রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ধর্ষণ শেষে সুমির লাশ ৭ টুকরো করার হোতা মন্টি ক্রসফায়ারে!

প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০১৫
  • নেপথ্যে মাদক অস্ত্র টাকা ক্ষমতা আধিপত্য

আজাদ সুলায়মান ॥ কী নির্মম পৈশাচিকতা! কী বীভৎসতা! কতোটা পাষ- হলে মানুষ এতটা ভয়ঙ্কর ও হিংস্র হতে পারে তা তরুণী সুমির সাত টুকরো লাশ দেখলেই উপলব্ধি করা যায়। যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সুমির লাশের সাতটি টুকরো খুঁজে খুঁজে একত্রে জোড়া লাগিয়ে পূর্ণ তরুণীর রুপ দেয়ার চেষ্টা করেছে, তারাও বিস্মিত হয়েছে, আঁতকে উঠেছে। গণধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা! তারপর এক এক করে সাত টুকরো।

এমন নৃশংসতার শিকার সুমির লাশ যারা দেখেছে তারাই কেঁদেছে। একজন সিপাহী তো রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, এরা কি মানুষ নাকি জানোয়ার? জানোয়ারও এমন কাজ করতে পারে না। মুখম-ল পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে বিকৃত করা, পা দুটো দু’জায়গায়, এক জায়গায়, হাতও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা দু’স্থানে। একটা এই ছাদে আরেকটি ওই ছাদে। খড়কুটোর মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে লুকানো, লাশের খ-গুলো তবুও যেন গর্জে ওঠে। ধামাচাপা দেয়া যায়নি। প্রকৃতির বিচারেই যেন সেটা ফাঁস হয়ে যায়, ধর্মের কল বাতাসে বুঝি নড়ল। ঘাতকরাও রেহাই পায়নি। একটা ধরা পড়েই সব ফাঁস করে দেয়। আরেকটা ধরা খেয়ে ক্রসফায়ারে যায়। এটাই যে প্রকৃতির বিচার। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগেই সুমির ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার সঙ্গে জড়িত একজন মোবারক উল্লাহ মন্টি। শনিবার ভোরে তাকে ধরে নিয়ে যায় র‌্যাব। তারপর ক্রসফায়ার। রবিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গ থেকে যখন মন্টির লাশ বুঝে নেয় তার স্বজনরা, তারাও চরম লজ্জায় পড়ে। মুখ ঢেকে লাশ নিয়ে দ্রুত ত্যাগ করে ঢামেক মর্গ এলাকা। যখন ১৯৩/১ ফকিরাপুলের রোকেয়া মঞ্জিলে নেয়া হয় (সুমিকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাস্থল) তখনও মানুষ ধিক্কার জানিয়ে বাজে মন্তব্য করে। ছিঃ এমন কাজ মানুষে করে। ‘তুই কেন মেয়েটাকে মারলি, কেনই বা ক্রসফায়ার খাইলি’Ñ এমন মন্তব্য ছিল তারই এক নিকটাত্মীয়ের।

র‌্যাব-৩ অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার রবিবার সন্ধ্যায় জনকণ্ঠকে বলেন, এই মোবারক উল্লাহ মন্টিই ছিল সুমিকে ধর্ষণ শেষে জবাই করে লাশ সাত টুকরো করার নায়ক। তার অপর সহযোগী সাইদুল ও সুজনকে আটক করা গেলে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে।

তিনি আরও বলেন, ‘মূলত মাদক, অস্ত্র, ক্ষমতা, টাকা ও অবাধ যৌনতাকে ঘিরেই এ নৃশংসতা। ওরা সবাই মাদকসেবী, তাই এমন জঘন্য ও পৈশাচিকতা সম্ভব হয়েছে।’ এলাকাবাসী জানায়, মন্টিকে ধরা হবে এটা ছিল অবিশ্বাস্য। কেউ বিশ্বাস করতো না। তারা স্থানীয়, প্রভাবশালী। থানা পুলিশ ছিল তাদের কেনা। পুলিশ নিয়মিত তার আস্তানায় আসতো। নিয়মিত মাদক ও নারী ব্যবসার ভাগ নিতো। কিন্তু সুমিকে ধর্ষণ ও তদন্ত করতে গিয়ে র‌্যাব জেনে যায় আদ্যান্ত সব কাহিনী। র‌্যাব-৩ আগে ধরে জাহাঙ্গীর ওরফে বাংলা সোহেল নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে। যার মুখ থেকে সব তথ্য জানতে পারে র‌্যাব। এই জাহাঙ্গীরই জানায় গত ৯ মার্চ কিভাবে ধর্ষণ শেষে সুমিকে হত্যার পর পেট্রোল দিয়ে তার মুখ পুড়িয়ে লাশ টুকরো টুকরো করা হয়েছিল।

জাহাঙ্গীরের জবানবন্দীতে বেরিয়ে আসেÑ সুমী, তার স্বামী নাসির, সাঈদুর, মন্টি ও সুজন, এরা সবাই মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী। তার স্বামী এখন সিলেট জেলে। সেও মাদকসেবী ব্যবসায়ী। এক সময় সুজনের গার্লফ্রেন্ড ছিল সুমি। কিন্তু তাকে ফাঁকি দিয়ে বছর দেড়েক আগে সুমি বিয়ে করে সিলেটের নাসিরকে। সুমি এক সময় পুলিশের সোর্স হিসেবে সাইদুর ও মন্টিকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই থেকে সুমির ওপর ক্ষোভ ছিল তাদের।

এ অবস্থায় সেদিন ৯ মার্চ ১৯৩/১ ফকিরাপুলের রোকেয়া আহসান মঞ্জিলে সুমিকে নিয়ে আড্ডায় বসে তারা। সেখানে সবাই মাদক সেবন করে। এক পর্যায়ে সুমি তার স্বামীর মুক্তির বিষয়টি সামনে আনে। তাতেই ক্ষুব্ধ হন বাকিরা। তারপরও সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এক সঙ্গে ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিল সেবন করেছিল তারা। এক পর্যায়ে মন্টি ও সাঈদুরের কাছে স্বামী নাসিরের মাদক বিক্রির কিছু টাকা পাওনা ছিল বলে দাবি করেন সুমি। নাসিরের জামিন করানোর জন্য সেই টাকা দাবি করেন। তারপরই তার ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সাইদুর, সুজন, মন্টিসহ আরও দু’যুবক। চালানো হয় পালাক্রমে পাশবিক নির্যাতন। তাতেও ওদের উন্মত্ততা দমেনি। শেষে তার গলায় চালানো হয় ছুরি। এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে ঘাতকরা লাশের মুখম-ল পরিকল্পিতভাবে আগুনে ঝলসে দেয়। শরীরের খ-িত অংশগুলো ফেলার সময় যাতে শব্দ না হয় সেজন্য দড়ি বেঁধে কৌশলে নিচে ফেলা হয়। মস্তক ও হাত-পাবিহীন মূল অংশটি পেঁচানো ছিল একটি পুরনো বিছানার চাদরে।

পরদিন ১০ মার্চ বিকেলে রোকেয়া আহসান মঞ্জিল থেকে কাটা ও আগুনে পোড়া মস্তক, ওয়াসার মডস জোন-৬-এর পূর্বপাশে টিনশেড বাড়ির ছাদ থেকে মস্তক ও হাত-পাবিহীন শরীর, ১৬৭/২ হোটেল উপবনের পাশে খোলা জায়গা থেকে একটি হাত ও একটি পা এবং ১৬৭/১ ফকিরাপুলের এশিয়াটিক ল্যাবরেটরি লিমিটেডের টিনশেড বাড়ির ছাদ থেকে আরও একটি হাত ও পা উদ্ধার করা হয়। খ-িত লাশ পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যালে। সেখানে ময়নাতদন্ত করা হয়। তাতে লেখা হয়, খুন হওয়ার আগে ‘মাল্টি সেক্সচুয়াল এ্যাসল্ট’ হওয়ার কথা। ঘটনার প্রায় ৫ দিন পর সুমীর ভাই মামুন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে লাশ শনাক্ত করেন। তিনি লাশ গ্রহণ না করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করান।

জানা যায়, জাহাঙ্গীরের দেয়া তথ্যে র‌্যাব মোবারক উল্লাহ মন্টিকে ধরতে যায়। এ সময় এক বন্দুুকযুদ্ধে মোবারক উল্লাহ মন্টি নিহত হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি পিস্তল ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। টিটিপাড়া বস্তি এলাকায় রবিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

র‌্যাব আরও জানায়, ‘রাতে মন্টির আস্তানা ঘিরে ফেলার পরপরই সে এবং তার সহযোগীরা র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তখন আত্মরক্ষার্থে র‌্যাবও গুলি ছোড়ে। এতে মন্টি গুলিবিদ্ধ হলে বাকিরা পালিয়ে যায়। পরে তাকে পুলিশ ও স্থানীয়রা ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শাহজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক হিমাংশু চন্দ্র সূত্রধর বলেন, টিটিপাড়া বস্তির পাশে র‌্যাব-৩ এর সঙ্গে ভোররাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আনুমানিক ৪৫ বছরের অজ্ঞাত এক ব্যক্তি পড়ে থাকে। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে সাড়ে চারটার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তের জন্য তার লাশ মর্গে রাখা হয়েছে।

প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০১৫

২৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: