কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আবর্জনার নগরী এখন স্বর্ণখনি!

প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৫

বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০১২ সালে লাতিন আমেরিকার বিশাল আবর্জনার স্তূপ বিশ্ববাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছিল। কিন্তু তার মাত্র দুবছর পরেই এই আলোচনার কারণে আবর্জনার স্তূপে কর্মরতদের চাকরি চলে যায়। খ্যাতি হয়ে যায় তাদের কাছে বিড়ম্বনা। তারা বাধ্য হয় জীবিকার একমাত্র অবলম্বন আবর্জনার স্তূপ থেকে সরে আসতে। কিন্তু কি এমন ঘটল মাত্র দুই বছরে যে আবর্জনার স্তূপ থেকে নিতান্ত গরীব মানুষগুলোকে সরে আসতে হলো।

আবার সেই বিখ্যাত সেই আবর্জনার স্তূপেই এখন প্রায় দুই হাজার ময়লা শিকারী গুপ্তধন শিকারী রূপে রাজত্ব করছে। এই বিশাল শিকারী বাহিনী নিজেদের ইচ্ছায় ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ময়লাখানা তছনছ করে ফেলছে স্রেফ স্বর্ণের আশায়। ময়লা কুড়ানোর দল টন টন ময়লার ভেতর থেকে পুনর্ব্যবহার করা যায় এমন জিনিস খুঁজে বের করে নির্দিষ্ট দোকানে বিক্রি করে প্রতিদিনকার খাবারের বন্দোবস্ত করে। কিন্তু একদিন ময়লা কুড়ানো দলের সদস্য সেলিয়োনসে বেনতো পঁচা খাবার আর প্লাস্টিকের বোতলের মধ্যে উজ্জ্বল কিছু একটা খুঁজে পান। আর সেই চকচকে জিনিসটিই তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেয়। ব্রাজিল সরকারকে বাধ্য হয়ে আবারও ফিরে তাকাতে হয় বন্ধ করে দেয়া আবর্জনার স্তূপের দিকে।

‘আমি আবর্জনার স্তূপে একটি পর্তুগিজ স্বর্ণের নেকলেস খুঁজে পাই, আর সেটা বাজারে বিক্রি করে দোতলা একটি ঘর বানাই।’ এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন বেনতো। শুধু তাই নয় ঘর বানানর পরও তার কাছে বাড়তি যে অর্থ আছে তা দিয়ে আরও এক মাস ময়লা না কুড়িয়েই তিনি দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারবেন। অপর এক আবর্জনা শিকারী ৬৩ বছর বয়সী জেরাল্ডো অলিভেরিয়া, যাকে সবাই ব্রিজোলা নামে চেনে তিনিও এই আবর্জনার স্তূপ থেকে গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছেন, তবে সেটা ভিন্ন কায়দায়। আবর্জনার ভেতরে পাওয়া একটি টিউবের মধ্যে তিনি প্রথম দফায় খুঁজে পান ১২ হাজার ডলার, এবং পরে আরও ৯ হাজার ডলার পান।

ব্রিজোলার ভাষ্য মতে, ‘আমি প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি বাকি টাকা মাটিতে পুতে রেখে মাত্র একশ ডলার দোকানে নিয়ে গিয়েছিলাম সেটা আসল না নকল যাচাই করার জন্য। যাচাই করার পর দেখি টাকাটা আসল। এই আবর্জনার স্তুূপ আমার কাছে মায়ের সমান।’

অথচ বেনতো এবং ব্রিজোলার মতো প্রায় দুই হাজার শ্রমিক ২০১২ সালে রাতারাতি এই ময়লাখানা থেকেই চাকরি হারায়। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে এক সম্মেলন থেকে জাতিসংঘের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রামাচো’ ময়লাখানাকে বন্ধ করার ঘোষণা দিলে তাদের ভাগ্যে এই বিপর্যয় নেমে আসে। সেসময় পরিবেশবাদীরা, রাজনীতিবিদেরা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই এই ময়লাখানা বন্ধের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। কারণ তাদের ভয় ছিল এখানে কাজ করা স্বাস্থ্যকর নয় এবং ভবিষ্যতের জন্য ভাল হবে না। অথচ এখন এই ময়লাখানা থেকেই এখন মিথেন গ্যাস উৎপাদিত হয় এবং পার্শ্ববর্তী তেল রিফাইনারিতে ব্যবহার হয় সেই গ্যাস।

স্বর্ণ পাওয়ার ঘটনা এবং মিথেন গ্যাস উৎপাদনের পর থেকে গ্রামাচো আবর্জনার স্তূপের কদর বেড়ে গেছে অনেক। সাবেক আবর্জনা শিকারীরা আবারও ফিরে এসেছেন এখানে কাজ করার জন্য। তবে এখন তাদের অবস্থা আগের চেয়ে ভাল। এখন তাদের ঘণ্টা প্রতি মজুরি দিতে হয় এবং তাদের স্বাস্থ্যসেবার দিকেও নজর দিতে হয় ব্রাজিল সরকারকে।

৬২ বছর বয়সী বেনতো তাদের উন্নত অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, ‘এখন আমাদের একটা ক্যান্টিন, বাথরুম এবং রান্নাঘর আছে। আগের চেয়ে আমরা এখন অনেক বেশি নিরাপদ এবং আরামে আছি।’ প্রতিমাসে বেনতোর আয় এখন প্রায় দুইশ ডলার। আর এই উপার্জনের মাত্র এক ভাগ খরচ হয় তার। বাকি টাকা আগামীর জন্য একটু একটু করে সঞ্চয় করছেন তিনি। সবকিছুর বাইরে, আবর্জনার স্তুূপে কাজ করা কষ্টসাধ্য হলেও, এই আবর্জনার স্তুূপই তাদের কাছে স্বর্ণখণি।

ব্রাজিলের আবর্জনার স্তূপগুলোর পরিদর্শক ডিনো মানেত্তির বক্তব্য অনুসারে, মাঝে মধ্যে এখানকার শ্রমিকরা মাসে ১৫০০ ডলারও উপার্জন করে। আবর্জনার স্তূপ কারও কাছেই ভাল স্থান মনে হবে না। কিন্তু যাদের জীবন এই আবর্জনার স্তূপের সঙ্গে আটকে গেছে একমাত্র তারাই জানেন, এই আবর্জনার স্তূপ তাদের জন্য কতটা সৌভাগ্যের। ধনী-মধ্যবিত্তসহ সবার ফেলে দেয়া আবর্জনা যারা পরিষ্কার করে জীবন যাপন করে তাদের কিন্তু সমাজে অতটা ভাল চোখে দেখা হয় না। নিজস্ব গণ্ডির বাইরে তাদের এখনও বৈষম্যের চোখে দেখা হয়।

আবর্জনার স্তূপে কর্তব্যরত শ্রমিক গ্লোরিয়ার কথায় ফুটে ওঠে বৈষম্যের সেই চিত্র। ‘আমি স্কুলে কখনই বলিনি যে আমি ওখান থেকে এসেছি। তাহলে আমার কোন বন্ধু হতো না। দীর্ঘদিন আমি নিজের পরিচয় নিয়ে লজ্জায় ভুগেছি, আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারতাম না।’ গ্লোরিয়া ১১ বছর বয়স থেকে এই আবর্জনার স্তূপে কাজ করছেন। মাঝে হাসপাতাল থেকে ফেলে দেয়া বর্জ্যরে মধ্যে থাকা সূচের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে অনেকদিন হাসপাতালে থাকতে হয় তাকে।

এরকম নানান প্রতিবন্ধকতা আর ভাল না থাকা নিয়েও দিব্যি ভাল থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বেনতো, ব্রিজোলার মতো অনেকে। জীবন তাদের কাছে রঙ্গিন না হলেও, তারাই তাদের জীবনকে প্রতিদিন রঙ্গিন করে তুলছেন নিজস্ব কায়দায়। কোরাসে, হাসি-আনন্দে, সম্মিলিত ভোজে কিংবা নিশুতি রাতে আবর্জনার শরীরে আগুন জ্বালিয়ে, সেই আগুনের পাশে বসে ভিনগ্রহের সুখ-দুঃখের আলাপে ব্যস্ত আবর্জনা শিকারীদের সময় কেটে যায়। সময় আর জীবনকে শিকার করে দিব্যি সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা-মাস-বছর কেটে যায় আবর্জনা শিকারীদের।

বাংলা মেইল

প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৫

২০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: