রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শুরু হোক নতুন স্বপ্ন

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৫
  • তোফায়েল আহমেদ রবিন

বিশ্বকাপে সমর্থকদের প্রত্যাশার পুরোটা বাস্তবায়ন করেই দেশে ফিরেছে মাশরাফি বিন মতুর্জার দল। শুধু প্রত্যাশা পূরণ কেন, এবারের আসরে বিশ্বমঞ্চে যেন নিজেদের নতুন করে চিনিয়েছে টাইগাররা। সবাই দেখেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন রূপ। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে যে বাংলাদেশকে আগে কখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে দেখা যায়নি, সেই বাংলাদেশ এবার প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে লড়েছে বুক চিতিয়ে। গ্রুপ পর্বে সহযোগী দুই দেশ আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ডের সঙ্গে শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ অফ ডেথ হিসেবে পরিচিত ‘বি’ গ্রুপ থেকে প্রথমবারের খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। ক্রিকেট বিশ্বে আরেকবার সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাওয়ার। কোয়ার্টারে ভারতের বিপক্ষে আম্পায়ারদের পক্ষপাতের কাঁটায় না বিঁধলে স্বপ্ন পূরণের গল্প অন্যরকমও হতে পারত। তবু যেটুকু অর্জন নিয়ে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ তা নিয়েও সত্যিকার অর্থে গর্ব করার আছে অনেক।

শুধু দল হিসেবে নয় টাইগাররা এবার নিজেদের চিনিয়েছেন আলাদা করে। বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে পর পর দুটি সেঞ্চুরি করে বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি কেড়েছেন ময়মনসিংহের ছেলে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। তরুণ তুর্কি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সৌম্য সরকার ও সাব্বির রহমান। রুবেল হোসেনের পারফরম্যান্স নিয়ে আলাদা করে মন্তব্য করতে দেখা গেছে সাবেক তারকা ক্রিকেটারদের। তাসকিনকে অনেকেই দেখছেন ভবিষ্যতের গতি তারকা হিসেবে। মাশরাফি, মুশফিক, সাকিবরাও ছিলেন সমহিমায়। সবমিলিয়ে দল এবং ব্যক্তিগত দুই দিক থেকেই সবার দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছেন ক্রিকেটাররা। দেশে ফিরার পর বিমানবন্দরে দলীয় এবং ব্যক্তিগত অর্জনে ভাস্বর টাইগারদের তাই বিজয়ের মালা পরিয়েই বরণ করে নিতে হয়েছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যে ছবিটা কল্পনায় এঁকে রেখেছিলেন অনেকে।

এবারের আসরে টাইগারদের লক্ষ্য ছিল যে করেই হোক কোয়র্টার ফাইনালে খেলা। তবে সেই লক্ষ্য পূরণের পথে কাঁটা ছিল অনেক। বিশেষ করে গ্রুপে দুই স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পাশাপাশি ছিল যেকোন কন্ডিশনেই ভয়ঙ্কর শ্রীলঙ্কা এবং ইংল্যান্ড। শেষ আটের লড়াইয়ে এই চার দলকেই গ্রুপ ‘বি’ থেকে এগিয়ে রেখেছিল সবাই। কন্ডিশন এবং উইকেটের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ ছিল হিসেবের বাইরে। তার ওপর গত বছরের দুস্মৃতিকে পেছনে ফেলে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে করা পারফরম্যান্স বিশ্বকাপে টেনে নেয়া যাবে কিনা সে নিয়েও ভয় ছিল। টাইগাররা সব ভয়কে জয় করেছে, প্রমাণ দিয়েছে নিজেদের সামর্থ্যরে। টেস্ট মর্যাদার পনেরো বছর হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড কন্ডিশনে টেস্ট কিংবা ওয়ানডে কোনটিই খুব বেশি খেলার সুযোগ মিলেনি টাইগারদের। হাতেগোনা যে কয়েকটি সিরিজ খেলার সুযোগ মিলেছে তার সবই আবার হতাশার অন্য নাম হয়েছিল। যা কখনোই নতুন স্বপ্ন দেখার আশার জন্য আশা জাগানিয়া নয়। অস্ট্রেলিয়ায় যেখানে সর্বশেষ ২০০৮ এবং নিউজিল্যান্ডে ২০১০ সালে সফর করেছিল বাংলাদেশ সেখানে টাইগারদের জন্য ভাল পারফর্ম করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার ওপর আগের বছরটি কেটেছে কেবল হতাশা আর নানা বিতর্ককে সঙ্গী করে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বহু অর্জনের সিরিজও তাই আশার পালে হাওয়া লাগানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। সেখানে কোয়ার্টর ফাইনাল খেলে টাইগারদের দেশে ফেরাটাকে অনেক বড় অর্জনের পাশাপাশি নতুন স্বপ্ন দেখার অনেক বড় এক অনুঘটকই বলতে হবে।

নিজেদের পঞ্চম ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্নকে মুঠোবন্দী করেছিল বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচটি তাই শুধুই আনন্দের উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অপ্রতিরুদ্ধ কিউইদের বিপক্ষে হেরে গেলেও সে ম্যাচে টাইগারদের দাপুটে পারফর্মেন্স প্রমাণ করে দিয়েছিল যোগ্য দল হিসেবেই পরের পর্বে খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারতের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি তাই হাজির হয়েছিল অন্য রকম রোমাঞ্চ নিয়ে। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডের মঞ্চে সেই রোমাঞ্চের মাঝে অবশ্য জ্বল ঠেলে দিয়েছিল আম্পায়াররা। যে কারণে প্রত্যাশিত নৈপুণ্যের দেখা মিলেনি টাইগারদের কাছ থেকে। অনেকটাই নীলনক্সার ম্যাচে নিজেদের খারাপ দিন মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত বিষাদ বদনে মাঠ ছাড়তে হয়েছে টাইগারদের। তবু বিশ্ববাসীর ভালবাসা আর মন জয় করেই দেশে ফিরত এসেছে বাংলাদেশ। পারফর্মেন্স দিয়ে নজর কাড়ার পাশাপাশি গ্যালারিতে রুবেল-তাসকিনদের নিয়ে লেখা তরুণীদের নানা আকুতিগুলোও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের নিয়ে আগ্রহের নতুন বিজ্ঞাপন হয়ে আছে।

দেশে ফিরে বিমানবন্দরে অধিনায়ক মাশরাফি মর্তুজা দেশবাসীকে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, ‘সত্যি বলতে এবার আমরা ২৯ মার্চ পর্যন্ত খেলার লক্ষ্য নিয়েই গিয়েছিলাম। আগামী বিশ্বকাপেও নিশ্চয়ই শেষ পর্যন্ত খেলার চেষ্টা করব। সে জন্য আমাদের আরও বেশি পেশাদার হতে হবে।’ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ মাতিয়ে আসা দলের তরুণ ক্রিকেটাররাও শুনিয়েছেন নতুন দিনের গান। তাদের সবার প্রত্যাশা ২০১৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে খেলা। এবারের বিশ্বকাপে টাইগারদের যে পারফর্মেন্স তাতে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগুলো সেই স্বপ্ন দেখা অবাস্তব কিছু নয়। কিন্তু সে জন্য প্রয়োজন এখনই লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং সে অনুযায় পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। যার শুরুটা হওয়া প্রয়োজন খুব দ্রুত, কেননা আগামী বিশ্বকাপ র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে দলগুলোর জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হতে যাচ্ছে। আইসিসি অনেকটা ঘোষণা করে দিয়েছে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকেই বদলে যাচ্ছে টুর্নামেন্টটির ফরম্যাট, যেখানে দশ দল নিয়ে আয়োজিত হবে বিশ্বকাপ। নির্দিষ্ট সময়ে র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা আটে থাকা দলগুলো সরাসরি চূড়ান্ত পর্ব খেলার সুযোগ পাবে। বাকি দুটি দল নির্ধারণ করা হবে বাছাই পবের্র মাধ্যামে। অর্থাৎ সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে হলে দ্রুত র‌্যাঙ্কিংয়ে ওপরে ওঠে আসতে হবে টাইগারদের। অন্যথায় বাছাই পর্বের ঝামেলা পোহাতে হতে হবে সাকিব-মুশফিকদের। র‌্যাঙ্কিংয়ে টাইগারদের বর্তমান যে অবস্থা তাতে করে এমুহূর্তে সরাসরি মূলপর্বে খেলার অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। তাই এখন টাইগারদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত এ বছরের মধ্যেই ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করা। দেশের মাটিতে কয়েকটি সিরিজ থাকায় সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নও অসম্ভব কিছু নয়। তবে সে জন্য অবশ্যই বিশ্বকাপে ভাল খেলার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। বিশ্বকাপের সাফল্য আসছে সিরিজগুলোতে বয়ে নিয়ে যেতে পারলে খুব সহজেই র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি সম্ভব।

পারফর্মেন্সের কারণেই এবারের বিশ্বকাপ টাইগারদের জন্য সাফল্য ম-িত হয়ে আছে। এবারের সাফল্যকে এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে টাইগারদের সেরা সাফল্য বলেই মনে করছেন অনেকে। তবে সাফল্যের মাঝেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে টাইগারের দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছে এই আসরেও। বিশেষ করে রানিং বিটুইন দ্য উইকেট, ওপেনিং এবং ফিল্ডিং ব্যার্থতা। যা কাটিয়ে ওঠতে না পারলে বড় দলগুলোর বিপক্ষে সাফল্য পাওয়া কঠিন হবে টাইগারদের জন্য। নিজেদের দুূর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে আগামীর লক্ষ্যে টাইগাররা এখনই কাজ শুরু করবে এটাই এখন প্রত্যাশা সবার।

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৫

২৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: