আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গ্রামীণ আল্পনায় নগরসজ্জা

প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৫
  • আবু সুফিয়ান কবির

শিল্পের নানা দিক, নানা ধরন। নানা গোত্র, নানা সংস্কৃতির বিকাশের ফলে বিভিন্ন শিল্প পেয়েছে নিজস্ব মহিমা। এভাবেই শিল্প বিকশিত হয়েছে, পেয়েছে আধুনিকতার ধারা। শিল্প বিকাশের এই ধারায় শিল্পের বিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আল্পনা এমনি এক শিল্পকর্ম, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের লোক সংস্কৃতিতে বিকশিত হয়ে, সর্বজনীনতা পেয়েছে, কিন্তু তার মোটিভের ধারায় তেমন কোন বিবর্তন আসেনি। এটা মানুষের মনের গভীরে লালন করে রাখা এমন এক শিল্প, যা ব্যক্তি বিশেষের শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে হয়ে উঠেছে সর্বজনীন একটি শিল্প। একে বলা হয় মানুষের অবচেতন মনের সংস্কৃতি। যা এই উপমহাদেশের গ্রামীণ মহিলারা প্রতিষ্ঠিত করেছে। লালন করেছে নিজস্ব ধারায়। গ্রামীণ মহিলা মানেই এক একজন আল্পনাশিল্পী।

নিজের মন থেকে জেগে ওঠা এক স্বাধীন শিল্প, যা গ্রামীণ লোকশিল্প এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি ধারণ করে মিশে গেছে শহুরে সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে। একুশে ফেব্রুয়ারি ও পহেলা বৈশাখে শহরের রাস্তাগুলোতে বা বিশেষ কিছু চত্বরে দৃষ্টিনন্দন এই শিল্পের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। কংক্রিটের উঠান আর পিচঢালা পথে তা কিছুটা কম দৃষ্টিনন্দন মনে হলেও গ্রামীণ অনুষ্ঠানে তা সত্যি দৃষ্টিনন্দন। আল্পনা শব্দটি যখনি আমাদের দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে তখনি আমাদের চোখের সামনে চলে আসে মাটির ওপর আঁকা কিছু চিত্র; যা কখনও বাস্তবতার ধারক, কখনও বা বিমূর্ত প্রকৃতির। গ্রামীণ বিয়ের অনুষ্ঠানে আল্পনা আঁকাটা ছিল অপরিহার্য। আল্পনা যারা আঁকে তাদের সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা থাকে না। এটা মূলত লোকশিল্প ও মানুষের সহজাত অভিব্যক্তি। এতে মনুষের অতীত চিত্রের যেমন প্রতিফলন ঘটে তেমনি বর্তমানের অস্তিত্ব ফুটে ওঠে। সাধারণত গ্রামীণ মহিলারা এই শিল্পকে শুধু বাঁচিয়েউ রাখেননি, একে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত করেছেন। শহরের আল্পনা কিছুটা আধুনিক ধারায় হলেও, এর সঙ্গে মিশে আছে গ্রামীণ সেই ঐতিহ্য ও মনন। একই সঙ্গে পুরাতন বহু ঐতিহ্য যেমন ঘুরে ফিরে এসেছে আল্পনায় তেমনি ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই কাজে, নতুন আঙ্গিক ও রঙের সংযোজন ঘটে।

ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলার হিন্দু মহিলারা বেশকিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা সাধনা পালন করেন। এই ব্রত পালনে কাদামাটির প্রতিকৃতি দেব, দেবী ও আল্পনা একটি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হিসেবে চলে আসে। পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শেখা নক্সায় তারা অলঙ্কৃত করে তোলেন তাদের গৃহ। শুধু পার্বণ, পূজা বা বিয়ের অনুষ্ঠানউ নয়, এই আল্পনা অলঙ্করণ প্রতি মাসে একবার কি দু’বার করা হয়ে থাকে। বারান্দা, মেঝে, উঠান এমন কি দেয়ালে এই নক্সা করা হয় নিয়মিত। প্রচলিত রীতির সঙ্গে প্রায় প্রত্যেকেই নিজস্ব মনের মাধুরী মিশিয়ে রচনা করেন কল্পনার আপন ভুবন। সাধারণত চালের গুঁড়ার পিটালির মধ্যে ছোট এক টুকরা কাপড় চুবিয়ে নিয়ে করা হয় এ নক্সা । ধারণা করা হয় প্রথমদিকে সাদা চালের গুঁড়া ছিটিয়ে অথবা ছড়ানো চালের গুঁড়ার আস্তরণের ওপর কেটে আল্পনা করা হতো।

আল্পনা শব্দটির উৎপত্তি সম্ভবত ‘ধালিমপণা’ থেকে। এর অর্থ ‘প্লাস্টার করা’ অথবা ‘প্রলেপ দেয়া’। কোন কোন প-িতের মতে, আল্পনা শব্দটি সম্ভবত এসেছে ‘আলিপোনা’ থেকে। আলিপোনা শব্দের অর্থ ‘আইল’ বা ‘বাঁধ’ দেয়া। প্রাচীন কোন শিল্পবিষয়ক গ্রন্থে বা লোককাহিনীতে আল্পনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। যদিও কোথাও কোথাও ‘রঙ্গবলীর’ উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘রঙ্গবলী’ বলতে বোঝায় রং দিয়ে করা লতানো নক্সা বিশেষ। এ শিল্পের বর্ণনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ‘রঙ্গাবলী’ ছিল এক ধরনের আল্পনা। ‘কদম্বরী’ ও ‘তিলকমঞ্জরীর’ মতো সংস্কৃত গ্রন্থে এ নক্সার অসাধারণ শৈলী ও কারিগরি কৌশল সম্বন্ধে বর্ণনা পাওয়া যায়। আল্পনার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় পরবর্তীকালের কাজলরেখা ও অন্যান্য গ্রন্থে।

আল্পনা শিল্প কবে কখন শুরু হয়েছিল, এর কাল নির্ধারণ করা বড় কঠিন। অনেক প-িতই ব্রত ও পূজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আল্পনাকে প্রাক আর্য সময়কালের উৎপত্তি বলে চিহ্নিত করেন। কোন কোন প-িত মনে করেন যে, আমরা আল্পনার উত্তরাধিকার লাভ করেছি অস্ট্রিক জাতিগোষ্ঠীর কাছ থেকে, যারা আর্যদের আগমনের অনেক আগে থেকেই এদেশে বাস করত। তাঁদের মতে, ধর্মীয় আচার সংবলিত ও ঐতিহ্যগত লোকশিল্পসমূহ (আল্পনা), প্রকৃতপক্ষে কৃষ্টিযুগে, শস্যের প্রচুর উৎপাদন ও অপদেবতা বিতাড়নের নিমিত্তে এর উদ্ভব। এ ধরনের নক্সার উপাদান হচ্ছেÑ চালের গুঁড়া, পানিতে গোলানো চালের ম-, শুকনো পাতা গড়িয়ে তৈরি রঙের গাড়া, কাঠকয়লা, পোড়ামাটি ইত্যাদি। আবার কোথাও কোথাও সাধারণ মাটির ওপর প্রাকৃতিক লালমাটি দিয়ে এই আল্পনা আঁকা হয়। সাধারণত মেঝের ওপর বেশি আল্পনা আঁকা হয়। অবশ্য কোথাও কোথাও দেখা যায় দেয়ালে আঁকা স্থায়ী আল্পনা। সাধারণত গ্রামের চৌধুরী বাড়ি, সৈয়দ বাড়ি বা মিয়া বাড়ির মতো অভিজাত পরিবারের বসবাসকারীর বাড়ির দেয়ালে এই আল্পনা দেখা যায়। অবশ্য দেয়ালে এই শিল্পের প্রচলন অনেক কমে গেছে। প-িতরা মনে করেন, দেয়াল আল্পনার ধারণা এসেছে অজন্তা গুহাচিত্র থেকে। স্মরণাতীতকাল থেকেই বংলার মহিলারা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদির উদ্দেশ্যে এ নক্সার অনুশীলন করে আসছেন।

বিভিন্ন প্রজন্মের চিত্রকরদের সুবিধার্থে আল্পনার উপন্থাপনা ব্যাপকভাবে যুগের প্রচলিত রীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই এখানে কারিগরি ও শৈল্পিক দিক একঘেয়ে মনে হয়। তার পরেও প্রচলিত রীতির আওতার মধ্যে থেকেও, আল্পনা তার ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে সক্ষম। গোলাকৃতির আল্পনা দেবীর পূজা, বিশেষ করে লক্ষ্মীপূজায়, পবিত্র বেদি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আল্পনায় ব্যবহৃত মোটিফগুলো হলো সূর্য, ধান গাছ, পেঁচা, মই, নৌকা, কুলা, ডালা, লাঙল, লক্ষ্মীর পা, মাছ, পান, পদ্ম, শঙ্খলতা, সিঁদুরকৌটা ইত্যাদি।

এখনও অনেক গ্রামে বিয়েতে সাধারণত পাত্রের গায়ে হলুদের দিন মূল মঞ্চের সামনে করা হয় প্রধান আল্পনা। এই আল্পনা যেমন বড় হয় তেমনি এর রঙের ব্যবহারে থাকে বৈচিত্র্য। তবে আল্পনা কখনও তার ঐতিহ্য থেকে বের হয় না। কেননা যখনি আমাদের সামনে আল্পনা শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখনি মানসপটে ভেসে ওঠে সেই চিরচেনা শিল্প, যা শুধুমাত্র আল্পনা শিল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই যুগ যুগ ধরে হাজার বছর অতিক্রম করার পরেও এই শিল্পের তেমন কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। এর প্রধান কারণ এই শিল্পকর্মের কৌশল গ্রামীণ মহিলাদের নিজস্ব শিল্প, যা আপনাতেই তাদের ভেতর থেকে আসে। এর জন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। গ্রামীণ কাদামাটির জীবনের সঙ্গে এই শিল্প অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই গ্রামীণ পার্বণ বা বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই আল্পনা অতি জরুরী একটি বিষয়। কালের বিবর্তনে চলে যায় এক প্রজন্ম । নতুন প্রজন্ম এসে আবার তৈরি করে আল্পনা। কিন্তু নতুন প্রজন্মের আল্পনার সঙ্গে পুরনো প্রজন্মের আল্পনার হুবহু মিল থেকে যায়। তাই এই শিল্পকে বলা হয় সহজাত ও আল্পনার শিল্প।

আধুনিক যুগে আল্পনা শান্তিনিকেতনি শৈলী দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। শান্তিনিকেতনি শৈলীর আল্পনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিমূর্ত, আলঙ্কারিক, ধর্মনিরপেক্ষ, সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমান যুগে মুসলমানরাও বিবাহ ও অন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আল্পনা অঙ্কন করে থাকেন। একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় ‘শহীদ মিনার’ ও মিনারসংলগ্ন সড়কগুলোতে প্রচুর আল্পনা আঁকা হয়। এটা সত্যি যে, আধুনিক বাংলাদেশে আল্পনা একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্রে পরিগণিত হয়েছে। আল্পনা এখন এমনি এক শিল্প, যা কোন বিশেষ ধর্মে পরিচয় বহন করে না। আল্পনা একটি সহজাত শিল্প মাধ্যম। যা মনের অজান্তে আপনা থেকে প্রস্ফুটিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে, একই আঙ্গিকে একই মোটিভে।

প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৫

২০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: