মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গল্প॥ নানুর হাতে পতাকা

প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৫
  • মোস্তফা হোসেইন

তন্বি আর তন্ময় ঝগড়া করে। আচ্ছা ঝগড়া দেখে কেউ কি হাসাহাসি করে। কিন্তু ওদের ঝগড়ায় মা হাসেন, দাদু হাসেন। আর বাইরের কেউ যদি থাকে তিনিও না হেসে পারেন না। অবশ্য ঝগড়াতে ভাইবোনের তেমন আফসোস নেই। ওদের ঝগড়া থামেও হাসাহাসিতে।

এই যেমন আজকের সকালের ঝগড়ার কথাই ধরা যাক। ঝগড়ার বিষয় তাজরিন। ওই তাজরিন যাকে না দেখলে তুননের ঘুম হয় না। বাড়ি আসার সময় যার জন্য প্যান্টের পকেটে করে ৩টা চকোলেট আনতে হয়, সেই তাজরিন। ঝগড়াটা শুরু হয় আদর নিয়ে। তন্বীর কথা, তাজরিনই সব এই ঘরে। দাদা আসার সময় ওর জন্য চকলেট আনবে। সেই চকলেট খেতে হাত পাততে হবে তাজরিনের কাছে। তন্ময়র কথা- তুই কি আলাদা নাকি- বাবা বাড়ি আসার সময় তোর জন্য আম, কমলা, বড়ই, পেয়ারা যা পায় তাই নিয়ে আসেন। আমাকেও তোর দিকেই হাত পাততে হয়। হাত পাতা নিয়ে যখন ঝগড়া চলে ওই সময় আসে নানুর ফোন। মা, মা ডাকাডাকি শুরু হয় তন্ময়ের। নানু বলেন, একটু তাজরিনকে দিস তো।

তন্ময় তো এমনিতেই রেগে আছে। এবার নানুর ওপর গিয়ে পড়ে সেই রাগ। জবাব দেয়- তোমার যদি তাজরিনকেই দরকার আমাকে ফোন দিলে কেন।

নানু বলেন- তোর সাথেও কথা বলব।

জবাবও তৈরি তন্ময়ের কাছে। সে বলে- আমার সাথে কথা বলার দরকার নেই। এই ধর তোমার মেয়ে এসেছে।

রাগ কমিয়ে দেন মা। বলেন, তোদের নানু বলেছেন বেড়াতে যেতে। যাবি নাকি?

আর যায় কোথায়? পারে তো এখনই জামাকাপড় গুছিয়ে রওনা হয়। কোথায় ঝগড়া কোথায় কী। ওরা প্রস্তুতি নিতে থাকে নানুর বাড়ি যেতে। বিকেলে সবাই মিলে যায় নানুর বাড়ি। নানুর বাড়িটা অনেক বড়। কত গাছ! গাছগুলোতে সারাবেলা পাখিদের ওড়াওড়ি। এডাল ওডালে পাখিদের বাস। আর গাছে গাছে কত যে ফল। সেই নানুবাড়ি গিয়ে গাছের নিচে দৌড়াদৌড়ি খেলা কত মজার। শুধুই বসে থাকলেও মনে হয় মন জুড়িয়ে যায়। দক্ষিণ দিকে অনেকটা জায়গা খোলা। তারপর পাকা রাস্তা। রাস্তার পাশে ছোট নদী। নদীটা খুব বড় না। মাঝিরা এখনও নৌকা চালায় ওই। পাশেই পাকা রাস্তা দিয়ে যায় গাড়ি। মাঝখানে ধানক্ষেত। ধানগাছগুলো বাতাসে দোল খায়। যেন রেশমি চুল। সেই মজার জায়গায় এসে তাদের রাত কাটে গল্প করে। নানুর হাতের মজার মজার খাবার খেয়ে। ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গে পাখির ডাকে। নানুর পিঠা খাওয়ার ডাক শুনে। তারপর কিছু সময় কেটে যায়। এবার বাড়িটা ঘুরতে হবে। ওদিকে বাড়ি থেকে আসার সময় দাদু বার বার বলে দিয়েছেন, দুপুর বেলা যেন পুকুর পাড়ে না যায় ওরা। ভর দুপুরে নাকি ভূত-পেতœীগুলো বেশি খারাপ হয়ে যায়। তাই দুপুর হওয়ার আগেই ঘুরতে হবে। তন্বী, তন্ময়, তাজরিন সবাই তৈরি। এমন সময় মায়ের নির্দেশ- একা যেও না তোমরা। নানুকে বল তোমাদের সঙ্গে যাবেন।

নানুর কথা শুনে হৈ হৈ করে ওঠে সবাই। নানু যেন এটাই চাইছিলেন। তিনিও সঙ্গে চলেন। কথা হয়, দক্ষিণের ফলের বাগান পেরিয়ে যাবে পুকুর পাড়। সুপারি বাগানের সারি ধরে যেতে হবে পশ্চিমে। পশ্চিম পাড়ে অনেক কাঁঠাল গাছ। ফাঁকে ফাঁকে হরেকরকম কাঠের গাছ। তারপর উত্তর দিকে যেতে থাকে তারা। এই গাছ, ওই গাছ দেখে। পাখি দেখে। পুকুরে ভেসে থাকা পানকৌড়ি, মাছরাঙাগুলোর ডুব দিয়ে মাছ ধরা দেখে। পুকুর পাড়ের মাঝামাঝি যেতেই তন্বী সবাইকে থামিয়ে দেয়। তন্ময়, দেখ দেখ কী মজার খেলা।

তন্বী বলে, এবার চল উত্তরে যাই। ওই যে বাঁশঝাড় সেখানে যাব। বাঁশঝাড়ের মাঝখানে কী সুন্দর জায়গা। ওখানে সিয়ামরা নাকি চড়ুইভাতি খেলে।

কিন্তু বাদ সাধেন নানু। তিনি বলেন, ওখানে যাবেন না তিনি।

তন্বয় যাবে। তাজরিনও যেতে চায়। কিন্তু নানুকে না নিয়ে যাবে কি করে। তাই তারা নানুকে ঘিরে ধরে। জানতে চায় কেন যাবেন না সেখানে।

নানুর মুখ কালো হয়ে যায়। তন্বী জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা নানু, ওখানে যেতে চাওনা কেন।

নানু গম্ভীর। আস্তে আস্তে বলেন, ওখানে গেলে আমার মনে হয় আমি একাত্তরে চলে যাই।

তন্বয় জানতে চায়। একাত্তরে ফিরে যাও, মানে বুঝলাম না।

নানুর চোখ ছলছল। বলতে থাকেন- একাত্তরের জুলাই মাসে, হঠাৎ একদিন পাকিস্তানী সৈন্যরা এসে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। তাড়াতাড়ি করে আমরা চলে আসি পুকুর পাড়ে। তখন পুকুর পাড়ে ছিল অনেক জঙ্গল। ভেবেছিলাম, পাকিস্তানীরা কি আর এখানে আসবে?

কিন্তু উত্তরপাড়ার রহমান রাজাকার পাকিস্তানী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এসেছিল পুকুরপাড়ে। এসেই দেখে ফেলে আমাদের। ওখানেই গুলি করে আমাদের ওপর। দেখতে না দেখতে সেই জঙ্গলের রঙ পাল্টে যায়। আমাদের ১১জনের ৩ জনই শহীদ হলেন ওই জঙ্গলের মধ্যে। তোমার মেঝ মামা, তোমার দুলু মামার এক বোন, আর সাইদা নামের একজন প্রাণ হারায় সেখানে। এরপর থেকে আমি ওই কোনায় আর যাই না।

এমন কথা শোনার পর ওদের পুকুরপাড় ঘোরার ইচ্ছা থাকে না। তারা বাড়ি রওনা হয় আবার। দক্ষিণ পাড়ে এসে থামে সবাই। নানু জানতে চান, কী হলো থামলে কেন।

তন্বয় জানতে চায়- আচ্ছা নানু, এমন জায়গা নেই যেখানে তোমার বার বার যেতে ইচ্ছা করে?

নানুর মুখ কেমন হাস্যোজ্জ¦ল দেখা যায়। তিনি বলেন, হ্যা।

তাজরিন নানুকে জড়িয়ে ধরে, তন্বী সামনে এসে দাঁড়ায়। জানতে চায়- কোন জায়গায় তোমার বার বার যেতে ইচ্ছা করে?

নানু বাড়ির বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে থামেন। বলেন,

এই জায়গায় আমার বার বার আসতে ইচ্ছা হয়।

তাজরিন জানতে চায়- কেন এখানে বার বার আসতে চাও?

নানু বলেন- শোন, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়েছিল সেটা তো জানো। কিন্তু আমাদের এলাকা স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল ৮ ডিসেম্বর। আমরা ছিলাম বাড়িতে। দলে দলে মানুষ ভারত থেকে দেশে ফিরছিল তখন। প্রতিদিন আমি বাড়ির বাইরে এসে দেখতাম, তাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই তোমার বড় মামাকেও দেখতে পাব। কতদিন দেখি না তোমার বড় মামাকে। একদিন ঠিকই দেখতে পেলাম। অনেক মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসছে। যোদ্ধাদের হাতে তখনও অস্ত্র। তবে যুদ্ধকালে যেমন তাদের চোখমুখ শুকনো থাকত তেমন নেই। ওরা বিজয়ীর মতোই দেশে ফিরছে। সেই দলে তোমার বড় মামাকে দেখতে পেলাম। এগিয়ে আসছে। তার কাঁধে ঝোলানো রাইফেল। হাতে ধরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

পতাকা দেখেই মনে হয়েছিল, ওটাই তোমার বড় মামা হবেন। বাড়ির কাছাকাছি হতে স্পষ্ট হয়ে যায়। ঠিকই তোমার বড় মামা। আমি একটা দৌড়ে বেরিয়ে যাই। কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে এসে থামি। মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি এগিয়ে আসে। তারা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে থামে। আমি জড়িয়ে ধরি তোমাদের বড় মামাকে। ও আমাকে পতাকাটা ধরিয়ে দেয়।

কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আমি বাম হাতে তোমার মামাকে জড়িয়ে রাখি, আর ডান হাতে পতাকাটা শক্ত করে ধরে রাখি। পতাকাটা তখন পৎপৎ করে উড়তে থাকে। আর ওই বিজয়ের মিছিলটা পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে চলতেই থাকে।

অলঙ্করণ : সোহেল আশরাফ

প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৫

২১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: