মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সমঝোতার পথে ইরান ও বিশ্বশক্তি

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৫
  • আতাউর রহমান রাইহান

ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একটি চুক্তি সই হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। শনিবার হাফিংটন পোস্ট পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। কিন্তু ছয় জাতির (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি) সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইরান এখনও প্রয়োজনীয় ছাড় দেয়নি বলে উল্লেখ করেন ওবামা। তবে ওবামা এও বলেন যে, কয়েকটি বিষয়ে আলোচনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসায় চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ সময় তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট সব বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোন চুক্তি হওয়ার কথা আগেভাগেই বলা যাচ্ছে না। ৩১ মার্চের মধ্যেই একটি কাঠামোগত চুক্তি করতে ইরান ও ছয় জাতির আলোচনা চলছে।

গেল ২৪ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় অনুষ্ঠিত পারমাণবিক বিষয়ের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইতিবাচকভাবে সাড়া দিয়েছে। দেশ দুটি এমন একটি চুক্তির পথে হাঁটছে, যার আওতায় তেহরান অন্তত আগামী ১০ বছর পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম হবে না। তবে ওই সময়ের পর দেশটি আবার এর পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে পারবে। জেনেভায় দুই দিনের একটি বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ। বৈঠক শেষে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনও অনেক পথ যেতে হবে। ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় ওয়াশিংটন সবচেয়ে কঠিন ইস্যুগুলোর কয়েকটিতে শাণ দিতে সক্ষম হয়েছে। তাই সমাধানের পথে কাজ করার পথটা সুগম হয়েছে। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফও। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, পি৫+১ ভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের, বিশেষ করে মার্কিনদের সঙ্গে গত কয়েক দিনে আমরা আন্তরিকতাপূর্ণ আলোচনা করেছি। ... তবে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অনেক পথ বাকি কূটনীতিকরা বলছেন, ছয় বৃহৎ শক্তি একটি ১০ বছরমেয়াদি চুক্তির পথেই হাঁটছে। এ চুক্তি মানলে ইরান আগামী ১০ বছরে বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট উপাদান মজুত করতে সক্ষম হবে না। ওই সময়ের পর দেশটি আবারও ধীরে ধীরে তার সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে। চুক্তিতে ইরান কত মাত্রা পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে, এ কাজে কতগুলো সেন্ট্রিফিউজ রাখতে পারবে ইত্যাদি কঠোরভাবে নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তার মানে, একটি মাত্র পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চাইলেও তার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করতে ইরানকে এখন থেকে অন্তত ১২ মাস অপেক্ষা করতে হবে। পাশ্চাত্যের কূটনীতিকরা এমনটাই চেয়ে আসছেন।

ইরান আগে থেকেই বলে আসছিল, তাদের কর্মসূচি নিয়ন্ত্রিত রাখার সময়টা কোনমতেই ১০ বছরের বেশি হওয়া চলবে না। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল ২০ বছর। অর্থাৎ সময়ের ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য আপস করতে যাচ্ছে। তবে মার্কিন কংগ্রেস ও ইসরায়েল তাৎক্ষণিকভাবেই এ সমঝোতার সমালোচনা করেছে। তাদের ভাষ্য, ১০ বছরের সময় কাঠামো পর্যাপ্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ মনে করা হয়ে থাকে। আলোচনায় ইরানের সঙ্গে সন্তোষজনক ফল পাওয়া না গেলে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে আসছে ইসরাইল।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে পাশ্চাত্যের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে আসছে। পাশ্চাত্যের সন্দেহ, তেহরান পরমাণু কর্মসূচির আড়ালে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে ইরান। দেশটির ভাষ্য, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি তারা বিদ্যুত উৎপাদন বা চিকিৎসাসেবার মতো কাজে ব্যবহার করতে চায়।

এদিকে যে কোন শর্তেই বিশ্বশক্তিগুলো ইরানকে পরমাণু কর্মসূচী অব্যাহত রাখার অনুমতি দিলে সৌদি আরব ও অন্যান্য রাষ্ট্রও একই অধিকার চাইবে বলে জানিয়েছেন সৌদি আরবের এক জ্যেষ্ঠ যুবরাজ। তবে এতে পরমাণু প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। সোমবার বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে সৌদি যুবরাজ তুর্কি আল-ফয়সাল এসব কথা বলেছেন।

বর্তমানে সৌদি সরকারের কোন উচ্চপদে না থাকলেও প্রভাবশালী এই যুবরাজ এক সময় দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। তাঁর কথায় সৌদি রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আমি সবসময়ই বলে আসছি, আলোচনাতে যে সিদ্ধান্ত হবে, আমরাও সেই অধিকার চাইব, বলেছেন তুর্কি। ইরানকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করে সৌদি আরব। পরমাণু চুক্তি হলে ইরান পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ করার সুযোগ পেয়ে যাবে বলে মনে করছে সৌদি আরব। এছাড়া ইরানের ওপর থেকে রাজনৈতিক চাপ সরে গেলে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের অবারিত সুযোগ পাবে বলে আশঙ্কা করছে সৌদি আরব। পরমাণু কর্মসূচীর জ্বালানি সমৃদ্ধ করার অজুহাত ব্যবহার করে গোপনে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বশক্তিগুলো। এ থেকে ইরানকে বিরত করার লক্ষ্যে দেশটির ওপর বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ জারি রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো। নিষেধাজ্ঞার চাপে ফেলে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করার শর্তে ইরানকে রাজি করাতে জার্মানিসহ পাঁচ বিশ্বশক্তি (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন) ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

পরমাণু অস্ত্র নির্মাণের অভিযোগ অস্বীকার করে অর্থনীতিকে প্রায় পঙ্গু করে ফেলা নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে ইরান। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মাধ্যমে পরমাণু কর্মসূচী নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্ব শক্তির একটি চুক্তি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি যুবরাজ বলেছেন, ইরান যে কোনো পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি পেলে, শুধু সৌদি আরব একাই একই অধিকার চাইবে না, আরও অনেক দেশই চাইবে। এতে কোন বাধা ছাড়াই এই পথটি পুরো বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়বে, আর এই সম্ভাবনাই ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের চলমান আলোচনা বিষয়ে আমার প্রধান আপত্তি, বলেছেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ সৌদ আল ফয়সালের ভাই তুর্কি আল ফয়সাল।

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৫

২৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: