কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পদ্মা সেতু ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ, পাল্টে গেছে মাওয়ার চিত্র

প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৫
পদ্মা সেতু ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ, পাল্টে গেছে মাওয়ার চিত্র

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মাওয়া থেকে ॥ পাল্টে গেছে মাওয়ার চিত্র। মাওয়া ঢোকার আগেই শ্রীনগর উপজেলার ছনবাড়ি থেকেই দেখা যাবে ভিন্ন চিত্র। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের এই প্রান্তের দু’পাশে কাজ আর কাজ। একটু এগোতেই দেখা মিলবে পদ্মায় বিশাল বিশাল ক্রেন। ভারি ভারি সব যন্ত্রপাতিতে কাজ হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে। এ তো গেল দিনের বেলার দৃশ্য। রাতেও কাজের কমতি নেই। আলোর ঝিলিক পুরো প্রকল্প এলাকায়। তাই তিন শিফটে ২৪ ঘণ্টাই কাজ চলছে এখানে। পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, চার বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে এই কাজ। এখন পর্যন্ত সিডিউল যথাযথভাবেই এগোচ্ছে। কোথাও বিচ্যুতি হয়নি। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুর কাজ সম্পন্ন হবে। প্রকল্প এলাকায় চীনা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করেও জানা গেছে পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতির চিত্র। বর্ষা আসন্ন। তবে এখন পদ্মা পুরো শান্ত। বৃষ্টি-বাদলও তেমন নেই, প্রকৃতি অনুকূলে। এ সুযোগের পুরোটাই কাজে লাগানো হচ্ছে। দেশী, বিদেশী ও সামরিক-বেসামরিক মিলে ৯ হাজার ৩ শ’ লোক কাজ করছে এখানে। সরেজমিন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে- স্বপ্নের এই সেতুর বাস্তবায়নের মহাযঞ্জ।

পাল্টে গেছে দৃশ্যপট ॥ ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দোগাছি সার্ভিস এরিয়া থেকে শুরু করে মাওয়া পর্যন্ত দু’পাশে কাজ আর কাজ। কোথাও চলছে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে মাটি ভরাটের, মাটি সমান্তরাল করার কাজ। আবার চলছে যন্ত্রচালিত মেশিন দিয়ে পাথর ভাঙ্গার কাজ। একটু এগোলেই কুমারভোগে ওয়ার্কশপ তৈরির কার্যটি যেন আরও বিশাল, যা দেখেই অনেক কিছু স্পষ্ট হবে। কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে হরদম ব্যবস্ততা তো রয়েছেই। মাওয়া চৌরাস্তা থেকে একটু এগিয়ে নদীরপারে গেলেই দেখা যাবে, ভাসমান ক্রেনের সাহায্যে চলছে পাইলিংয়ের কাজ। দিনরাত পালাক্রমে কাজ চলছে। এখন মাওয়াকে দেখার কোন উপায় নেই; এখানে এতবড় ফেরিঘাট ছিল যুগযুগ ধরে। ফেরিঘাট কিংবা, টার্মিনাল কিছ্রুই চিহ্নমাত্র নেই। রাস্তাঘাটেও পরিবর্তন এসেছে। আর যে রেস্ট হাউস ছিল মাওয়া চৌরাস্তার কাছে, তাও নেই। মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সদ্যবিলুপ্ত মাওয়া ফেরিঘাটের একটু সামনে থেকে সোজা পূর্বদিকে একটি নতুন রাস্তা করা হয়েছে। এই রাস্তা কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড পর্যন্ত। এই রাস্তা দিয়েই পদ্মা সেতুর মালামাল আনা- নেয়া হচ্ছে। এই ইয়ার্ডের বিশাল ওয়ার্কশপে সেতুর মূল পাইল তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। বিশাল এই পাইল এখান থেকে পিলার পয়েন্টে নেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। রেললাইনের মতো ক্রেনলাইন তৈরি হচ্ছে নদীতীর পর্যন্ত। বিশাল কনস্টাকশন ইয়ার্ড একেবারে নতুন ফেরিঘাট শিমুলিয়া পর্যন্ত। পুরোটাই বিশেষ বেষ্টনী দেয়া। তবে বাইরে থেকে বোঝা যায় কাজের ব্যস্ততা। পদ্মার অপরপ্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টও হুলস্থুল কাজের অনুরূপ চিত্র। নদীশাসন, চরকাটা, সার্ভিস রোড তৈরি সবই চলছে পুরোদমে। আর এসব কাজের তদারকি করছে বিশেষজ্ঞ টিম। প্রতিটি কাজেরই নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া আছে। যার অনেক কিছুই হচ্ছে দ্রুত। তাই নির্ধারিত ২০১৮ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন হতে পারে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। গত ২৬ নবেম্বর থেকে ক্ষণ গণনার পরই চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি পুরোদমে শুরু করেছে এই কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই কাজ শেষ না হলে দিনপ্রতি গুনতে হবে বড় অঙ্কের জরিমানা। তাই কাজের গতি না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। হরতাল-অবরোধের ছোঁয়া মাত্র নেই এখানে। চার বছরের জন্য ঘোষিত নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী যথাসময়ে বা আগে পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। “এই সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় সমৃদ্ধি ছাড়াও নিজস্ব অর্থে সেতু করার চ্যালেঞ্জ জয়ে অগ্রগতির চাকা আরও সফলভাবে অগ্রসর হবে”, এই মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। বহুমুখী সেতুর দ্বিতল এই সেতু উপরের তলায় থাকবে চার লেনের মহাসড়ক। নিচে রেললাইন। ট্রেনের গতিসীমা হবে ১৬০ কিলোমিটার। থাকবে গ্যাস ও বিদ্যুত সংযোগ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে গ্যাস সরবরাহের জন্য থাকবে হাই প্রেসার গ্যাস পাইপলাইন। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর মঙ্গলা সমুদ্রবন্দরের ব্যবহার বাড়বে। পিছিয়েপড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও বিনিযোগ বাড়বে। বাড়বে জীনযাত্রার মান ও মাথাপিছু আয়। তাই আনন্দে উদ্বেল এই অঞ্চলের মানুষ।

অগ্রগতির চিত্র ॥ ২৬ নবেম্বর মূল সেতু কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয়েছে চার বছরের জন্য। এদিন থেকেই ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে তারা কাজের অগ্রগতি রিপোর্ট পেশ করছে। সর্বশেষ দেয়া ফেব্রুয়ারি মাসের এই রিপোর্টেও সেতু কর্তৃপক্ষের হাতে জমা হয়েছে। এই রিপোর্টে সেতু বাস্তবায়নের সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে। মাওয়া প্রান্তে ৯টি স্থানে মাটি পরীক্ষার কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। ওপারের জাজিরা পয়েন্টে সম্পন্ন হয়েছে চারটি স্থানের মাটি পরীক্ষার কাজ। অন্য কাজের অগ্রগতিও আশানুরূপ।

৭৫০টি ছোট-বড় যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে মাওয়ায় পৌঁছেছে। ট্রায়াল পাইলের যাবতীয় মালও ইতোমধ্যে মাওয়ায় এসে গেছে। এ সকল মাল মানসম্মত কিনা তার পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়ে গেছে। মাওয়া ও জাজিরায় ভায়াডাক্টর (সংযোগ সেতু) কাজও নির্ধারিত সময়ে শুরু হচ্ছে। মাওয়াপ্রান্তে দেড় কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ ১৭ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে। এই কাজে প্রায় ১৫ শ’ বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োজিত। মূল সেতুর অগ্রগতি ৫ শতাংশ, নদীশাসন কাজের অগ্রগতি ৩ শতাংশ, মাওয়াপ্রান্তে সংযোগ সড়কের কাজ ৪০ ভাগ এবং জাজিরা সংযোগ সড়কের কাজ ৩৫ শতাংশ, সার্ভিস এরিয়া-২ এর অগ্রগতি ৪০ শতাংশ।

পদ্মা সেতু হচ্ছে পাঁচটি অঙ্গে ॥ পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মোট পাঁচটি অঙ্গ রয়েছে। ১. মূল সেতুর চুক্তিমূল্য ১২ হাজার ১শ’ ৩৩ কোটি টাকা। ২. নদীশাসন কাজের চুক্তিমূল্য ৮ হাজার ৭শ’ ৮ কোটি টাকা। ৩. জাজিরা সংযোগসড়ক (সার্ভিস এরিয়া-৩ সহ) কাজের চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা। ৪. মাওয়াসংযোগ সড়কের (সার্ভিস এরিয়া-১ সহ) চুক্তিমূল্য ১ শ’ ৯৩ কোটি টাকা। ৫. সার্ভিস এরিয়া-২’র চুক্তিমূল্য ২ শ’ ৮ কোটি টাকা।

এছাড়া দু’টি পরামর্শকের মধ্যে কোরিয়া এক্সপ্রেস ওয়ে কর্পোরেশনের চুক্তিমূল্য ৩ শ’ ৮৩ কোটি টাকা। এই প্রতিষ্ঠান মূল সেতু ও নদীশাসন কাজ তদারকি করছে। দ্বিতীয় পরার্মক প্রতিষ্ঠান স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) এর চুক্তিমূল্য ১ শ’ ৩৩ কোটি টাকা। তারা মাওয়া সংযোগসড়ক, জাজিরা সংযোগসড়ক ও সার্ভিস এরিয়া-২’র কাজ তদারিক করছে।

মূল সেতুর কাজ পেয়েছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। নদীশাসন কাজ পেয়েছে চায়নার সিনো-হাইড্রো কর্পোরেশন। সার্ভিস এরিয়া-২’র কাজ পেয়েছে এককভাবে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম। বাকি দু’টি কাজ পেয়েছে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম এবং মালয়েশিয়ার এইচসিএম যৌথভাবে।

রাতের মাওয়া ॥ রাতের মাওয়া দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। যেন আরও বিস্ময়কর। এটি দেখে মনে হবে একেবারেই স্বপ্নের মতো। কখনও এমন দৃশ্য এখানে দেখা যাবে, এটি কল্পনাও করেননি এখানকার মানুষ। মেদিনীম-ল গ্রামের আব্দুল মতিন খান বলেন, আমাদের বাড়ির পাশে এমন উন্নয়ন বিপ্লব ঘটবে এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। পদ্মা সেতু তৈরি করতে এত আয়োজন এটিও ভাবতে পারিনি। এখন সবই যেন বাস্তবে দেখছি। রাতেরবেলায়ও কাজের কোন কমতি নেই। দিনের গতিতেই তিন শিফটে কাজ চলছে এখানে। মুহূর্তের জন্যও বন্ধ নেই কাজ। আট ঘণ্টা করে চলছে প্রতিশিফ্ট। পুরো প্রকল্প এলাকায় দিনের মতো আলো। অনেক দূর গ্রাম থেকেও দেখা যায় মাওয়ার এই আলো। পদ্মা সেতুর কাজ যেন আকাশসুদ্ধ আলো করে দিয়েছে। সেই আলোর ঝিলিক পড়ছে পদ্মা নদীতেও। মঙ্গলবার বিদ্যুতের নতুন সাবস্টেশন বসানোর পর এই আলোর ঝলকানি যেন আরও বেড়েছে।

সেনাবাহিনীর কর্মতৎপরতা ॥ পদ্মা সেতু ঘিরে সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজড ব্রিগেড গঠন করা হয়েছে। জাজিরাপ্রান্তে অস্থায়ী ব্যারাক করে দুই ব্যাটালিয়ন সেনাসদস্য অবস্থান করছে। মাওয়াপ্রান্তে পুনর্বাসন এলাকায় এক ব্যাটালিয়ন সেনাসদস্য রয়েছে। প্রায় ১ হাজার ৮ শ’ সেনাসদস্য এখন পদ্মা সেতু নিরাপত্তায় কাজ করছে। জমির অভাবে সেনাবাহিনীর স্থায়ী আবাসন হচ্ছে না। এতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। সেতুর নিরাপত্তায় এখানে স্থায়ী সেনানিবাস এখন থেকেই শুরু হওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছে সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মোঃ সফিকুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, সেনানিবাসের জন্য আলাদা একটি প্রজেক্ট হচ্ছে। বেসামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও দিন-রাত কাজ করে চলেছে। আর স্থানীয় প্রশাসনও আন্তরিকভাবে দেশের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের জন্য নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছে। এসব কারণেই বাধাহীনভাবে এগিয়ে চলছে সেতুর কাজ। সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজড ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহ্ নুর জিলানী বলেন, “আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের সর্বাত্মক চেষ্টা করে চলেছি।” মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল জানান, দেশের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে আমাদের সাধ্যমতো প্রচেষ্টা রয়েছে।

আজ ট্রায়াল পাইল বসছে ॥ আজ শুক্রবার বহু প্রত্যাশিত ট্রায়াল পাইল স্থাপন শুরু হচ্ছে। ১৬ এ্যাঙ্কর পাইল স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। তাই ট্রায়াল পাইল স্থাপনের জন্য ভারি যন্ত্রপাতির আরেক সমাবেশ ঘটানো হয়েছে মাওয়ায়। বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা গেল, চলছে চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ। ক্রেনের মাধ্যমে বিশাল হ্যামার দিয়ে এই পাইল স্থাপনে মহড়া চলছে। পাইল বসানোর এই কর্মযজ্ঞ মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর পুরনো ফেরিঘাট সংলগ্ন দুই নম্বর পিলারের কাছে। এর খুব কাছেই ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পিলারটির ডিজাইন চূড়ান্ত করার জন্যই ট্রায়াল পাইলের এতসব আয়োজন। এরপরই মূল পাইল স্থাপনের পালা। ট্রায়াল পাইল স্থাপন করে পরীক্ষা শেষেই ১৬টি এ্যাঙ্কর পাইল উঠিয়ে নেয়া হবে। এই এ্যাঙ্কর পাইল স্থাপন হবে আরেক পিলারের পয়েন্টে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, সিডিউল অনুযায়ী মূল পাইল বসানোর কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে আগামী সেপ্টেম্বরে। তবে কাজের অগ্রগতি ভাল হওয়ায় এটির কাজ জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে শুরুর সম্ভবনা রয়েছে। সেই লক্ষ্যে চলছে নানা প্রস্তুতি। মূল পাইলের হ্যামার জার্মানিতে তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। তবে এটি পরিচালনার জন্য হাতেকলমে ট্রেনিং নিতে দু’জন চৌকস চীনা প্রকৌশলী জার্মানি গেছেন। আশা করা হচ্ছে, আগামী মে’র শেষদিকে এই হ্যামার দেশে পৌঁছবে। প্রায় এককিলোমিটার দীর্ঘ এই ওয়ার্কশপেই আগামী এপ্রিল থেকে তৈরি হবে মূল পাইল। পদ্মা সেতুতে চীনে তৈরি মোট ১০টি ট্রায়াল পাইল স্থান হবে। এছাড়া দু’টি কনস্ট্রাকটিবিলিটি সার্ভিস পাইলও বসানো হবে পরীক্ষামূলকভাবে।

স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে ॥ সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সুবিধার্থে সমস্ত কর্ম প্রক্রিয়াকে ৬টি ভাগে ভাগ করে ক্লান্তিহীনভাবে কাজ চলছে। নির্দিষ্ট ছকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতুর নির্মাণ কাজ। চলছে সেতুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য রাস্তা নির্মাণ, মাটি পরীক্ষা, নদীর ওপর প্লাটফর্ম নির্মাণ, পাইল তৈরিসহ বিভিন্ন কাজকর্ম। এছাড়া নদীতীর থেকে বিশাল ক্রেনের মাধ্যমে মালপত্র ওঠা-নামার কাজ চলছে। পদ্মা নদীর দুইপারে সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মেদিনীম-ল ও কুমারভোগ দুটি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে এই সংযোগসড়ক। অপরপ্রান্তে শরিয়তপুর জেলার জাজিরা থানার নাওডোবা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে সাড়ে ১০ কিলোমিটার সংযোগসড়ক নির্মাণ কাজ চলছে। চার লেনের এ সংযোগ সড়কে মাটির ফেলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোথাও বিটুমিন ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। এই সড়কের মধ্যে ৯৭০ মিটারের ৫টি ছোট সেতু, ১৯টি বক্সকালভার্ট, ৮টি আন্ডারপাস ও টোলবুথ নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে। এজন্য রড, পাথর, বালু, সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণ জড়ো করা হয়েছে নদীরপারে। নৌপথে আনা বিভিন্ন উপকরণ খালাস কাজ চলছে। এদিকে প্রায় ২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার মাওয়ার সংযোগসড়কের নির্মাণে মাটি ফেলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যেই চলছে টোলবুথ, কালভার্টসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রক্রিয়া। তাই ইট, সুড়কি, পাথর, বালু প্রভৃতি জড়ো করা হয়েছে প্রকল্প এলাকায়। প্রতিদিন প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করছে প্রকল্প এলাকায়। এসব শ্রমিক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কর্মকর্তাদের থাকার জন্য মাওয়া ও জাজিরা এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে আবাসিক ভবন। এছাড়া প্রকৌশলীদের থাকার জন্য মাওয়া ও জাজিরায় ভাড়া করা হয়েছে ২০টি বাড়ি। শ্রমিকদের থাকার জন্য দুইপারে টিনশেডের প্রায় ২শ’ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

দ্বিতলবিশিষ্ট সেতুটি নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টীল দিয়ে। এর ওপর দিয়ে গাড়ি ও নিচ দিয়ে ট্রেন চলাচল ব্যবস্থা থাকবে। মূল সেতু, সংযোগসড়ক ও নদীশাসন; সব মিলে সেতু প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এছাড়া অন্যান্য প্রকল্পে কাজ করছে আলাদা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাই পদ্মা সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া এবং শরিয়তপুর জেলার জাজিরার বিশাল এলাকাজুড়ে চলছে ব্যাপক কর্মতৎপরতা।

পদ্মা সেতু ৪২টি পিলারের ওপর নির্মিত হবে। ১৫০ মিটার পর পর পিলার বসানো হবে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গত ১ মার্চ সেতুর এ্যাঙ্কর পাইল বসানো শুরু হয়। এছাড়া সেতু এলাকার এ্যালাইনমেন্টের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। গত বছর ১ নবেম্বর মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় এবং ১৩ নবেম্বর শরিয়তপুরের জাজিরায় মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে। তাই ইতোমধ্যে ২৫০ মিটার প্রশস্ত করে চর কাটার কাজ শুরু হয়েছে। তাই দ্রুতই মূল সেতুর কাজ শুরু হবে । পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ১শ’ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মুন্সীগঞ্জ, শরিয়তপুর ও মাদারীপুরে চারটি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ২০ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ২৩ শতাংশ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে চলছে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ। ২০১৮ সালে পদ্মা সেতু দিয়ে চলাচল করবে যানবাহন ও রেল; এই কর্মপরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছে সবকিছু। নিরলসভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সংযোগসড়ক, ইঞ্জিনিয়ার ও শ্রমিকদের আবাসন, সংযোগসড়কে থাকা কালভার্ট, সংযোগসড়কের পাশের সার্ভিস রোড তৈরি, ওয়ার্কশপ, টোল প্লাজা, ড্রেজিং ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কাজ। ভারি ভারি নির্মাণ যন্ত্র দিয়ে চলছে পাথর কাটা, মাটি কাটা, মাটি ভরাট, রাস্তা সমান করার কাজ। ওয়েল্ডিংয়ের আলোর ঝলকানি আর ভারি যন্ত্রপাতির শব্দে মুখরিত জাজিরার পদ্মাপার। চীন থেকে ইতোমধ্যে তিন শ’র অধিক প্রকৌশলী এসেছেন। আরও কয়েক শতাধিক আসার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

প্রকল্পটির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার শর্তে সংযোগসড়ক ও টোলপ্লাজা নির্মাণ কাজ করেছে যৌথভাবে আবদুল মোনেম লিমিটেড ও মালয়েশিয়ার এইচসিএম নামের দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২৫ মিটার প্রস্থ মোট ১২.১৬ কিলোমিটার সংযোগসড়কের মধ্যে জাজিরা পয়েন্টে সাড়ে দশ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ৪ লেনবিশিষ্ট সংযোগসড়কের কাজ চলছে দ্রুততার সঙ্গে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংযোগসড়ক নির্মাণ সম্পন্ন করে তা মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার বিষয়টি ভেবে দেখছে সরকার। ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে ঢাকার গে-ারিয়া থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২.৩২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। যার জন্য রেল বিভাগ ৩৬৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করছে। জাজিরার নাওডোবায় সার্ভিস এরিয়া-২’র অধীনে পদ্মা রিসোর্ট নির্মাণ করা হবে।

এখানে ১টি মোটেল ম্যাস, ১টি রিসোর্ট অভ্যর্থনা কেন্দ্র, ১টি সুপারভিশন অফিস ও ৩০টি ডুপ্লেক্স ভবন নির্মাণের কাজও দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে, যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। এদিকে প্রকল্পের সকল কাজ তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে।

প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৫

২০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: