মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

যমুনাপাড়ে নারী শিক্ষার আলো- কমছে ঝরে পড়া, বাল্য বিয়ে

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০১৫
যমুনাপাড়ে নারী শিক্ষার আলো- কমছে ঝরে পড়া, বাল্য বিয়ে
  • বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ ও পোশাক

বাবু ইসলাম ॥ যারা কোন দিনই স্কুলে যাবার কথা ভাবেনি, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছিল না। সেই অবহেলিত জনপদে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে। স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুরা শিক্ষার আলোয় এখন আলোকিত হয়েছে। কমে এসেছে বাল্য বিয়ের প্রবণতা। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে, ঘরে ঘরে নারী শিক্ষার বাতি জ্বলেছে। ভবিষ্যত আরও উজ্জ্বলতর হবে এমনটাই প্রত্যাশা এলাকার গরিব অসহায় মানুষের। পারিবারিক উদ্যোগে গড়ে ওঠা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আনসারি ফাউন্ডেশন পরিচালিত মল্লিকা ছানাউল্লাহ আনসারি উচ্চ বিদ্যালয় এখন শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। আশপাশের দশ গ্রামের নদীভাঙ্গা অসহায় মানুষের ভবিষ্যত গড়ার পথ দেখিয়েছে। অভাবগ্রস্ত ও সুবিধা বঞ্চিত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ ছেলেমেয়ে বর্তমানে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে যমুনার তীরে আধুনিক নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত সিরাজগঞ্জের রামগাতি গ্রামে অভাবগ্রস্ত অবহেলিত পরিবারের সন্তানদের জন্য গড়ে উঠেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। স্থাপিত হওয়ার এক যুগ পেরুনোর আগেই এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানুষের নজর কেড়েছে। প্রশাসনসহ শিক্ষা বিভাগের আস্থাভাজন হয়েছে।

এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরুর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের কোরান থেকে তেলাওয়াত, শপথ বাক্য পাঠ এবং জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়া হয়। মল্লিকা-ছানাউল্লাহ আনসারি নামের এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশুরা অদম্য উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পড়ালেখা করছে। প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা অভাবগ্রস্ত পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া অলীক বিলাস বা দুঃস্বপ্নের মতো মনে হলেও তা এখন সম্ভব হয়ে উঠেছে। তারা বই-পুস্তক, শিক্ষা উপকরণ এমনকি পোশাক বিনামূল্যে পেয়ে পড়ালেখায় মনোযোগী হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক এবং উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে অভাবের তাড়নায় ঝরে পড়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে। পারিবারিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘আনসারি ফাউন্ডেশন’ নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান এ শিক্ষা বিস্তারে সহায়তা দিচ্ছে। ঠিক সকাল ১০টায় এক ঝাঁক শিশু-কিশোর তাদের বিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড়িয়ে কোরান থেকে তেলাওয়াত, শপথ বাক্য পাঠ এবং জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন শেষে যে যার ক্লাসে যাচ্ছে। এটি তাদের প্রতিদিনের ক্লাস শুরুর রুটিন। ২০০৪ সালে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে এর গোড়াপত্তন হয়। পায়ে পায়ে এগিয়ে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো মাধ্যমিক স্তরের এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পায় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত এ শিক্ষার্থীরা শতকরা ৯০ ভাগ উত্তীর্ণ হয়ে নিজেরা আলোকিত হয়েছে এবং পরিবারকেও আলোকিত করেছে। এরপর ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে এসএসসি এবং জেএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসের সুনাম কুড়িয়েছে।

যমুনার ভাঙ্গনে সর্বস্বহারা মানুষের বেশিরভাগ সন্তানেরাই এ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার আগে এ অঞ্চলের শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে ঝরে পড়তো। দূর-বহুদূরে উচ্চ বিদ্যালয়ে যাওয়ার খুব ইচ্ছা হতো না কিংবা আর্থিক দুরবস্থায়, যাতায়াতের সমস্যায় পড়ালেখার পাঠ চুকে যেতো। অনেকেই আবার অশিক্ষার কারণে বাল্য বিয়ের পিঁড়িতে বসে অল্প বয়সে সংসারের ঘানি টানতে শুরু করতো। এমনই এক পরিস্থিতিতে ২০০৪ সালে সিরাজগঞ্জের সন্তান অধ্যাপক এম এইচ মিল্লাত প্রবাসে বসে যমুনাপাড়ের এ অভাবগ্রস্ত এলাকায় ঝরে পড়া শিশুদের পড়ালেখার সুবিধা দিতে প্রথমে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় চালু করেন। তার মা মল্লিকা বেগম ও পিতা মরহুম ছানাউল্লাহ আনসারির নামানুসারে পারিবারিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আনসারি ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এ বিদ্যালয় পরিচালিত হয়ে আসছে। পরবর্তীতে এটি উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সিরাজগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডাঃ হাবিবে মিল্লাত মুন্না জানানÑ যমুনাপাড়ের সুবিধাবঞ্চিত অবহেলিত শিশুদের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে এ প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ পারিবারিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আনসারি ফাউন্ডেশন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পোশাক, শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষকসহ স্টাফ বেতন আনসারি ফাউন্ডেশন থেকে খরচ করা হয়। যমুনার ভাঙ্গন কবলিত এ এলাকায় ১০ বছর আগেও এসএসসি পাস কোন ছেলেমেয়ে ছিল না। এ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অনেক ছেলেমেয়ে এসএসসি পাস করে কলেজে পা রেখেছে। গ্রামে গ্রামে সচেতনতা গড়ে উঠেছে। বাল্য বিয়ের প্রবণতা কমেছে। ঝরে পড়া শিশুরা পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছে। অভাবগ্রস্ত ও সুবিধাবঞ্চিত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ ছেলেমেয়ে বর্তমানে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়া লেখা করছে।

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০১৫

২৪/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: