মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিন্দিত মাহমুদুল্লাহ এখন নন্দিত তারকা

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৫
  • মোঃ মামুন রশীদ

ক্যারিয়ারের কঠিন একসময়ে ক্যারিয়ার নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। পুরো একটা বছর নিজেকে সেভাবে মেলে ধরতে পারেননি। সে সময় জাতীয় দলের সহঅধিনায়কও হয়েছিলেন। কিন্তু সেটাই যেন কাল হয়ে উঠেছিল ময়মনসিংহের এ ক্রিকেটারের জন্য। ব্যাটে ধারাবাহিকতার অভাব, বাজেভাবে আউট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে চরম সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। অনেক লেখালেখিও হয়েছে তাঁকে দলে রাখা নিয়ে। তবে বাজে সময়ের ফাঁড়াটা কাটিয়ে উঠেছেন। দারুণভাবে সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন ব্যাট হাতেই। বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে শুধু শতকই হাঁকাননি টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে অন্য এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। দেখিয়েছেন ধারাবাহিকতার চরম নিদর্শন। এবার বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে সফলতম ব্যাটসম্যান তিনি। দেশের ইতিহাসে বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বাধিক রান করেছেন। ৬ ম্যাচে ৩৬৫ রান করেছেন মাহমুদুল্লাহ। এ কারণে নিন্দিত এ ক্রিকেটার এখন বিশ্বব্যাপী হয়েছেন নন্দিত তারকা। ব্যাটিংয়ে ধস ঠেকানোর যোগ্যতা দিয়ে নাম কিনেছেন ‘মি. ডিফেন্ডেবল’ হিসেবে। আর দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাও দেশে ফিরে প্রথম নামটা নিলেন দলের সাফল্যের পেছনে মাহমুদুল্লাহর ব্যাটিং সাফল্যের। দিলেন ১০০ নাম্বার। মাহমুদুল্লাহর ব্যাটিংয়ে চমৎকৃত হয়ে ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীও জানালেন এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহ।

২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করেন মাহমুদুল্লাহ। টানা ১৫ ইনিংসে পারেননি কোন ফিফটি হাঁকাতে। ওই সময় মুশফিকুর রহীম ছিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক। ২৯ অক্টোবর ২০১৩ থেকে ২৬ নবেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত ১৫ ইনিংসে কোন অর্ধশতকও হাঁকাতে পারলেন না। রান করলেন মাত্র ১৬.২১ গড়ে ২২৭! এ সময়সীমার মধ্যেই তাঁকে দলে রাখা নিয়ে অনেক সমালোচনা হলো। অনেকে এমনটাই বলাবলি করতে লাগলেন অধিনায়ক মুশফিকের জন্যই দলে এখনও বাজে ফর্ম নিয়েও টিকে আছেন তিনি। কারণ মুশফিক তাঁর আত্মীয়। দু’জনের জীবনসঙ্গিনী পরস্পরের সহদোরা। এত সমালোচনা নিয়ে নিজেকে ফিরে পাওয়ার জন্য কঠিন শ্রম দিয়েছেন মাহমুদুল্লাহ। অবশেষে নিজেকে ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দেন জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে গত বছর নবেম্বর-ডিসেম্বরে ঘরের মাটিতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে সিরিজ থেকে। যদিও প্রথম তিনটি ম্যাচ ভাল যায়নি। করেছেন ১, ১২ ও ৩৩*। তবে শেষ দুই ওয়ানডেতে ৮২ ও ৫১ রানের দুটি অপরাজিত ইনিংস খেলে ঘুরেই দাঁড়ালেন মাহমুদুল্লাহ। প্রমাণ দিলেন এই সামর্থ্যরে জন্যই তিনি দলে টিকে আছেন। অবশ্য ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তনটাও ফলপ্রসূ হয়েছে তাঁর জন্য। শেষ দুই ওয়ানডেতে তিনি ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়েছেন চার নম্বরে। চিরাচরিত নিয়মে আগে তিনি ৬ কিংবা ৭ নম্বর পজিশনেই ব্যাট করতেন।

জিম্বাবুইয়ে সিরিজটাই ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে গেল মাহমুদুল্লাহর জন্য। পজিশনে পরিবর্তন আসল পরবর্তী সময়ের জন্য। লেট অর্ডার থেকে টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান হয়ে গেলেন। এবার বিশ্বকাপেও পজিশনটা ধরে রাখলেন। আর তাঁর ওপর যে আস্থা ছিল সেটারও যোগ্য প্রতিদান দিলেন তিনি। যদিও প্রথম দুই ম্যাচে ২৩ ও ২৮ রানের দুটি মামুলী ইনিংস খেলেই বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু এরপর টানা ভাল ইনিংস বেরিয়ে আসল মাহমুদুল্লাহর উইলো থেকে। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৬২ বলে ৬২ রানের কার্যকরী এক ইনিংস খেলে দলকে ওয়ানডে ইতিহাসে নিজেদের সর্বাধিক এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড স্থাপনে উজ্জ্বল ভূমিকা রাখলেন। এটাই বুঝি প্রয়োজন ছিল তাঁর। এরপর আর মাহমুদুল্লাহকে দমিয়ে রাখা যায়নি। আটকাতে পারেননি ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের বাঘা বাঘা বোলাররাও। টানা দুটি শতক হাঁকালেন। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অবশ্যই জিততে হবে এমন এক ম্যাচে ক্যারিয়ারের প্রথম শতক হাঁকালেন তিনি। আগের ১১৩ ওয়ানডেতে ১২ অর্ধশতক থাকলেও সেঞ্চুরির দেখা পাননি। কিন্তু এদিন ১০৩ রানের ইনিংস খেলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে শতক হাঁকানোর গর্বিত মালিক হয়ে গেলেন মাহমুদুল্লাহ। চাপের মধ্যে থেকে খেলেছেন দলের বিপদের মুহূর্তে দারুণ এক ইনিংস। ১৩৮ বলে ৭ চার ও ২ ছক্কায় ১০৩ রান করে সাজঘরে ফিরে যান তিনি। কিন্তু দলের জয়ের জন্য কার্যকর ইনিংস খেলে ভিত গড়ে দিয়েছেন। তাঁর ব্যাটিংয়ে মুগ্ধ গাঙ্গুলী বলেন, ‘তামিম এবং সাকিব খুব ভাল ব্যাটসম্যান। কিন্তু ধারবাহিকতার দিক থেকে বিবেচনা করলে মাহমুদুল্লাহ তাঁদের চেয়ে ভাল। মুশফিকও ধারাবাহিকভাবে ভাল করেন। কিন্তু বাংলাদেশ দলের জন্য এখন মাহমুদুল্লাহ অনেক বড় খেলোয়াড়। আগে তাঁকে পরের দিকে ব্যাটিংয়ে নামানো হতো। কিন্তু এখন তাঁকে টপঅর্ডারে পাঠানোর সিদ্ধান্তটা অনেক ভাল হয়েছে।’ পরের ম্যাচে আবারও শতক। এবার কিউইদের বিরুদ্ধে খেললেন অপরাজিত ১২৮ রানের দারুণ এক ইনিংস। টানা তিন ম্যাচে শুরুতেই দুটি উইকেট খুইয়ে বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং ধস ঠেকিয়েই দিলেন না মেরামত করে তৈরি করে দিলেন বড় সংগ্রহ গড়ার রাস্তা। তাই নাম পেয়ে গেলেন ‘মি. ডিফেন্ডেবল’। কোয়ার্টারেও দারুণ খেলছিলেন। তবে আম্পয়ারের ভুল সিদ্ধান্তে ২১ রানের যবনিকা ঘটে মাহমুদুল্লাহর বিশ্বকাপ অভিযানে। মি. ডিফেন্ডেবল দ্রুত ফিরে যাওয়ায় আর বাংলাদেশের ইনিংস মেরামত করার কেউ ছিল না। বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ ভারতের কাছে হেরে।

মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ এ দুই তারকাই এখন বাংলাদেশ দলের অন্যতম ভরসার নাম। মুশফিক অনেক আগেই মিডলঅর্ডারে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে তকমা পেয়ে গেছেন ‘মি. ডিপেন্ডেবল’ আর মাহমুদুল্লাহ নাম কামিয়ে ফেললেন ‘মি. ডিফেন্ডেবেল’। রক্ষাকর্তার মতোই কাজ করেছেন। বিশ্বকাপে টানা দুই শতক হাঁকিয়ে তিনি বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানদের কাতারে নিজের নাম লিখে ফেলেছেন। তবে এবার শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা টানা চার শতক হাঁকিয়ে ওয়ানডের বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। সে প্রসঙ্গে গ্রুপপর্ব শেষে দেশসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় তাঁর আরও শতক হাঁকানোর ক্ষমতা রয়েছে। যদি সাঙ্গাকারা পারেন তবে মাহমুদুল্লাহ কেন নয়?’ ভুল সিদ্ধান্ত সেটা হতে দেয়নি। তবে ফিরে পেয়েছেন নিজেকে দারুণভাবে। তাই সব নিন্দার ঝড়কে কবর দিয়ে এখন মাহমুদুল্লাহ নিন্দিত। সেজন্য দলের শ্রীলঙ্কান কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহেকে বিশেষ ধন্যবাদ দিয়েছেন তিনি। কারণ হাতুরাসিংহে দলের সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন একই সঙ্গে দু’ধরনের মানসিকতা না রাখতে। আর সেটাই কার্যকরী হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত ১২ মাস আমি প্রত্যাশা অনুসারে নৈপুণ্য দেখাতে পারিনি, খুব কঠিন সময় গেছে। সেটাই আমার ক্যারিয়ারের শিক্ষার সময় ছিল। নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি এ সময়ে। অনেক সমালোচনাও শুনতে হয়েছে। এটা আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি ভাল করতে পারি সেটা দেখাতে পেরে এখন খুব ভাল লাগছে।’ অধিনায়ক মাশরাফিও তাঁর অবদানকে ভুললেন না স্বীকার করতে। দেশে পা রাখার পরই গণসংবর্ধনা পেয়েছে বাংলাদেশ দল। বিমানবন্দরে মাশরাফি বলেন, ‘মাহমুদুল্লাহ যা করেছেন সেটা অবিস্মরণীয়। তাঁকে আমি ব্যাটিংয়ের জন্য একশ’তে একশ’ দেব।’ ৬ ম্যাচে ৭৩.০০ গড়ে ৩৬৫! নন্দিত তারকা হওয়ার মতোই পারফর্মেন্স। এবার সামনের দিকে যাওয়ার লক্ষ্য। প্রত্যাশা নিয়ে তাঁর ব্যাটের দিকে আগামীতে অধীর হয়ে তাকিয়ে থাকবে পুরো একটা জাতি। সে জাতির নাম ক্রিকেটপাগল বাংলাদেশ!

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৫

২৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: