মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ই-বুকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সফল ফয়েলস

প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৫
  • মূল : উইল স্মেল
  • অনুবাদ : অঞ্জন আচার্য

একসময় স্যাম হুসাইন নামটি কোন পরিচিত ছিল না। তবে আজ তিনি লন্ডন তো অবশ্যই, বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যবসায় আইকন হিসেবে খ্যাত। দীর্ঘদিন ধরে এ মানুষটি যুদ্ধ করেছেন ই-বুকের বিরুদ্ধে, অনলাইনে পাইকারি বই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এটা সত্য, অনলাইনে ই-বুক আজ বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। স্যাম হুসাইন তা করে দেখিয়েছেন। লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ও সুপ্রতিষ্ঠিত বইয়ের দোকান ফয়েল। বিশ্বখ্যাত বইয়ের দোকানটিকে হুসাইন নতুন করে গড়ে তুলেছেন আধুনিক বিশ্বের পাঠকের রুচি ও মননের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। কিন্তু একসময় তা ছিল না। ব্যবসায়িক লোকসান হতে হতে এক পর্যায়ে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে আজ সেটি কেবল লাভেরই মুখ দেখছে না, বরং অনেকের কাছে সেটি হয়ে উঠেছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইংল্যান্ডের সবচেয়ে পুরনো ও সুপরিচিত ফয়েলস বুকশপ। সেখান থেকে বই কেনা ছিল পাঠকদের জন্য সত্যিই আনন্দের। কেননা ফয়েলসের সংগ্রহের তালিকাটি ছিল বেশ সমৃদ্ধ। নানা স্বাদের বইয়ের সংগ্রহ ছিল সেখানে। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে অদম্য পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানটিকে আগলে রেখেছিলেন ক্রিস্টিনা ফয়েলস। তাঁর ছিল অনন্য কর্মক্ষমতা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি টিকিয়ে রেখেছিল প্রতিষ্ঠানটিকে। তবে ১৯৯৯ সালে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অনেকখানি পাল্টে দিল ফয়েলসের চিত্র। প্রতিষ্ঠানটি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কিছু কারণ অবশ্য ছিল। দোকানটি সাজানো ছিল একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। প্রথমত, ফয়েলস-এ রাখা বইগুলো সাজানো ছিল বইয়ের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে নির্দিষ্ট শেলফে। ফলে পাঠক সহজেই খুঁজে পেতেন তার কাক্সিক্ষত বই। যার কারণে লন্ডনের চেরিং ক্রস রোডের জীর্ণ দোকানটিতে ভিড় করত উৎসুক পাঠকেরা। কিন্তু এত কিছুর পরেও পথে বসতে গিয়েছিল ক্রিস্টিনা ফয়েলসের পাথর ঘেরা প্রতিষ্ঠানটি।

ফয়েলসে কিছু সমস্যা ছিল। সাধারণত ক্রেতা-পাঠকদের দেখে খুশি হতেন না দোকানের কর্মচারীরা। তাদের কাছে ক্রেতারা ছিল অনেকটা উপদ্রবের মতো। ফলে সহযোগী মনোভাব পেত না পুস্তক-ক্রেতারা। এর ফলে ক্রমাগত কমতে থাকে ক্রেতার সংখ্যা। তাছাড়া ক্রিস্টিনা ফয়েলসের কঠোর নীতি কর্মচারীদের কাছে পছন্দসই ছিল না।

ফয়েলস ছিল পারিবারিক পরম্পরায় পাওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ১৯০৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মিসেস ফয়েলসের পক্ষে এমন প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা ছিল খুব চ্যালেঞ্জের। ক্রিস্টিনার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানের সর্বময় ক্ষমতা দেয়া হয় তারই ভাইপো ক্রিস্টোফার ফয়েলসের হাতে। তিনি ক্ষমতা পাওয়ার পরপরই ঢেলে সাজান প্রতিষ্ঠানটিকে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফয়েলসকে করে তোলেন আধুনিক। ব্যবসাতে আনেন নতুনত্ব। ২০০৭ সালে ক্রিস্টোফার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমেই প্রতিষ্ঠানটিকে পরিবারতন্ত্র থেকে মুক্ত করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের প্রধান এক্সিকিউটিভ হিসেবে নতুন একজনকে তিনি নিয়োগ দেন। এই মানুষটির ওপর ন্যস্ত করা হয় ব্যবসার সামগ্রিক নেতৃত্ব। সেই মানুষটিই স্যাম হুসাইন। যা আগে কখনও হয়নি, মিস্টার হুসাইন আসার পর তাই ঘটল। খুচরো বিক্রিতে আনেন তিনি আমূল পরিবর্তন। এর ফলে ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে ফয়েলসের। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে হুসাইনকে নিতে হলো বেশ কিছু নির্মম সিদ্ধান্ত। ৬৭ বছর বয়সী স্যাম হুসাইন বেশ ভাল করেই জানতেন, লন্ডনে কোন ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে কঠোর শ্রমের পাশাপাশি কাজে লাগাতে হয় ব্যাপক প্রচারণা। এই উদ্যোগই গ্রহণ করলেন তিনি, পেলেন সাফল্য। স্যাম এসে পুরনো সেই আদ্যক্ষরভিত্তিক বই বিক্রি শুরু করেন, যা একসময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে আবার আসতে থাকে বইকেনার প্রস্তাব। নতুন করে প্রতিষ্ঠান সাজাতে গিয়ে হাজার হাজার পুরনো বই শেলফে একত্র করা ছিল আরেক বড় সমস্যা। তাতে করে পাঠকেরা সুষ্ঠুভাবে বই কিনতে পারছিল না। মিস্টার হুসাইনের বলেন, ‘এক পাউন্ড কিংবা এর কম মূল্যের বইগুলো সস্তায় বিক্রি করে স্টক খালি করে দিলাম। তারপর অন্যান্য বইয়ের দাম রাখলাম গড়ে ৭ পাউন্ড। এই ধরনের বইয়ের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। পুরনো বইগুলো একে একে শেষ হয়ে গেল।’ এরপর নতুন নতুন বই ও অধিক জনপ্রিয় বইয়ের বিক্রি বাড়িয়ে দেয় ফয়েলস। প্রতিষ্ঠানটির ভবনটি নির্মাণ করা হয় নতুনভাবে। দোকান ব্যবস্থাপকদের দেয়া হয় স্বায়ত্তশাসন। কর্মচারীদের মানসিক উৎকর্ষ সাধনে এটি বেশ সহযোগিতা করে। প্রত্যেক ব্যবস্থাপককে বলার হয়, যার যার কর্নারগুলো সুষ্ঠুভাবে দেখভাল করার। তারা পাঠকের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী পাঠকের সামনে চাহিদামাফিক বই তুলে ধরেন। এভাবে মাস শেষে এর ফলাফল দেখতেন হুসাইন এবং নির্ণয় করতেন সফলতার মানদ-। হুসাইনের মতে, ব্যবস্থাপনা দলটি ছিল চমৎকার। তারা ছিল দক্ষ, কর্মক্ষম ও নিষ্ঠাবান। সুন্দর ব্যবহার ও কাজ করার স্বাধীনতা তাদের এসব প্রকাশ করতে উৎসাহ জুগিয়েছে। ফলে, অনলাইনে বই কেনাবেচার এই জগতে, যেখানে আমাজন দিনকে দিন এগিয়ে চলছে তাদের ই-বুক নিয়ে, সেখানে চার দেয়ালে বন্দী থেকেও মিস্টার হুসাইন ফয়েলসকে দেখাতে পেরেছেন সাফল্যের আলো।

বিবিসি অবলম্বনে

প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৫

২২/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: