মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

চাঁপাইয়ে জোড়া মঠে নারী ভক্তদের ভিড়

প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৫
  • মঠ দুটোর উচ্চতা ৪ ফুটেরও বেশি

হুজরাপুরের জোড়া মঠ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র বড় ঈদারা-ঝিলিম ও আমনুরা রোডের ধারে জোড়া মঠের অবস্থান। শহরের ঐতিহ্যবাহী পুরাকীর্তিসমূহের উল্লেখযোগ্য অবস্থান নিয়ে জোড়া মঠ দাঁড়িয়ে আছে বহুকালের সাক্ষী হয়ে। মঠের উত্তর দিকে শত গজের মধ্যে বয়ে চলেছে মহানন্দা নদী। নদীর তলদেশ থেকে সান বাঁধানো সিঁড়িঘাট দেখে মনে হবে মঠের সঙ্গে এর অবস্থান একেবারে ছোঁয়াছুঁয়ি। মঠের পাশে মন্দির। দুটি অবকাঠামোর পাশাপাশি অবস্থান বাড়িয়েছে সৌন্দর্য, আবার এই ধরনের পাশাপাশি অবস্থান এ অঞ্চলের কোথাও দেখা মেলে না বা দেখা যায় না। জোড়া মঠের চেয়ে বড় মঠ বা মন্দির চোখে পড়ে না। কারণ জোড়ামঠ আবার তার কাছাকাছি মন্দির নির্মাণের দৃষ্টান্ত অতীতে বিরল ছিল। বর্তমানে যা কল্পনাও করা যায় না। মঠ দুটি ও মন্দির কখন নির্মিত হয়েছিল সে সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কোন তথ্য এই প্রজন্মের কাছে নেই। আর এই কারণে বয়স্ক সনাতন ধর্মীদের কাছে নানা ধরনের কাহিনী বা ইতিহাস মিলে কথা বলে। এইসব বেরিয়ে এসেছে আনুমানিক আড়াই শ’ বছর আগে মঠ দুটি নির্মাণ করা হয়। তবে কোন রাজা বাদশা বা জমিদার বা কোন ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেছিল, তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেনি। এটা যে খুবই প্রাচীন এতে কোন সন্দেহ নেই। মঠ দু’টোর উপরে পেতলের পাত দিয়ে তৈরি চূড়া ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে অযতেœ অবহেলায় মঠ দুটির চারদিকে দেয়াল আগাছা ও নানান গুল্মলতা জন্মেছিল। কিছুদিন আগে এটি সংস্কার করে। মহানন্দা নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মঠে এককালে খুব জাঁকজমকের সঙ্গে পূজা অর্চনার উৎসব পালিত হতো তা এক নজর দেখলেই বোঝা যায়। মঠ দুটোর উচ্চতা ৪০ ফুট ছাড়িয়ে গেছে। দুটি মঠের মধ্যেই পাথরের শিব লিঙ্গ আছে। উচ্চতা আনুমানিক দুই ফুট করে। দুটি মঠের মধ্যে দুটি বড় আকারের পাথরের ষাঁড় রয়েছে। তবে শিংওয়ালা ষাঁড়ের মাথা দুটো কে বা কারা ভেঙ্গে ফেলায় বর্তমানে মস্তকবিহীন ষাঁড় দুটি শিবের লিঙ্গ পাহারায় নিযুক্ত রয়েছে, এমনটাই দৃশ্যমান হয়। উল্লেখ্য, বহু আগে থেকেই হুজরাপুর ছিল খুবই সমৃদ্ধশালী অর্থবান হিন্দুদের অবস্থান। জোড়া মঠের কাছাকাছি দুটি বিশাল আকারের পিতল ও তামার (একটির উচ্চতা ৬০ ফুট অপরটি ৩৫ ফুট) রথ ছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছু মুখ চেনা কাঁসা পিতল ব্যবসায়ী পাকি হানাদারদের প্রভাবিত করে রথ দুটি ভেঙ্গে মূল্যবান কাঁসা, পিতল, তামা হাতিয়ে নেয়। এই সময়ে জোড়া মঠ দুটিও ভাঙ্গার পরিকল্পনা নিয়েছিল বর্বর পাক বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর রাজাকার ও তথাকথিত পিস কমিটির নেতাকর্মীরা। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর এগিয়ে আসায় তা আর হয়ে না উঠলেও পাথরের ষাঁড়ের মাথা ভেঙ্গে ফেলে। আজও সেই অবস্থায় রয়েছে। এখনও ফালগুন মাস এলে ভক্তদের ভিড় দেখা যায় মঠের ভিতরে শিব লিঙ্গকে ঘিরে। দুধ, গঙ্গাজল, বেলপাতা, সাধ্যনুযায়ী ফলমূল নিয়ে ভক্তরা পূজা অর্চনা করে থাকে। সাধারণত নারী ভক্তরা নদীতে স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে ঘাট বেয়ে উঠে সোজা মঠে প্রবেশ করে। এই মঠে কোন সেবায়েত বা নির্ধারিত ঠাকুরকে দেখা যায় না। তবে হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত কথামালার মধ্যে যা সর্বশ্রেষ্ঠ তা হচ্ছে সন্তান ধারণ ক্ষমতা যারা হারিয়েছে তারা এই মঠে শিবলিঙ্গের পূজা করলে পুনরায় সন্তান ধারণ ক্ষমতা ফিরে পাবে। প্রবাদ আছে, এই মঠ দুটি যাদের সম্পত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে অতীতে তাদেরই দু’জন অর্থাৎ দুই ভাই ভূপেন্দ্র সিংহ ও বিপদ ভঞ্জন সিংহের দুই স্ত্রী বন্ধ্যা থাকায় তারা ভগবানের কাছে মানত করেছিল তাদের সন্তান হলে মঠ তৈরি করে শিব পুজো করা হবে। পরবর্তীতে ভগবান তাদের ইচ্ছে পূরণ করায় তারা প্রতিশ্রুতি অনুসারে শিবকে খুশী রাখতে দুটি মঠ তৈরি করে তার মধ্যে শিবলিঙ্গ স্থাপন করে পুজোর ব্যবস্থা করেন। মহা ভাঙ্গনের মুখে সেদিনের হুজরাপুর গ্রাস করতে চেয়েছিল মহানন্দা। এক সময়ে স্বপ্নে দেখানো হলো নদীর কুল ঘেঁষে জোড়া মঠ নির্মাণ হলে ভাঙ্গন ঠেকানো যাবে।

-ডিএম তালেবুন নবী চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে

প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৫

২১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: