মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিক্ষার বিকাশ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন

প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৫
  • ড. মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন খান

২০১০ সালে আমরা একটা যুগোপযোগী শিক্ষানীতি পেয়েছি। বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কুদরত-ই-খোদার নেতৃত্বে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ শিক্ষানীতিতে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এতে প্রাথমিক শিক্ষাকে, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত করা হয়েছিল যাকে ফাংশনাল এডুকেশন নামে অভিহিত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকরা তাঁকে সে সুযোগ দেয়নি। তারপর বেশ কয়েকটি শিক্ষা কমিশন হয়েছে, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে আধুনিক যুগোপযোগী এক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে, যা বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ শিক্ষানীতিতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কেননা দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার প্রত্যেকটি জেলায় কমপক্ষে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রত্যেকটি উপজেলায় অন্ততপক্ষে একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার বাস্তবায়ন ইতোমধ্যেই অনেকটা এগিয়েছে। কিন্তু বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমন তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এ ক্ষেত্রে যুব উন্নয়ন কেন্দ্রসহ আগের কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠানেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। এ কর্মসূচী বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। দেশে সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ কেন্দ্রে একটি করে মোট সাড়ে ৪ হাজার বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। শহর এলাকায় ইতোমধ্যেই বেশকিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। প্রয়োজনে আরও স্থাপন করা যেতে পারে। নার্সিং, প্যারা মেডিক্যাল, মেডিক্যাল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট যেমন আরও স্থাপন করা দরকার তেমনি রেল, নৌ ও সমুদ্র পথের জন্য জনশক্তি প্রশিক্ষণ একাডেমি, ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয়, অনুষদ ইত্যাদি জরুরী ভিত্তিতে গড়ে তোলা দরকার। এছাড়া দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন শাখাগুলোর ওপর নতুন নতুন বিভাগ, অনুষদ খোলা প্রয়োজন। মোট কথা, আমাদের বিপুল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য দেশব্যাপী বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-কারিগরি-বৃত্তিমূলক শিক্ষার এক সুসমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। জমি বাঁচানোর তাগিদে আমাদের দেশের সর্বস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দুই শিফট প্রয়োজনে তিন শিফ্ট চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু ইনভেনটরিসহ ২০-৩০% অতিরিক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ দিলেই হবে।

সরকার গবেষণা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এটা শুভ লক্ষণ। শিক্ষানীতিতেও গবেষণার কথা বলা হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণা অপরিহার্য। চীনাদের মতো আমাদের দেশের বিদ্যমান গবেষণাগারগুলোর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। বসাতে হবে সর্বাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। একইসঙ্গে সর্বশেষ প্রযুক্তিনির্ভর আরও নতুন নতুন গবেষণাগার গড়ে তুলতে হবে। উৎপাদনের সঙ্গে গবেষণার সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাতসমূহে বরাদ্দ হ্রাস করে গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। মহাজোট সরকারের বিগত আমলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল শিক্ষকদের জন্য পৃথক এবং উচ্চতর বেতন কাঠামো প্রদান করার। কিন্তু সরকার সে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে বলে মনে হচ্ছে। মানুষ গড়ার একজন কারিগরকে যদি হাঁড়ির চিন্তা করতে হয় তাহলে সে ভাল পড়াতে-শেখাতে পারেন না, তাঁকে টিউশনি তথা কোচিং-বাণিজ্যের কথা ভাবতে হয় বৈকি। ভারত সরকার এটা বহু আগেই করেছে। আমলারা তখন সর্বোচ্চ বেতনের দোহাই দিয়ে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। সরকার তখন বিভিন্ন ভাতার আকারে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করে, নতুন উচ্চতর বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করেছে। উপমহাদেশে এমনকি শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানও শিক্ষকদের জন্য পৃথক এবং উচ্চতর বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করেছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘুষের বিনিময়ে চাকরি প্রদানসহ হেন কাজ নেই যেখানে ঘুষ দিতে হয় না। সরকার নিয়োগের জন্য বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক কমিশন গঠন করতে চেয়েছিল। কিন্তু কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল তা ভ-ুল করে দেয়। এক্ষেত্রে আমলা-শিক্ষক-রাজনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটা অসৎ চক্র কাজ করছে। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার কারও অন্যায্য আবদার মেনে নিতে পারে না; কোন কায়েমি স্বার্থের কাছে নতিস্বীকার করতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে। একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণে, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে এর কোন বিকল্প নেই।

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ

অর্থনীতি সমিতি

প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৫

২২/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: