সর্বাধিক উঁচুটি ঘোষণা করছে ১৯৭১’র বিজয়বার্তা।

স্বাধীনতার ৪৪ বছরে পদার্পণের প্রাক্কালে সেক্ষেত্রে এ প্রশ্ন সকল স্তরে, বিশেষ করে সচেতন পাঠকের মনে জেগে ওঠা স্বাভাবিক যে, আমাদের দৈনন্দিন, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সর্বোপরি রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্দোলনের সূচক সে সব ঐতিহাসিক পর্যায়ের কতটা অর্জিত হয়েছে অথবা কতটা এখনও অনর্জিত! খুব সহজ ও সাদামাঠা বাংলায় এসবের তাৎক্ষণিক উত্তর অন্তত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নঞর্থক হওয়াই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। ভাষার মাস গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পত্রপত্রিকা ও বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বাংলা ভাষার ব্যবহার এবং এর শুদ্ধ চর্চা নিয়ে নিশ্চয়ই নানা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এবার আবার দীর্ঘদিন পরে হলেও বাংলা একাডেমি একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করেছিলÑ যেখানে দেশ-বিদেশের অনেক প-িত ও সুবক্তা সমবেত হয়েছিলেন। এতকিছুর পরও যে প্রশ্নটি অনিবার্য সামনে এসে দাঁড়ায় তাহলো এতদিনেও কি আমরা বাংলা ভাষারীতি ও বানান কাঠামোর কোন পরিশুদ্ধ সর্বজনীন রূপ গ্রহণ ও অনুসরণ করতে পেরেছি? পশ্চিম বাংলার কথা বাদ দিলেও বলতেই হয় যে, এমনকি বাংলাদেশেও এর একক ও সর্বজনগ্রাহ্য কোন স্ট্যাণ্ডার্ড গড়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে ইংরেজী স্ট্যা-ার্ড শব্দটি ব্যবহার করেছি ভেবে-চিন্তেই। সেই যে বলেছি, সর্বজনগ্রাহ্য ও গ্রহণযোগ্য- বানানে ও ভাষ্যে! বাক্যগঠনে ও ক্রিয়াপদে! বিশেষ্য ও বিশেষণের ব্যবহারে! সর্বোপরি সর্বনামে! বর্তমানে যা কিছু চলছে, সবই যেন নিপাতনে সিদ্ধ! তবে এ অবস্থা ও স্বেচ্ছাচার আর কতদিন?

এবার আসি শিক্ষায়। শিক্ষা আন্দোলন হয়েছে সেই ১৯৬২ সালে। আবছা আবছা হলেও মনে আছে, সে সময়ে সম্ভবত পড়ছি চতুর্থ শ্রেণীতে। বই-খাতা বগলদাবা করে আমরাও সেই শৈশবে সামিল হয়েছি মিছিলে-সেøাগানে। ব্যস্, ওই পর্যন্তই। শিক্ষাটা শেষ পর্যন্ত কিন্তু অর্জিত হয়নি। বরং এখনও পর্যন্ত অধরা অনির্ধারিত সেই অনিবার্য অধিকার শিক্ষার পেছনে অনেকটা অন্ধের মতো ছুটে চলেছে পুরো দেশ ও জাতি। এখন তো আরও হতাশ ও অবাক হয়ে দেখছি যে, শিক্ষা দূরে থাক, বরং অশিক্ষা ও অজ্ঞানতা যেন পুরো গ্রাস করতে সমুদ্যত জাতিকে। আমরা যেন ফিরে যেতে চাইছি মধ্যযুগীয় এক অজ্ঞেয় অন্ধকারে, উটের গ্রীবার মতো তমসাচ্ছন্ন ভয়াভয় অতীতে, যেখানে কেবলই কুসংস্কার, কুযুক্তি, কুতর্ক এমনকি ধর্মীয় উন্মাদনার অহেতুক প্রাবল্য। এ থেকে মুক্তির উপায় কি, অন্তত আমাদের জানা নেই। হায়, কে জানে?

অথচ কাগজে-কলমে দেখতে পাই যে, শিক্ষাক্ষেত্রে যেন বিপ্লব ঘটে গেছে! সবার জন্য শিক্ষা- সেøাগান হিসেবে যে খুবই মুখরোচক সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তবে? স্বাধীনতার পরে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে সরকারী ও জাতীয় পর্যায়ে। সরকার আসে, সরকার যায়। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের সরকার আর এর প্রতিপক্ষ সরকার। তথাকথিত রাজনৈতিক ও সামরিক সরকার। গণতন্ত্রের পরিবর্তে একনায়কতন্ত্র তথা স্বেচ্ছাচারতন্ত্র। এর অনিবার্য প্রতিফলন ঘটেছে শাসনতন্ত্র ও শিক্ষানীতিতেও। আগের কমিশন ভেঙ্গে গঠিত হয়েছে নতুন কমিশন। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে কমিশনেরও রদবদল ঘটেছে। অদল-বদল হয়েছে শিক্ষানীতিতেও। এমনকি পাঠ্যপুস্তকে, সিলেবাসেও। বহুকথিত ও তথাকথিত পণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যেও নানা মত, নানা পথ। তবে এ সব মত ও পথ আদৌ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, বরং বড় বেশি কণ্টকাকীর্ণ, জটিল, বহুধাবিভক্ত এমনকি উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এ সব ক্ষেত্রে যুক্তি ও স্বচ্ছতার ন্যূনতম মূল্য নেই। সুতরাং শিক্ষা থেকে মুল্যবোধ তথা ভ্যালুজ পুরোপুরি অপসারিত। যুক্তির স্থান দখল করলো কুযুক্তি। বিতর্কের বদলে প্রতিষ্ঠিত হলো কুতর্ক। আলোর পরিবর্তে হাতে ধরিয়ে দেয়া হলো অন্ধকার। সংস্কারের পরিবর্তে কুসংস্কার। বিদ্যার পরিবর্তে অবিদ্যা। এখন সর্বত্র-সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত অবিদ্যারই প্রাধান্য ও জয়জয়কার। শিক্ষা গেছে অস্তাচলে ও নির্বাসনে।

এমনিতে অনেক ভাল ভাল কথা শোনা যায় সরকারী প্রচারযন্ত্র ও সমীক্ষায়। সবার জন্য শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা অর্জন, স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, ছাত্র-ছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার হ্রাস, মিডডে মিল, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, উপবৃত্তি ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রাথমিক, জেএসসি, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে সুউচ্চ পাসের হার, জিপিএ-৫ তথা মেধার উল্লম্ফন, বেশকিছু সংখ্যক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ততোধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, বিপুলসংখ্যক মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজ, প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, নার্সিং ও প্যারামেডিক্যাল ইনস্টিটিউট ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনতে খুব ভাল শোনায় বৈকি! তবে সত্যি বলতে কী, এ সবই হয়েছে মাশরুম গ্রোথ- একেবারে ব্যাঙের ছাতার মতো। মাথায় ছোট বহরে বড় বাঙালী সন্তান- ঘটে বুদ্ধি তথা মান বলতে কিছু নেই। এ সব কাগুজে তথ্য-পরিসংখ্যানে সরকারের কিছু সুবিধা হয় বাজেট প্রণয়ন ও বরাদ্দে। বিশ্ব ব্যাংক ও দাতা সংস্থার প্রশংসা ও অনুদান পেতেও সুবিধা হয় বৈকি। অমর্ত্য সেনসহ বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদরা মাঝে মধ্যে প্রশংসাও করেন। বাস্তবে এবং প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মান কিন্তু আদৌ অর্জিত হয় না। কেননা তথ্য-পরিসংখ্যান কখনই মান নিশ্চিত করে না; বরং তা কেবলই একটি সংখ্যাসূচক, যা আর্থিক বরাদ্দকে আপাতদৃষ্টিতে বাড়িয়ে দেখালেও মূল্যস্ফীতি ও আনুষঙ্গিক বিবেচনায় প্রকৃতপক্ষে কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি দুর্নীতি ও অনিয়মের পথকেও প্রশস্ত করে তোলে।

এক পরিসংখ্যানে দেখতে পাচ্ছি যে, দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক লাখ ১৪ হাজার ১১৪টি। এছাড়া সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেশকিছু সংখ্যক কওমী মাদ্রাসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে। এক্ষেত্রে মোটা দাগে একটি প্রশ্ন, এত সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কতটির অবকাঠামো পর্যাপ্ত ও মানসম্মত? খোদ রাজধানীতেই যখন ভাড়া বাড়িতে বিপুলসংখ্যক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ দেখতে পাচ্ছি প্রতিনিয়ত, সেখানে ঢাকার বাইরের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে এমন অনেক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, যেগুলোর অবকাঠামো বলে প্রকৃতপক্ষে কিছু নেই। এর পাশাপাশি নেই শিক্ষক, টুল, বেঞ্চ, ব্লাকবোর্ড ইত্যাদি উপকরণ। এখনও এমন অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল ও দুর্গম চরাঞ্চল রয়েছে যেখানে কেউ স্কুলের নাম-গন্ধও জানে না। সে সব স্থানে প্রকৃতিই অবারিত পাঠশালা। আসমানীদের ছাউনির মতো অনেক বিদ্যালয়ই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারাদেশে। আর বরাদ্দ যাচ্ছে বৃথাÑ অশিক্ষা, অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের অন্ধ অলিগলিতে। প্রতিবছর প্রায় ১২ কোটি বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিতরিত হচ্ছে সারাদেশে- সরকারের এক মহাসাফল্য হিসেবে। এর পাশাপাশি ছুটছে গাইড বই, নোটবই, কোচিং সেন্টার। ইদানিং সৃজনশীল শিক্ষার নামেও যা করা হচ্ছে, সেটাও একরকম তামাশা বৈ কিছু নয়। বড়জোর শ’পাঁচেক টাকার বই বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে গছিয়ে দিয়ে পরোক্ষভাবে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে হাজার হাজার টাকার গাইড বুক ও কোচিং সেন্টারের ভয়াবহ হাতছানি এবং প্রলোভন। যেন সহজ শিক্ষার বিকল্প নেই কিছু। শিক্ষা মূলত পর্যবসিত হয়েছে নিছক বাণিজ্যে। বেকারদের কর্মসংস্থান তথা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। বেকার আছো- কোন চিন্তা নেই। খোল কোচিং সেন্টার। লেখো সৃজনশীল নোট ও গাইড বই। লক্ষ কোটি টাকার দুর্নিবার হাতছানি কেউ উপেক্ষা করবে, সাধ্য কী? এর পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাঁধে চাপানো হয়েছে অহেতুক বই ও ব্যয়ের বোঝা! শিক্ষা যে এত ব্যয়বহুল হবে, তা আগে কে জানত? এটা জানলে বোধ করি, যোগীন্দ্রনাথ-বিদ্যাসাগর মহাশয় আদর্শলিপি, বাল্যশিক্ষা লিখতেন না; রবীন্দ্রনাথ লিখতেন না সহজপাঠ, চারুপাঠ ইত্যাদি। অতঃপর বঙ্কিমী ভাষায় দুঃখ করে বলি, ‘হায় শিক্ষা তোমার দিন গিয়াছে’।

বর্তমানে পাসের নামেও যা হচ্ছে, সে আর এক তামাশা। ডাবল ডাবল জিপিএ-৫, ডাবল ডাবল পাস। তথাকথিত গোল্ডেন জিপিএর ছড়াছড়ি। ‘ভি’ চিহ্নে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়-গণমাধ্যম সয়লাব। মুহূর্তে মিষ্টির সব দোকান ফাঁকা। অনতিপরেই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভর্তি হওয়ার জন্য হাহাকার, আর্তনাদ, অনশন, ধর্মঘট, ভাংচুর আরও কত কী! সকলই গরল ভেল।

অহেতুক আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। বরং বহুকথিত একটি রবীন্দ্রবচন দিয়ে শেষ করি আজকের মতো: ‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি/ সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?’... খুবই দুঃখ ভারাক্রান্ত ও বেদনামথিত চিত্তে লিখতে বাধ্য হচ্ছি যে, আসলে কোন দুর্জ্ঞেয় কারণে আমরা শিক্ষার দরজাটি বন্ধ করে দিয়েছি। অতঃপর সেখানে অনিবার্যভাবে সত্য তথা আলোর প্রবেশাধিকার হয়েছে অবরুদ্ধ। এর পরিবর্তে অনিবার্য ঢুকে পড়ছে মধ্যযুগীয় অশিক্ষা, অবিদ্যা, অজ্ঞানতা ও অন্ধকার। কবে যে এই দুঃসহ পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে দেশ ও জাতি মুক্তি পাবে, কে জানে?

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: