মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

স্বাধীনতার গল্প

প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০১৫
স্বাধীনতার গল্প
  • খন্দকার জিয়া হাসান

১৯৯৬ সালে ভোরের কাগজে কানাডিয়ান একটি ছেলেকে নিয়ে বিশাল প্রতিবেদন বের হল। ছেলেটি কানাডা থেকে ঢাকায় এসে প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করে জানাল, সে এই মাটির সন্তান, এ দেশের সন্তান। সে এই দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ফসল। ১৯৭২ সালে জন্মের পর একটি কানাডিয়ান পরিবার তাকে দত্তক নেয় এবং তাকে তাদের অন্য সন্তানের সাথে মানুষ করে। ১৯৯৬ সালে ২৪তম জন্মদিনে তার কানাডিয়ান বাবা-মা তাকে তার প্রকৃত মায়ের দেশের কথা জানায়। তার দত্তক মা তাকে বলে, ‘তোমাকে তোমার গল্পটি না জানালে আমাদের মধ্যে একটি অপরাধবোধ থেকে যেত, তাই তোমাকে এটা জানালাম। তোমাকে আমার নিজের সন্তানের মত বড় করেছি, তুমি যদি এখন আমাদের ছেড়ে চলে যাও তাহলে আমি মরে যাব।’ নিজের জীবন নিয়ে এমন একটি গল্পের ধাক্কা সহ্য করে ছেলেটি বলল, ‘মা, আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবনা। আমাকে শুধু একবার অনুমতি দাও মায়ের দেশটি দেখার এবং যদি সম্ভব হয় মায়ের কবরটিও খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো।’ এই হচ্ছে প্রতিবেদনটির সারমর্ম। ছেলেটির নাম রায়ান গুড। প্রতিবেদনটি পড়ে চোখের পানি আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। চাপা একটা কষ্ট হচ্ছিল বুকের ভেতর। হাজার হাজার রায়ান গুডও আমাদের স্বাধীনতার অংশ। প্রজন্ম ৭১ এর এই অংশটিকে আমরা হয়তো ভুলেই গিয়েছি। আশা করেছিলাম, ভোরের কাগজ স্টোরিটা ফলো আপ করবে কিন্তু পরে আর রায়ানের বিষয়ে কিছু জানা গেল না। আস্তে আস্তে ভুলে গেলাম রায়ান গুডকে। ১৯৯৮ সালে আমাদের প্রথম সন্তান জন্মাবার কয়েক মাস আগে আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে জানা গেল ছেলে হবে। প্রথম সন্তানের নাম কি রাখা হবে সেটা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে গেল। সে বছর স্টিভেন স্পিলবার্গের “সেভিং প্রাইভেট রায়ান” ছবিটি অস্কার পুরস্কারের ১১টি বিভাগে মনোনীত হয়। স্টার মুভিজে সারাদিন “সেভিং প্রাইভেট রায়ান” এর ট্রেইলার দেখান হতো। হঠাৎ মনে পড়ল, আরে দুবছর আগেই তো আমাদের বীর সন্তান রায়ান গুডের গল্প পড়লাম। স্বাধীনতার এই সূর্য সন্তানকে সন্মান জানিয়ে আমার সন্তানের নামও ‘রায়ান’ রাখিনা কেন? এভাবেই আমরা অন্তত একটি রায়ানকে বুকের মধ্যে ধরে রাখব, আর ভুলে যাব না। ১৯৯৮ সালের অক্টোবর মাসে আমাদের ঘর আলো করে রায়ান জিয়া চলে এলো। রায়ানের বয়স যখন ৬/৭ বছর তখন একদিন তাকে তার নামকরনের গল্প বললাম। সব শুনে সে গম্ভীর মুখে বলল, ‘আমি সেই রায়ান গুডকে দেখতে চাই।’ বললাম, ‘ ইনশাল্লাহ এক দিন তোমাদের দেখা হবে বাবা।’ রায়ানের বয়স এখন প্রায় সতের। মাঝে মাঝেই ভাবতাম, দুই রায়ানের দেখা হবে কি কোনদিন? এ মাসের শুরুর দিকে (মার্চ, ২০১৫) লিঙ্কড-ইনে হঠাৎ করে এক রায়ান গুডের দেখা পেলাম। জানতে চাইলাম বাংলাদেশের সাথে তার কোন যোগাযোগ আছে কিনা। কোন উত্তর দিলনা। এরপর লিঙ্কড-ইনে যতগুলো রায়ান গুড পেলাম সবাইকে একটা কমন চিঠি দিলাম সংক্ষেপে কাহিনীটা জানিয়ে। ৪৮ঘণ্টা পর একজন উত্তর দিল। “ইয়েস জিয়া, ইউ হ্যাভ ফাউন্ড দ্য রাইট ওয়ান।” জানতে চাইলাম, আমার ছেলেকে তোমার সাথে পরিচিত করাতে পারি? বলল, অবশ্যই, ওকে আমার ইমেইল এড্রেস দিয়ে দাও এবং আমাকে লিখতে বল। অবশেষে দুই রায়ানের দেখা হল এবং সেটা স্বাধীনতার মাসেই। রায়ান গুড এবং রায়ান জিয়া দীর্ঘজীবী হোক। স্বাধীনতার দীপ্ততায় উজ্জীবিত হোক তরুণ প্রজন্ম এটাই কামনা। কারণ দেশ নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্বটুকু যে তাদেরই নিতে হবে। সমৃদ্ধ এবং পরিচ্ছন্ন একটি দেশের নতুন সূর্য উদিত হওয়ার সময় হয়েছে।

প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০১৫

২৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: