মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুছে যাচ্ছে ১৫ গণকবর

প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৫
  • মাদারীপুরে আটকে আছে স্মৃতিস্তম্ভ

সংরক্ষণ না করায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে মাদারীপুরের ১৫ গণকবর। পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে আটকে আছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম স্মৃতিস্তম্ভ। স্বাধীনতা অর্জনের ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণের কার্যকর কোন পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। সরকারীভাবে ২০১৩ সালে মাদারীপুরের ১০টি বধ্যভূমি উন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও কোন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। মাদারীপুর গণপূর্ত বিভাগ একটি সমীক্ষা করে তা ঢাকায় প্রেরণ করেছে। যে সকল গণকবর বা বধ্যভূমির নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাতেও রয়েছে স্থান নির্বাচনে ব্যাপক ভুল-ভ্রান্তি। কোন গণকবরে কতজন শহীদের লাশ রয়েছে, কোন তারিখে কিভাবে ঘটনা ঘটেছে তার কোন সমীক্ষা করা হয়নি।

এদিকে ১০ বছর আগে মাদারীপুর স্বাধীনতা অঙ্গনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতার অভাবে স্মৃতিস্তম্ভে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সংবলিত ফলক আজও লাগানো হয়নি। যে কারণে বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভে নাম ছাড়াই কর্মসূচী পালিত হয়। যে সকল পরিবারের সদস্যরা মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তাদের আজও শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, ৪৪ বছরে তাদের পরিবার অবহেলিত এবং অবহেলিত তাদের কবরগুলো।

মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলায় ৭টি এবং রাজৈর উপজেলায় ৮টি গণকবর রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার কুকরাইল মৌজার এ আর হাওলাদার জুট মিলের অভ্যন্তরে বৃহৎ বধ্যভূমি। এখানে ৭শ’ মুক্তিপাগল নর-নারী ও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে নির্যাতনের পর হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়। বর্তমানে স্থানটি গো-চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। মিলের ডি-টাইপ বিল্ডিং-এর টর্চার সেলে অসংখ্য নারীকে মাসের পর মাস আটকে রেখে নির্যাতনের পর হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শহীদ সুফিয়ার পরিবার অন্যতম।

সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের পূর্ব কলাগাছিয়া সুষেন হালদারের বাড়ির পুকুর পাড় বধ্যভূমি। এখানে ৩৫ জন মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়।

সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের তারাপদ শিকারীর বাড়ির পুকুর পাড় বধ্যভূমি। এখানে ৬২ জন মুক্তিপাগল মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়।

সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের মিঠাপুর শিকদার বাড়ি বধ্যভূমি। বর্তমানে এই বধ্যভূমির উপরে গড়ে উঠেছে দ্বিতল ভবন, রয়েছে সরকারী ব্যাংক ও অন্যান্য অফিস। এখানে স্মৃতিফলক নির্মাণের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের মিঠাপুর গোপীঠাকুরের বাড়ির পিছনে পুকুরের উত্তর পাশে বধ্যভূমি। বর্তমানে সেখানে বাঁশঝাড় ও মরিচ-বেগুনের চাষ করা হচ্ছে।

উল্লিখিত দুটি বধ্যভূমিতে ৫১ জন মুক্তিপাগল মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তথ্য অনুসন্ধান করে ৩৮ জনের নাম পাওয়া গেছে। সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের চৌহদ্দি হাটখোলা বধ্যভূমি। এখানে ৩০ জন মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল।

সদর উপজেলার পৌরসভার অধীন কুলপদ্বী সাবেক সরকারী শিশু সদন ভবনের পূর্ব পাশে বধ্যভূমি, যেখানে দোল-যাত্রার ভাঙ্গা মঠ রয়েছে। এখানে ১১ মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়।

রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের কেষ্ট বৈদ্যের বাড়ির পুকুর পাড় একটি গণকবর রয়েছে। এখানে ৭০ মুক্তিপাগল মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়।

রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়নের পাখুলা গ্রামের রাসু গাটিয়ার বাড়ির পুকুর পাড় বধ্যভূমি। এখানে ৩০ মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়।

রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের গণেশ পাগলের সেবা আশ্রমের পূর্ব পাশে, যেখানে মেলা অনুষ্ঠিত হয়, সেই পুকুর পাড় বধ্যভূমি। এখানে ৭৫ মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া হয়।

রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া গ্রামের আলেক ফকিরের বাঁশঝাড় (বুড়ির ভিটা) সংলগ্ন ৩ খালের সংযোগ স্থানে বধ্যভূমি।

রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া গ্রামের সিদ্দিক মাতুব্বরের বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বধ্যভূমি।

রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া গ্রামের শচীন বারিকদারের বাড়ির দক্ষিণ পাশে খালের পাড় (গণেশ বারিকদারের বাড়ির সামনে) বধ্যভূমি।

রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের সেনদিয়া গ্রামের ডা. রাসু বারিকদারের বাড়ির পাশে বাগানের ভিতরের খালপাড় দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বধ্যভূমি।

রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানবাড়ি গ্রামের পূর্ণ চন্দ্র বৈদ্যের বাড়ির উত্তর পাড় পুকুরের মধ্যে বধ্যভূমি।

রাজৈর উপজেলার সেনদিয়া ছাতিয়ান বাড়ি ও পলিতা গ্রামের ৬টি বধ্যভূমিতে ১২৭ নরনারী শহীদের লাশ রয়েছে। এই ৩টি গ্রামে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। টেকেরহাটের চিহ্নিত রাজাকারের সহযোগিতায় পাক সেনা ও তাদের দোসররা ঐ ৩ গ্রামের নিরীহ নর-নারী-শিশুকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। পরে ঐদিন সন্ধ্যায় লাশগুলো উল্লিখিত ৬টি বধ্যভূমিতে মাটি চাপা দেয় গ্রামবাসী। ঐ ঘটনাকে স্মরণ করে স্থানীয় শহীদ পরিবারের সদস্যরা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ২০০৯ সালের ১৪ এপ্রিল সেনদিয়া গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করেন।

ঐ স্মৃতিস্তম্ভে ১২৬ শহীদের নাম সংবলিত একটি ফলক লাগানো হয়েছে। সেদিন গণহত্যার সময় পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা অমূল্য কুন্ডুর ঘরে আগুন দিয়ে ঘরসহ তার বৃদ্ধা মাকে পুড়িয়ে হত্যা করে। বৃদ্ধার নাম না জানার কারণে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে তার নাম খোদাই করা সম্ভব হয়নি।

সুবল বিশ্বাস, মাদারীপুর থেকে

প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৫

২১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: