কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বড়দা এবং আমাকে দেখুন

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ ২০১৫
  • অপূর্ব কুমার কুন্ডু

সঙ্কটকে সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে নেয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়, আর সবাই পারেও না। যারা পারেন তারা ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিরল। তেমনই একজন অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। মহিলা সমিতি মঞ্চে শো শেষে পা পিছলে পড়ে দু’পায়ের হাঁটুর রিং রিপ্লেসমেন্ট করাতে গিয়ে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে বেডে শুয়ে কাতরালেন। আবার ওই হাসপাতালে ভর্তি ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করার জন্যে হুইল চেয়ারে বসে কোকিলারা নামের একক অভিনীত নাটক করা শুরু করলেন। অনেকটা তেমনই ঘটনা ঘটল এবারে প্রাঙ্গণে মোর নাট্যদলের আয়োজনে দুই বাংলার নাট্যমেলায় রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য উৎসবে কলকাতার গুনী অভিনেতা গৌতম হালদারের ক্ষেত্রে। কথা ছিল ১২ মার্চ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হবে মূখ্য গৌতম হালদারসহ তিনজনের অভিনীত নাটক ‘হাওয়াই’। হাওয়াই নাটকটি পাগলা গারদ থেকে পালানো তিন পাগলের মর্মব্যাথা নিয়ে। যারা তাদের নির্মিত গ্রহযানে করে পৃথিবীর প্রান্ত পাড়ি দিতে চায় পাগলমুক্ত গ্রহের অন্বেষণে। কিন্তু হাওয়াই মঞ্চায়ন সম্ভব হলো না কারণ সহশিল্পীর হঠাৎ স্মলপক্সে অসুস্থ হয়ে পড়ায়। কিন্তু টিকেট কেটে মঞ্চে প্রবেশ করা দর্শকদের কিছুতেই বঞ্চিত করলেন না গৌতম হালদার। সঙ্কটের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সম্ভাবনার দু’টি একক অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মাতিয়ে তুললেন নয়ে নাটুয়া প্রযোজিত এবং গৌতম হালদার অভিনীত-নির্দেশিত নাটক ‘বড়দা বড়দা’ এবং ‘আমাকে দেখুন’।

বড়দা বড়দা উর্দু সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাঁদের ছোট গল্প বড় ভাই সাহেবের অনুবাদ। গল্পটি দুই দাদা-ভাইকে কেন্দ্র করে। বড় ভাই ভিত্তি মজবুতে বিশ্বাসী তাই প্রতি ক্লাসে দু’তিন বছর থাকে। সময় নষ্ট করে, সময়ের মূল্য নিয়ে চারপাতা রচনা লেখাকে প্রহসন মনে করে, ইংরেজ রাজ-রাজাদের সাইকেলিক ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর নামকরণ (প্রসঙ্গ : হেনরি দ্য ফোর্থ) নিয়ে নামের ঘাটতির ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন, অহঙ্কারী রাবণ রাজার পতনকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে হোস্টেলে থাকা ছোট ভাইকে শাসন এবং শোধরানোর নির্দেশ দেন। অথচ বড় ভাইয়ের থেকে কম পড়ুয়া এবং কম ডিসিপ্লিনড হওয়া সত্ত্বেও ছোট ভাই প্রতি ক্লাসে ফার্ষ্ট হতে হতে এবং প্রায় বড়দাকে ধরে ফেলে। পুরো নাটকটিতে নানান দার্শনিক কথার সমাহারের মাঝেই বড়দা বলে ফেলেন, ‘এক পরম সত্য, ভাই তুমি হয়ত সামনের বছর পাস করে আমার ক্লাসে আসবে। তারপর হয়ত আমাকে ফেলে ম্যাট্রিক, অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে এম ফিল, পিএইচডি, ডিলিট ডিগ্রী নেবে।

কিন্তু, তুমি যত ডিগ্রী আর সার্টিফিকেট নাওনা কেন, আমি যে তোমার বড়দা, পাঁচ বছরের বড়, সে বড় থাকব আজীবন। আমাদের মা কোন স্কুলে পড়াশোনা করেনি। কিন্তু তিনি তার জীবন অভিজ্ঞতায় এমন জ্ঞান রাখেন, যা দিয়ে তোমাকে-আমাকে শোধরাবার এবং শেখাবার ক্ষমতা রাখবেন আজীবন। ভাই আমার, অহঙ্কার ভাল না।’ অহঙ্কার ছেড়ে একটা কাটা ঘুড়িকে কেন্দ্র করে বড়দার পেছন পেছন ছোট ভাইয়ের দৌড় লাগানোর মধ্যে দিয়ে শেষ হয় নাটক বড়দা বড়দা। নাটকটিতে পঞ্চান্ন মিনিট সময় ধরে মঞ্চে একটি মাত্র চেয়ারে বসে দুই ভাই চরিত্রে একক গৌতম হালদার সহস্র অভিব্যক্তিতে যে সুরের ধারা বাঁধলেন তাতে দর্শকের চোখে জল এল, উলাসে দর্শক ফেটে পড়ল আর জীবন বোধের সন্ধান পেয়ে একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠবার স্বপ্ন দেখল। যে সত্য ও অভিজ্ঞতা অভিনেতা গৌতম হালদার তার অভিনয়ে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষভাবে মঞ্চে তুলে ধরলেন সে সবই রেখা ও রঙে মঞ্চের পেছনের পর্দায় প্রায় দশগুণ বড় হয়ে যখন দেখা দিল তখন দর্শকের মনে জন্ম নিল এক তৃতীয়মাত্রার অভিজ্ঞতা যা শুধুমাত্র রস আস্বাদন করবার এবং পুন পুন ভাববার।

ভাববার মতো বিষয় বর্তমান সময়ে প্রত্যেকে নিজেকে নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত যে, অপরকে নিয়ে ভাববার মতো সময় তার হাতে নেই। কেউ কাউকে দেখে না আবার দেখলে লক্ষ্যও করে না। এরকম কঠিন সত্যের মুখোমুখি এক ব্যাংকের ক্যাশিয়ারের জীবনের গল্প নিয়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নাটক ‘আমাকে দেখুন’। ক্যাশিয়ারের যৌবন বেলায় তার আত্মার আত্মা স্ত্রী তাকে নিউমাকের্টে মানুষের ভিড়ে চেনে না, আর চিন্তার ঘোরে মেলার মাঝে হাত ফসকে হারিয়ে ফেলা আদরের শিশু-সন্তানকে খুঁজে পায় না।

আর তাই নাটকের শেষ প্রান্তে ক্যাশিয়ার রূপী অভিনেতা গৌতম হালদার আনমনে, বিভ্রান্তভাবে, হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে বলে চলে, ‘আপনারা যদি কখনও ওদের দেখা পান, দয়া করে একটু বলে দেবেন, চিনিয়ে দেবেন যে ইনিই তার স্বামী, ইনিই ওর বাবা।’ চিনিয়ে দেবার এবং চিনিয়ে নেয়ার মতো আয়োজন প্রাঙ্গণেমোর আয়োজিত দুই বাংলার নাট্যমেলা। ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের নাটকের সমাহার এ উৎসবকে পরিপূর্ণতা দান করেছে।

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ ২০১৫

১৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: