আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সৃষ্টিশীল সমাজচিন্তক

প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

বাংলা অভিধানে ‘সব্যসাচী’ শব্দের অর্থ আছে ‘উভয় হস্তে সমভাবে পারদর্শী’। হাত যদি দুয়ের অধিকও থাকত এবং তা যদি সমভাবে পারদর্শিতার দৃষ্টান্ত কেউ চাইত নিশ্চিন্তে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের নাম উচ্চারিত হতো। দুই হাতে নয় দশ হাতে তিনি দক্ষ। তাঁর সমকালীন বিশেষত পঞ্চাশের দশকে যাঁদের উত্থান, যাঁরা বাংলা কথাসাহিত্য-কবিতার আধুনিকীকরণের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি শুধু অন্যতমই নন, অগ্রগামী। আজও তাঁর কলম ক্রিয়াশীল, সমানভাবে তিনিও সৃষ্টিশীল। তাঁর সৃষ্টি যেমন বিচিত্র গতিতে প্রবহমান তেমনি জীবন ও কর্ম বৈচিত্র্যে ভরা।

তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল আমাদের এ ভূখ- কেন বার বার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে? এই যেমন, ধর্মীয় মৌলবাদ, উগ্রপন্থী, জঙ্গী, চরমপন্থীদের শান্তি বিনষ্টকারী কর্মকা- রাষ্ট্র ও সমাজদেহে ক্রমাগত আঘাত হানছে। এর উত্তরে তিনি বলেন, আসলে এটা অস্থিতিশীল নয় স্বার্থসিদ্ধির একটা পন্থামাত্র। এর নেপথ্যে কাজ করছে কিছু আন্তর্জাতিক অপশক্তি। আর সেই অপশক্তির নাম সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থ উদ্ধারে এহেন অপকর্ম নেই যে, তারা পারে না। একটা কথা মনে রাখা দরকারÑ এ রাষ্ট্রটা আমরা তৈরি করেছি। আর সেটা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, লড়াই করে। বিশ্বে লড়াই করে রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টান্ত কিন্তু কম। এই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একমাত্র আমরাই লড়াই করে স্বাধীনতা পেয়েছি। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সংগ্রাম, লড়াই, বিপ্লবকে ভয় পায় কিংবা পছন্দ করে না। বাঙালী যেহেতু বীরের জাতি তারা মাথা নত করতে জানে না। তাদের ইতিহাসে আছে ভাষার জন্য জীবনদানের গর্বিত বিষয় যা বিশ্বে বিরল, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, আর ’৭১-এর মহান অর্জন। যে কারণে ওই শক্তি ভাল করেই জানে এদেশ ও জাতিকে কখনও তাদের আজ্ঞাবহ বা দাস বানানো যাবে না। অতএব তারা এ অঞ্চলে একেক সময় একেকটা তত্ত্ব, প্রেসক্রিপশন প্রয়োগ করে। চেষ্টা করে ভূখ- খ- করা, অগণতান্ত্রিক শক্তিকে উস্কে দেয়া, সামাজিক ঐক্য বিনষ্ট করা, ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি বা এ জাতীয় কিছু একটা করে মূলত অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিধ্বস্ত করে দেয়। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে অভিজিৎ হত্যাকা- পর্যন্ত এরই ধারাবাহিকতায়, বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় ভাবার দরকার স্বাধীনতার চার দশকের বেশি আমরা অতিক্রম করলাম অথচ বহির্বিশ্বে কোন দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে পারলাম না। ভারতের সঙ্গে যে সম্পর্ক তা তো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে হতে পারে না।

এমন অনুভব আর বিশ্লেষণ যিনি করেন তাঁকে তো নতুন করে পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁর পরিচয়, খ্যাতি, প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেশজ বলয়ের গ-ি ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল। যাকে বলা হয় বিশ্বভাবুক, সমাজচিন্তক। তাঁর পরিচয় বহুবিধ। কোনটা কোন অংশে কম নয়। কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, চিত্রসমালোচক, গবেষক এসব পরিচয় তাঁর নামের সঙ্গে অলঙ্কার হয়ে জড়িয়ে আছে বটে; এর বাইরেও রয়েছে তাঁর নানাবিধ পরিচয়। তিনি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতিপ্রভাবিত মূলস্রোতে প্রবহমান অন্যতম তরণী। কার না কৌতূহল জাগে মহৎ সৃষ্টিশীল মানুষটি সম্পর্কে জানতে। একটু মন্থন করা যাক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকে।

মেঘনাপাড়ের ছেলে

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের শৈশব-কৈশোরের মানস গঠনের যে কাদা-জল প্রয়োজন তা যুগিয়েছিল মেঘনা। দেশের অন্যতম বৃহৎ এ স্রোতস্বিনী, প্রমত্তা ও খরস্রোতার। পাড়ভাঙ্গা মানুষের জীবন সংগ্রাম দেখেছেন কাছ থেকে। তারই প্রভাব পরবর্তী সময়ে পাঠক হিসেবে আমরা আস্বাদন করি মেঘনাপাড়ের মানুষের কথাসহ দৈশিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। মেঘনার প্রত্যক্ষ প্রভাব যে নীরবচ্ছিন্ন ছিল সে কথা শত ভাগ বলা যাবে না। কেননা পিতার বদলির কর্মের পাশাপাশি নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও কর্মের কারণেই তা আর একচ্ছত্র থাকেনি। তবে নদীজনিত মানস গঠনের ফলে মানুষের প্রতি মমত্ব ও দায় রয়েছে তাঁর আজীবন।

দায়বদ্ধতার রক্তপ্রবাহ

পিতা আশেক আলী খান তৎকালীন অনগ্রসর মুসলমান সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেন ১৯১১ সালে ম্যাট্রিক পাস করে। তিনিই বিএবিটি পাস করে চাঁদপুর জেলার প্রথম মুসলমান গ্র্যাজুয়েটের গৌরব অর্জন করেন। অন্যদিকে মাতৃকুল ছিল অর্থ ও রাজনৈতিক যশে বলীয়ান। জমিদার পরিবারের সন্তান সুলতানা বেগম ছিলেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের গর্ভধারিণী জননী। রতœগর্ভা এ জননীও শিক্ষা-দীক্ষায় ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রসর। তাঁর পিতা, ভাই ও চাচারা তখন ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সে সময়ে জেগে ওঠা ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে তাঁরা এলাকায় সৃষ্টি করেন নির্ভরশীলতা। সুলতানা বেগমের মামা গণি চৌধুরীর তখন চারদিকে নামডাক। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের নানা আমজাদ হোসেনের বাড়ি মহাত্মা গান্ধী, চিত্তরঞ্জন দাশ, আলী ভ্রাতৃদ্বয় শওকত আলীও মোহাম্মদ আলী প্রমুখের স্মৃতিধন্য। বললে অত্যুক্তি হবে নাÑ পিতার শিক্ষা সচেতনতা আর মাতৃকুলের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা পরম্পরায় তাঁর রক্তে হয় প্রবাহিত। আজ আমরা যে সমাজ ও মানবের কাছে দায়বদ্ধ সৃষ্টিশীল ও সাড়া জাগানো শিক্ষক জাহাঙ্গীরকে দেখি পিতৃ এবং মাতৃকুলের সম্মিলিত রক্তপ্রবাহই অনেকটা ভাসিয়ে এনেছে।

লাল ঝা-ার গোপন দিন

পূর্ব পুরুষের সচেতনতা, সামাজিক-মানবিক দায় তো রক্তে ছিলই সে পথের আলো দেখালেন আজিজ স্যার। এই আজিজ স্যার ছিলেন ঝালকাঠির মানুষ। ১৯৪৭ পূর্ব স্বদেশীদের গড়া ঝালকাঠি স্কুলে তৃতীয় কি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়েন জাহাঙ্গীর। সেই স্কুলেরই শিক্ষক আজিজ সাহেব। স্কুলটি ব্রিটিশ সরকার জোর করে নিয়ে নেয়। এই আজিজ স্যারই বালক জাহাঙ্গীরকে কাঠের বাক্সে গোপনে আনা সাম্যবাদী চেতনার সহজ বই পড়তে দেন। ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি টেলিফোন-টেলিগ্রাফের তার কাটতেন গোপনে। একদনি চলে গেলেন জেলে। সেসব বই-ই শিশুমনে দোলা দেয়। গড়ে ওঠে ভেতরে ভেতরে এক অন্যরকম দর্শন।

’৪৬/৪৭ সালে পিতার অবসরের কারণে ঝালকাঠি ছাড়তে বাধ্য হন। এর অল্প কিছুদিন পরেই শুরু হয় ঢাকার জীবন। ঢাকায় এসে ভর্তি হন মুসলিম হাইস্কুলে। মুসলিম হাইস্কুলের দিনগুলোই বদলে দেয় তাঁর জীবনের মাত্রা। ভেতরের সৃষ্টিশীলতা, লালিত দর্শন বেরিয়ে এসে হয় স্ফুলিঙ্গ। এই মুসলিম হাইস্কুলের শিক্ষক জিয়াউদ্দিনের সংস্পর্শে এসে তাঁর গতি-প্রকৃতি গেল আরও বদলে। জিয়াউদ্দিন স্যার ছিলেন জহুরি। তিনি খাঁটি সোনা চিনেছিলেন। গোপনে গোপনে করতেন কমিউনিস্ট পার্টি । জাহাঙ্গীরকে উদ্বুদ্ধ করেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। একদিন তো জাহাঙ্গীরকে দিয়ে লিখিয়ে নিলেন কবিতা। ছাপাও হলো পত্রিকায়। ম্যাট্রিক পরীক্ষাও দেয়া হয়নি তখন। ছাপা হয়ে গেল প্রথম কবিতা। সে প্রসঙ্গ বড়ই আকর্ষণীয়। পাঠক পাবেন এ লেখার পরবর্তী এক স্তরে।

সমাজতন্ত্রের আদর্শে অনুপাণিত হয়ে সে সময়ে সাংগঠনিক কাজ করাটা ছিল যেমন দুরূহ তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। এরই মধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম বিদ্রোহ বলে চিহ্নিত তেভাগা আন্দোলন তরুণ জাহাঙ্গীরের হৃৎজগত করে আন্দোলিত। স্বপ্ন-দর্শনের জয়যাত্রা শুরু বলে প্রতিভাত হলো মনে। এরই মধ্যে সঙ্গী জুটেছেন হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাইয়ীদ আতিকুল্লাহ প্রমুখ যাঁরা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস। এই দলটির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠার কথাও এক গল্প। মুসলিম হাইস্কুলে পড়াকালীন আড্ডা ও খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত জায়গা পান মহল্লার নিকটবর্তী তৎকালীন পাকিস্তান মাঠ, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ মাঠ; যা আজাদ মাঠ নামে ও সমধিক পরিচিত। এই মাঠে খেলাধুলা বা আড্ডাস্থলেই ওই কীর্তিমানদের সঙ্গে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। যদিও এদের মধ্যে জাহাঙ্গীর ছিলেন কনিষ্ঠ। বাকি সবাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে জাহাঙ্গীর তখনও পেরোননি হাইস্কুলের গ-ি।

হাসান হাফিজুর রহমান তখন অবিভক্ত নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পর্টির সক্রিয় কর্মী। তিনি কুরিয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নৈকট্য পেয়ে গেলেন জাহাঙ্গীর। জড়িয়ে গেলেন আদর্শিক সংগঠনের সঙ্গে। হাসান যে দায়িত্ব দেন তাই পালন করেন। মনের আনন্দে ঝুঁকি নিয়ে সাংগঠনিক কাজে ছড়িয়ে পড়েন ঢাকা শহরের অলিগলিতে। আর মিলনের জায়গা তো আছেই বাংলাদেশ মাঠ।

ভাষা আন্দোলনের গর্বিত কর্মী

সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনগণের প্রতি দায়িত্বহীনতা আর অন্তঃসারশূন্যতা এরই মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের অধিকার লাঞ্ছিত, অবহেলিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে। ভাষার প্রতি আসে প্রথম আঘাত। সংখ্যগরিষ্ঠের ভাষা উপেক্ষিত হওয়ার অর্থই একদেশদর্শিতা। স্বৈরাচার, অবিবেচক পাকিস্তানী শাসকের কর্মকা-েই রাষ্ট্র সৃষ্টির কিছুদিন না যেতেই স্পষ্ট হয় বাঙালীকে দমনের স্টিম রোলার হাতে নেমে পড়েছে তারা। পক্ষান্তরে বাঙালী জাতীয়তাবাদের বীজ অঙ্কুরোদগম হওয়ার পরিবেশে এগিয়ে যায়। এই যুদ্ধের এক সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তাঁর আদর্শের ঝা-া হাতে।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি যখন ঢাকার রাজপথ রক্তে ভাসল, সৃষ্টি হলো বিশ্ববিরল ঘটনা তখন এর ঢেউ আঘাত করে জাহাঙ্গীরকে। অন্তর হয়ে ওঠে রক্তাক্ত। আদর্শিক অগ্রজ ও বন্ধু হাসান হাফিজুর রহমান তো সঙ্গে আছেনই। জাহাঙ্গীর তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। হাসান হাফিজুর রহমান তাঁকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন ক্যাপিটাল প্রেস নামে এক ছাপা খানায়। প্রেসের মালিকও ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক। জাহাঙ্গীরে ভাষায়Ñ ‘হাসান ছিলেন করিৎকর্মা। প্রেসে বসেই দ্রুত লিখে ফেললেন এক লিফলেট। লিফলেট ছাপতে তো সময় লাগে। আমরা প্রেস থেকে বেরিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে আবার প্রেসে গেলাম।

দেখি লিফলেট ছাপা হয়ে গেছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তা বিতরণের দায়িত্ব আমরা নিলাম। হাসানের পরামর্শে আমার দায়িত্ব পড়ল জেলখানায় লিফলেট বিতরণের। এখন কী করি? জেলখানার উল্টো দিকে মসজিদ। ওই মসজিদে গিয়ে ছোট ছোট ইটের টুকরোর সঙ্গে লিফলেট বেঁধে ছুড়ে ফেললাম জেলখানার মধ্যে। দেখতে পেলাম অনেকেই তা কুড়িয়ে নিয়ে চকিতে দেখে লুকিয়ে ফেলল।’ এভাবেই তিনি হয়ে গেলেন ভাষা আন্দোলনের এক গর্বিত সৈনিক। পাশাপাশি চলছে সমাজ বদলের দর্শনচর্চা। পাচ্ছেন সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদের বিভিন্ন তথ্য, তত্ত্ব, বই-পুস্তক, সাংগঠনিক নির্দেশনা। চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে এক নয়াদুনিয়া। সেই দুনিয়া অন্যরকম। তৎকালীন বা বর্তমান চলমান সমাজ বাস্তবতার মতো নয়। সেখানে ওড়ে এবং উড়ছে শোষণহীন এক সমাজের লাল ঝা-া।

স্বাধীনতা তুমি

মহান মুক্তিযুদ্ধে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের রণকৌশলটা হলো একটু ভিন্ন, তিনি বেছে নিলেন বুদ্ধিবৃত্তিকে। প্রকাশনার মাধ্যমে উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। প্রথমে এ প্রকাশনার নাম ছিল ‘স্বাধীনতা’, পরে নামকরণ করেন ‘প্রতিরোধ’।

ঢাকা শহরে চলছিল তখন গেরিলা যুদ্ধ। রণাঙ্গনের জন্য মানচিত্র যে কত প্রয়োজন যারা সংশ্লিষ্ট তারাই ভাল জানেন। অবরুদ্ধ ঢাকায় পাকিস্তানীদের শ্যেনদৃষ্টির মাঝে গেরিলাদের ঢাকা শহরের মানচিত্র সরবরাহ করে নির্ভিকতার স্বাক্ষর যেমন রেখেছেন তেমনি আশ্রয় পেয়েছেন ইতিহাসেও। সেদিন এ কাজটি কত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তা আজকের বাস্তবতায় অনুধাবন করা কঠিন।

নান্দনিক ও দায়বদ্ধতার যোদ্ধা

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গারীরের সৃষ্টিসম্ভার যেমন বিপুল তেমনি বিচিত্রগামী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, মূল্যায়ন, বিশ্লেষণ এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

কবিতার সহিস : কৈশোরোত্তীর্ণ জাহাঙ্গীরকে আমরা দেখেছি বাংলাদেশ মাঠে; পরবর্তীকালে যাঁরা হয়েছেন রথি মহারথি, তাদের সঙ্গে। তিনি তখন মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্র। হাসান হাফিজুর রহমান ওই সময় বের করেন হাতে লেখা পত্রিকা ‘রাঙা প্রভাত’। হাসানই সম্পাদক। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হলেও তারা পরস্পরকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করতেন। হাসান প্রায়ই জাহাঙ্গীরকে লিখতে বলেন। এক রকম আঠার মতো লেগেই থাকতেন লেখা প্রসঙ্গে। আর জাহাঙ্গীর তখন তো হাসান ছাড়া কিছুই বোঝেন না। বাংলাদেশ মাঠে অপেক্ষায় থাকতেন। কখন হাসান বাইসাইকেল চালিয়ে টুংটাং বেল বাজিয়ে আসবেন।

একদিন স্কুলের জিয়াউদ্দিন স্যার কবিতা চেয়ে বসলেন। তিনি প্রগতিশীল মানুষ বেশ কিছুদিন পর। হঠাৎ একদিন জিয়াউদ্দিন স্যার ডাকলেন। বিকে জাহাঙ্গীর বললেন এভাবে- “জিয়াউদ্দিন স্যার তো ডাকলেন। আমি গেলাম তার কাছে ভয়ে ভয়ে। তিনি একটা ছাপানো পত্রিকা দেখিয়ে বললেন, এই দেখ কী কাণ্ড করেছ! আমি আরও ভড়কে গেলাম ভাবলাম স্কুলের কোন আইন বা নিয়ম ভঙ্গ করেছি কিনা? আমার হাতে কাগজটা দিলেন দেখলাম আমার নাম ও স্যারকে দেয়া সেই কবিতা। নামটা দেখে আমি বাকরুদ্ধ খুশিতে। খুশিতে যে চোখও ঝাপসা হয়ে আসে বুঝেছিলাম সেদিন। সে পত্রিকাটি ছিল এ অঞ্চলের একমাত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘যুগের দাবি’।” সেই ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত প্রথম কবিতা, এ পত্রিকাটির সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস। সেই যে কবিতা নামের পাগলা ঘোড়ায় ছড়ে বসা, তার সঙ্গে প্রেমের প্রতিযোগিতার দৌড় আজও পারেননি তিনি থামাতে।

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের শব্দরা উচ্চকিত নয় তবে তার মধ্যে উচ্চস্বর বিরাজ করে। কোন হৈ হুল্লোড়ে শব্দরা করে না কোলাহল অথচ কবিতা নিয়ে ওঠে চায়ের কাপে ঝড়। কয়েকটি পঙ্ক্তি তুলে ধরা যাক

(আমার পায়ের মধ্যে/বিদ্রোহের রক্তপাত নিরন্তর... আমার পায়ের তলায় মাটি সব সময় থাকে/কেঁচোদের টের পাই না (আমার পায়ের তলায় মাটি/আমাদের মুখ)

আবার-

এই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ/মানুষের ভাষাকে অপমান করা/তোমার কি ইচ্ছে করে না যে দেশে আছো/ সে দেশের ভাষায় কথা বলতে? (এই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ/মানুষের বুকের মধ্যে)

এরপর-

বেঁচে থাকার জন্য বাজারে যেতে হয়/বাজার তো অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে চলে না।

(আশ্বিন এলে/মানুষের বুকের মধ্যে)

এমনই তাঁর শব্দের দ্যোতনা। শব্দেরা দ্রোহী নয়। কবিতা অন্তরের পাশে জ্বালিয়ে দেয় আগুন, রক্তে বাড়িয়ে দেয় সময় ও সমাজ বদলের শর্করা সৃষ্টিকর্মের মূল প্রেরণা চরিত্র অনুষঙ্গ ভোক্তা মূলত মানুষই। মানুষকে কেন্দ্র করেই সবকিছু আবর্তিত। একেক শিল্পস্রষ্টা মানুষকে দেখেন ও ভাবেন আপন ভঙ্গিতে, নিজস্ব দর্শন ও দৃষ্টিতে। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের মানুষ নিয়ে ভাবনা অভিনব। তিনি দেখেন এভাবে- মানুষ চিরকাল ভ্রাম্যমাণ/ঈশ্বরের মধ্যেও তার বাসস্থান নেই। (আমার সময় কম/পুরনো বৃক্ষের ডালপালা) প্রথম গল্পের গল্প : প্রথম প্রকাশিত কবিতার নেপথ্য গল্পের মতো যিনি এর নেপথ্য প্রেরণাদাতা তিনিও আমাদের ইতিহাসের এক অংশ- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। সে কাহিনী শোনা যাক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের নিজ ভাষায়- “এই ভাষা আন্দোলনের পরপরই। ঢাকা কলেজের ছাত্রাবাসে এসে গাফ্ফার একদিন বললেন, তুই একটা গল্প লেখ, আমিও লিখি। একই পত্রিকায় পাঠাই, দেখা যাক কারটা ছাপা হয়? কেন যেন মনে হলো কবিতা লিখে দুয়েকজনের সাধুবাদ পেয়েছি, মোটামুটি পরিচিত মহলে অনেকে চেনে। দেখি না একটা লিখে! লিখে ফেললাম গল্প। গাফ্ফারও লিখলেন। এখন কোথায় ছাপানো যায়? তখন কলকাতার ‘পরিচয়’ পত্রিকার বেশ নামডাকÑ প্রগতিশীল কাগজ। সম্পাদক সুভাষ মুখোপাধ্যায়। দু’জনেই গল্প পাঠিয়ে দিলাম। কিছুদিন পর একটা চিঠি পেলাম পোস্টকার্ডে। তাতে লেখা আমার গল্প অনুমোদিত হয়েছে। অল্প কিছুদিন পর গল্পটি ছাপা হলো। চারদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের আর একটি চিঠি পেলাম তাতে তিনি লিখেছেন- এখন থেকে আপনি ‘পরিচয়’-এ নিয়মিত লিখবেন। তাঁর ধারণা ছিল আমি বোধহয় এ দেশের প্রতিষ্ঠিত কোন লেখক। বয়সী কেউ। পরে যখন আমাকে দেখলেন তখন তিনি অবাকই হলেন। আমি ছাত্র এবং কম বয়সে এমন গল্প লিখেছি! গাফ্ফারের গল্পটি অবশ্য ছাপা হয়নি। আসলে এটা ছিল একটা বাজি এবং আমার জন্য গল্প লেখার প্রেরণা পরে এমনও হয়েছে অনেক পত্রিকায় আমার গল্প ছাপা হয়নি, গাফ্ফারের হয়েছে।”

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের গল্প-উপন্যাসে মূলত শ্রেণী সংগ্রাম, কঠিন বাস্তবতা ফুটে উঠলেও আধুনিক জীবনের অপরাপর মৌলিক সমস্যা, সময়ের চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও স্পষ্ট হয়ে আছে। সময়ের চিত্র তিনি ধারণ ও উপস্থাপন করেন অভিনব কৌশলে। সাহিত্যের বিশ্ব পরিব্রাজক বলেই চরিত্রগুলো বা প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক হলেও আমাদের অজানা অচেনা থাকে না। কেমন অলৌকিক কৌশলে শেষ পর্যন্ত তা হয়ে উঠে আমাদের শিকড়মুখী। তিনি মনে করিয়ে দেন পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি আর রক্তবন্ধনের কথা। এই যেমন- ‘... আমার বাবা, কখনো কখনো নামাজের স্থানে ঘুমিয়ে যেতেন। চাঁদ তাঁর ঘুমন্ত চেহারার ওপর গড়িয়ে যেত। ভোর পর্যন্ত চাঁদ তার ঘুমন্ত শরীর নিয়ে খেলত।’... (চাষাভুষো মানুষের গল্প)

গল্পটির নামকরণের মধ্যে রয়েছে পূর্বপুরুষের স্বীকার। তেমনি বুনন কাব্যিক ও নান্দনিক উপস্থাপনায় মেলে এক চমৎকার দৃশ্যকল্প। কেউ কি অস্বীকার করবেন তিনি আমদের লোকজীবনের ভিন্ন মাত্রার রূপকার। সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসের পরম সত্য উপস্থাপনের মধ্যে তার দায়বদ্ধতা পরিশোধ করার চেষ্টা দেখি এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। ‘প্রাচীনকালের যেসব ভয়’-এর নাম গল্পে এরকম ভাষ্যে- ... ‘মুজিব ভাই ডাক দিলেন পরাধীন বাংলাকে স্বাধীন হওয়ার জন্য। কৃষক লাঙল ফেলে মাঝি নৌকা ফেলে, ছাত্র-যুবক বই-পুস্তক ফেলে তরুণ-তরুণী ভালবাসার কথা ফেলে খালি হাতে যুদ্ধে চলে গিয়েছিল।’...

শিল্পের ব্যবচ্ছেদক : তখনও ঢাকায় আর্ট স্কুল হয়নি। জয়নুল আবেদিন কলকাতা ছেড়ে এলেন ঢাকায়। চেষ্টা করছেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আর্ট স্কুল খোলার। শিল্পের সমঝদার জাহাঙ্গীর বর্তে গেলেন শিল্পীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, জয়নুল আবেদিনের বড় গুণ ছিল কোথাও গেলে কাউকে সঙ্গে নিতেন। কামরুল হাসান যে কোন কাগজে যে কোন পরিবেশে যখন তখন আঁকতে পারতেন। সফিউদ্দিন আহমদ যে পাড়ায় থাকতেন ওই সময় একই পাড়ায় থাকতেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে সখ্যের খবর জানান তিনি এভাবে- ‘জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমদ কিভাবে ছবি আঁকতেন দেখতাম তাদের পাশে থেকে। একটির পর একটি রেখা কিভাবে ছবি হয়ে ওঠে দেখতাম আর অবাক হতাম। আমার ভেতরে জন্ম নিল নতুন এক অনুভব। অন্যরকম বোধ। মনে হতে লাগল- নদী মানে নদী না, বৃষ্টি মানে বৃষ্টি না, বাড়িঘর মানে বাড়িঘরও নয়; এর মধ্যে আন্তর্নিহিত একটা সত্য আছে। সেই সত্যটাও অন্যরকম। এই সত্যের প্রতি অনুসন্ধিৎসু হয়েই কলম ধরলাম। উদ্ঘাটন করতে হবে ওই অধরা সত্যকে।’ অধরা মাধুরী আবিষ্কার করতে গিয়ে ছবির রং, ক্যানভাস তুলির অন্তর্গত গূঢ়তাকে উপলব্ধির প্রকাশ ঘটাতে নেমে হলেন শিল্পের ব্যবচ্ছেদক বা চিত্র সমালোচক। এ ক্ষেত্রে তাঁর বিশ্বভ্রমণ ঈর্ষণীয়। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্পীকর্ম, শিল্পালয় তিনি দেখেছেন, পর্যবেক্ষণ করেছেন শুধু দর্শক হিসেবে নয়, খুঁজেছেন ভেতরের দর্শন ও সত্য। এভাবেই বোধকরি দেশসেরাই নন, হয়ে উঠেছেন এশিয়ার অন্যতম প্রধান চিত্রশিল্প সমালোচক। কবি ও সাহিত্যিক মানস যে এই পরিচিতি ও দক্ষতার শিকড়ে জল সিঞ্চন করেছে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?

এভাবেই কবি গল্পকার ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার চিত্র সমালোচক, গবেষক তাঁর অবদান দান করে ঋণী করে চলেছেন আমাদের। চলতি বছরে ৮০-তে পা দিলেন তিনি। ৮০ বছরে তাঁর সৃষ্টি ও কলম নিরন্তর এক তরুণের মতো। এবারে দেখা যাক জীবনের এক উল্লেখযোগ্য ও অবিস্মরণীয় সাহসী পদক্ষেপের কথা।

জাগো বাহে কোনঠে সবাই

গত শতকের আটের দশকের শেষ দিকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন এর সহচর ও সহযোগী শক্তি হয়ে ওঠে জাতীয় কবিতা পরিষদ। এই পরিষদে তিনি অংশ নিয়ে সংগঠনকে করেন শক্তিশালী। তিনি ছিলেন অন্যতম চালিকাশক্তি প্রগতিশীল, গণতন্ত্রমনা ও অসাম্প্রদায়িক কবিদের এ সংগঠনে। গণআদালতের ২৪ জন বাদীর অন্যতম একজন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। তাঁর সেই অতুলনীয় ভূমিকার জন্য আজও শ্রদ্ধার পুষ্প পান মানুষের কাছ থেকে। যদিও তৎকালীন বিএনপি সরকার গণআদালতের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিল, করেছিল আটকসহ নানা রকম হয়রানি। জাহাঙ্গীরও রেহাই পাননি। তাঁকেও উঠতে হয়েছিল তৎকালীন সরকারের মনগড়া কাঠগড়ায়।

অভিজাত সংগ্রাহক

যে মানুষটির দায় মানুষের কাছে নান্দনিক শিল্পের কাছে তাঁর সংগ্রহ যে সে রকমই হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর আবাস দেখলে চমৎকৃত হতে হয়, হতে হয় অবাক। নিজের অজান্তেই মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে আহ কী নান্দনিক! মনটাও হয়ে ওঠে শিল্পময়।

কী নেই তাঁর সংগ্রহে? আধুনিক চিত্রকলার এই ভূখ-ে যাঁরা প্রতিনিধিত্ব করেছেন, করেন এবং কালের আবর্তে হারিয়ে যাবেন না এমন সব শিল্প স্রষ্টার চিত্রকর্মের ‘মূলকপি’ রয়েছে সংগ্রহে। সবচেয়ে অবাক হতে হয় তরুণতর প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীর চিত্রকর্মও তিনি রেখেছেন সযতনে। এখনও খোঁজেন কোন প্রতিভাবান নবীন চিত্রস্রষ্টা সৃষ্টি হলো কিনা। সংগ্রহের ব্যাপারে তাঁর মধ্যে নান্দনিকতা ও অভিজাত কাজ করে- যা তাঁকে করেছে আর দশজনের চেয়ে আলাদা। শুধু দেশী নয় আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান শিল্পীদেরও কিছু উজ্জ্বল কর্ম রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। চীনামাটিসহ মাটি ও কাঠের তৈজসপত্র ও নানা রকম শৈল্পিক কাজের সংগ্রহ দেখলে বোঝা যায় তার শিল্পীমানস ও রুচির স্তর।

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের লাইব্রেরি না দেখলে বোঝা যাবে না যে কী পরিমাণ মূল্যবান ও বিরল বই ও জার্নাল রয়েছে সংগ্রহে। বইয়ের মানের ব্যাপারেও রয়েছে তাঁর আভিজাত্য। মার্ক্সসিস্ট থিওরি থেকে হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত তাঁর সংগ্রহ দেখলে যে কোন সচেতন পাঠকের জাগবে ঈর্ষা।

এই সব্যসাচী মানুষটির সঙ্গে আলাপচারিতা শেষে উঠতেই তিনিও উঠে দাঁড়ালেন। দরজা পেরোলেই নিচে নামার লিফট। বসার ঘর থেকে বের হওয়ার দরজা ও লিফট তুলনামূলক একটু দূরে। বয়সের ভার বলে একটা কথা থাকে। যতই বলা হচ্ছেÑ থাক আর আসতে হবে না। বয়সী শরীর টেনে তবুও লিফটের কাছে আসেন। অতিথি বিদায় বলে কথা। লিফটের দরজা খুলতেই অবাক করে দিয়ে নিজেই গ্রাউন্ড লেবেলের বোতাম টিপে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন লিফট থেকে। হাত তুলে জানলেন বিদায়ী অভিবাদন। মনটা শ্রদ্ধায় ভরে গেল। মনেরও একটা অদৃশ্য হাত আছে। আপনা আপনি উঠে গেল তা অভিবাদন জানাতে। কেউ তা দেখল না।

নিচে নেমে গুলশান লেকের হাওয়ায় মনটা হয়ে গেল আরও ফুরফুরে । দ্রুত চলা গন্তব্যের বাহন ধরার উদ্দেশ্যে। বাহনের কথা মনে হতেই মনটা চুপসে গেল। জেঁকে ধরল ভয়। পেট্রল বা হাতবোমা এসে পড়বে না তো ঘাড়ে? শহরটা কি এখন নিরাপদ? মস্তিষ্কের নিউরনে বেজে উঠল কবি বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের কবিতা।

কবি এবং রাজনীতিবিদ/একসঙ্গে আবার এই শহরটাকে/ স্বপ্নময় করে দিন/ রাজনীতিবিদ এবং কবি/স্বপ্নকে দু’হাতের মধ্যে উত্তোলিত করে/ রুখে দাঁড়ান। (আমাদের বাঁচবার জন্য/মানুষের বুকের মধ্যে)।

আলোকচিত্র : আরিফ আহমেদ

প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৫

২০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: