মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আমেরিকা কি কখনো যুদ্ধে জয়ী হয়েছে?

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ ২০১৫
  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

একটি আমেরিকান সাময়িকীতে কিছুদিন আগে একটা মজার নিবন্ধ পড়েছি। লিখেছেন এক মার্কিন লেখক। তিনি পেশায় শিক্ষক। তাঁর নিবন্ধের শিরোনাম, ‘আমেরিকা কি কখনো যুদ্ধে জিতেছে?’ লেখকের বিশ্লেষণ হলো, ইউরোপ দুই-দুইটি মহাযুদ্ধে বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে আমেরিকা বিনা চেষ্টায় মাঝখান থেকে সুপারপাওয়ার হয়েছে। পরাজিত হিটলারের সমরাস্ত্র নির্মাতাদের ধরে এনে তাদের সাহায্যে আমেরিকা অর্থশক্তিতে তার ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলে সুপারপাওয়ার হয়েছে। নইলে আমেরিকার সুপারপাওয়ার হওয়ার কোনো যোগ্যতা ও সাহসই নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমেরিকা কোন যুদ্ধে জেতেনি। পরাজয় ও পলায়নের কালিমা এই সুপারপাওয়ারের সর্বাঙ্গে জড়িত।

এই বিষয়ে লেখক একটার পর একটা উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অধিকাংশ সময় আমেরিকা নিরপেক্ষ থাকার ভান করে যুদ্ধে জড়িত হয়নি। যুদ্ধ করে ফ্যাসিস্ত জার্মানি, ইতালি ও জাপানের অক্ষশক্তিকে পরাজিত করার মূল নায়ক রাশিয়া; আমেরিকা নয়। আমেরিকা পুরো যুদ্ধের সময় যুদ্ধাস্ত্র বানিয়ে তা প্রচুর মুনাফায় দেদার বিক্রি করেছে এবং যুদ্ধরত ব্রিটেনকে মোটা অর্থ ঋণ জুগিয়েছে। তা সাহায্য ছিল না। যুদ্ধের একেবারে শেষদিকে জাপান আকস্মিকভাবে আমেরিকার পার্লহারবারে আক্রমণ না চালালে দেশটি মোটেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতো না।

যুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে আমেরিকা নামকাওয়াস্তে ইউরোপে সৈন্য নামিয়ে যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব নিয়েছে। তাকে তেমন যুদ্ধ করতে হয়নি। জাপানের সঙ্গে যুদ্ধেও যখন আমেরিকা দেখেছে এই যুদ্ধেও তার সহজে জয়লাভ সম্ভব নয়, তখন মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ করে জাপানের নাগাসাকি ও হিরোসিমা শহরে এটম বোমা ফেলে লক্ষ লক্ষ নিরীহ নর-নারী হত্যা দ্বারা বিজয়ী বীরের ভূমিকা গ্রহণ করে। এ সময় জাপানের হাতে অনুরূপ মারণাস্ত্র থাকলে আমেরিকা এই বীরত্ব প্রকাশের সাহস দেখাতো না।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর আমেরিকা প্রথম যুদ্ধে লিপ্ত হয় কোরিয়ায়। এই যুদ্ধেও আমেরিকা পরবর্তীকালের মিথ্যাচারের মতো মিথ্যাচার করে। এই যুদ্ধ জাতিসংঘের অনুমোদন গ্রহণের আগেই সে জাতিসংঘের পতাকা ব্যবহার করে যুদ্ধে নামে এবং তুরস্কসহ কিছু অনুগত দেশকে যুদ্ধে নামায়।

কোরিয়া যুদ্ধের সুযোগে আমেরিকার ইচ্ছা ছিল চীন আক্রমণ করা এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত কম্যুনিস্ট সরকারকে উৎখাত করা। এ জন্যে মার্কিন সেনাপতি জেনারেল ম্যাকআর্থার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে চীন সীমান্তে হামলা চালান এবং তাঁর সেনাবাহিনীকে এই আশ্বাস দেন যে, সামনে বড়দিন; তার আগেই যুদ্ধ জয় করে তারা টোকিওর ঘাঁটিতে ফিরে গিয়ে বড়দিনের কেক খেতে পারবে।

মার্কিন জেনারেলের এই দম্ভ দুদিনেই ধূলিসাত হয় এবং চীনের লালফৌজের হাতে চরম মার খেয়ে রণাঙ্গন থেকে পালাতে হয়। এই লজ্জাকর পরাজয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে জেনারেল ম্যাকআর্থারকে বরখাস্ত করেন। আমেরিকা ও তার অনুগত দেশগুলোর হাজার হাজার সৈন্য চীন ও উত্তর কোরিয়ার লালফৌজের হাতে বন্দী হয়েছিল। সম্মান বাঁচানোর জন্যে আমেরিকা ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর শরণাপন্ন হয় এবং নেহরুর অনুরোধে চীন একটি শান্তি চুক্তি সম্পাদনের জন্য পানমুনজন নামক শহরে বৈঠকে বসতে রাজি হয়। পানমুনজন বৈঠকে নেহরুর দূত রাজেশ্বর দায়ালের মধ্যস্থতায় চীন মার্কিন যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিতে সম্মত হয় এবং সুপার পাওয়ার আমেরিকা নাক কাটা থেকে বেঁচে যায়।

কোরিয়ার যুদ্ধে এতো বিরাট সংখ্যক মার্কিন সৈন্য বন্দী হচ্ছিলো এবং মারা যাচ্ছিলো যে, আমেরিকার ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠেছিল এবং যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষে জনমত তীব্র হয়ে উঠেছিল। এ সময় রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে দাঁড়ান জেনারেল আইসেনহাওয়ার। তাঁর প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার এবং মার্কিন সৈন্যদের ঘরে ফিরিয়ে আনার। ফলে আমেরিকার প্রত্যেকটি শহরে হাজার হাজার নারী শোভাযাত্রা বের করে। তাদের বুকে ও পিঠে এমনকি পায়ের মোজায় লেখা ছিল ‘আই লাইক আই’ অর্থাৎ ‘আমি আইক বা আইসেনহাওয়ারকে পছন্দ করি।’ এই নির্বাচনে আইসেনহাওয়ার জয়ী হয়েছিলেন।

কোরিয়ার যুদ্ধে লজ্জাকর পরাজয় আমেরিকার চৈতন্যোদয় ঘটায়নি। তার হাতে তখন একতরফা এটম বোমা (রাশিয়া তখনো এই বোমা বানাতে পারেনি) এবং বিশ্বে সুপারপাওয়ার-স্টেটাস। কিছুদিনের মধ্যেই তার ভিয়েতনামে যুদ্ধ করার সাধ হলো। ভিয়েতনামে তখন স্বাধীনতার সংগ্রাম চলছে। হো চি মিনের নেতৃত্বে জনগণ ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে রত। দিয়েনকিয়েনফুয়ের যুদ্ধে ভিয়েতকঙ সেনাদের হাতে ফরাসী সেনাবাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। তখন ভিয়েতনামের স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্যর্থ করার জন্য আমেরিকার বড় সাধ হয়।

প্রথমে তারা ফরাসীদের সাহায্য করার নামে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তারপর পরাজিত ফরাসীরা সরে গেলে একাই যুদ্ধ শুরু করে। আমেরিকার হাতে বিপুল মারণাস্ত্র। নাপাম বোমাসহ সকল মারণাস্ত্র ভিয়েতনামবাসীর ওপর প্রয়োগ দ্বারা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ করার রেকর্ড স্থাপন করে ওয়াশিংটন।

তারপরও ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা জয়ী হয়নি। জেনারেল গিয়াপে’র ভিয়েতকঙ বাহিনীর হাতে চূড়ান্ত মার খেয়ে তারা দলে দলে লাওস থেকে পালাতে শুরু করে। ভিয়েতকঙদের হাতে অসংখ্য মার্কিন সৈন্য ধরা পড়বে এই ভয়ে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে লাওস থেকে এই মার্কিন সৈন্য সরিয়ে আনা শুরু হয়। এই সময়ে তোলা ছবিতে দেখা যায়, পলায়নপর মার্কিন সৈন্যের অনেকে হেলিকপ্টারে জায়গা না পেয়ে তার পায়া ধরে ঝুলতে ঝুলতে পালাচ্ছে। জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কাছে আমেরিকার মতো সুপারপাওয়ারের দানবশক্তিও কতোটা তুচ্ছ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ তা প্রমাণ করেছে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয় আমেরিকাকে কিছুকাল বিশ্বের দুর্বল দেশগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রেখেছিল। তারপরই আমেরিকার আবার বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িত হওয়ার সাধ জাগে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানের মার্কিনবিরোধী সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য ইরাককে প্ররোচিত করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামায় আমেরিকা। আট বছর এই যুদ্ধ চলে। সর্বপ্রকার সমরাস্ত্র দিয়ে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে শক্তিশালী করে তোলে। তা সত্ত্বেও ইরানকে শায়েস্তা করা সম্ভব হয়নি। বরং সাদ্দাম হোসেন মার্কিন অর্থে ও অস্ত্রে শক্তিশালী হয়ে ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ান।

তখন আবার শুরু হয় সাদ্দাম হোসেনকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে মিথ্যা অজুহাতে যুদ্ধ। বারো বছর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং জাতিসংঘ দ্বারা অস্ত্র তল্লাশি চালিয়েও সাদ্দাম হোসেনকে কাবু করতে না পেরে আমেরিকা দু’-দুটি গালফ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করেও আমেরিকা জয়ী হতে পারেনি। সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে; কিন্তু যুদ্ধে আমেরিকার জয় হয়নি। আমেরিকার জন্য ইরাক আরেক ভিয়েতনামে পরিণত হতে চলেছে। জর্জ বুশ জুনিয়র দম্ভ করে ইরাকের যুদ্ধ সমাপ্তি ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ সমাপ্ত হয়নি। ইরাক এখন বিশ্বের একটি ভয়ানক কিলিং ফিল্ড।

আমেরিকার ওবামা প্রশাসন এখন ভাবছেন কিভাবে সম্মান বাঁচিয়ে ইরাক থেকে সরে আসতে পারেন। পারছেন না। যুদ্ধের আগুন সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সম্মুখযুদ্ধে ন্যাটো বাহিনী পর্যন্ত নাকানিচুবানি খাচ্ছে। ড্রোন হামলার শক্তি আমেরিকার না থাকলে সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত মার্কিন সৈন্যদের ইরাক ও সিরিয়া থেকে বহু আগে পালাতে হতো। ইরাক ও সিরিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করার জন্য আমেরিকা যে আইএস বা তথাকথিত ‘ইসলামিক স্টেট’ বাহিনী গড়ে তুলেছিল, সেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সঙ্গে এখন ন্যাটোসহ আমেরিকা যুদ্ধরত। এই যুদ্ধ যে অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে প্রেসিডেন্ট ওবামা সেই সতর্কবাণীও উচ্চারণ করেছেন।

পশ্চিমা মিডিয়াগুলো অবশ্য মাঝে মাঝে এই আশাবাদ জাগ্রত করে যে, সন্ত্রাসী আইএস শীঘ্রই পরাজিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু যে সন্ত্রাসীদের নিজস্ব কোন ভূখ- নেই, তাদের নিশ্চিহ্ন করা সহজ নয়। এরা প্রয়োজনে ইরাক ও সিরিয়া থেকে সরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বা আফ্রিকার অন্য কোন দেশে মাথা তুলবে। আর আমেরিকাকে চোরের পেছনে পুলিশ ছোটার মতো ক্রমাগত ছুটতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যে আগুন আমেরিকা জ্বালিয়েছে সুপারপাওয়ার হওয়া সত্ত্বেও সে আগুন নেভানোর শক্তি তার নেই।

আফগানিস্তানেও আমেরিকার একই দশা। লাদেনকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আল কায়েদা ও তালেবান দমনে আমেরিকা সফল হয়নি। এখানেও পরাজয়ের কালিমা আমেরিকাকে গায়ে মাখতে হয়েছে এবং ভাল তালেবান খুঁজে তাদের সঙ্গে আপোস করে মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে আনতে চায় ওবামা প্রশাসন। ইরাক এবং সিরিয়াতেও আইএসের বিরুদ্ধে স্বল্পকালের মধ্যে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ওবামা প্রশাসন হঠাৎ তাদের ইরান নীতি বদলাতেন না। চিরবৈরী ইরানের সঙ্গে বৈরিতার বদলে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা। ইচ্ছা, শিয়া ইরানকে আইএস নামক সন্ত্রাসী সুন্নিবাহিনীর বিরুদ্ধে কাজে লাগানো। সিরিয়ার আসাদ সরকারকে রক্ষার জন্য ইরান আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। আমেরিকা এই যুদ্ধে ইরানকে সাহায্য জুগিয়ে আইএসকে ধ্বংস করতে চায় এবং যুদ্ধে পরাজয়ের অসম্মান থেকে বাঁচতে চায়।

এই উদ্দেশে ডেমোক্র্যাট ওবামা প্রশাসন মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের তীব্র বিরোধিতা এবং ইসরায়েলের নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির মুখেও ইরানের সঙ্গে সমঝোতার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বিরোধিতায় আইএসের যদি পরাজয় ঘটে, তাহলে সে জয়ের কৃতিত্ব পাবে ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যে সে অদ্বিতীয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হবে। তা হবে আসলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির চূড়ান্ত পরাজয়। সম্ভবত সেই পরাজয়ের দিকেই আমেরিকা দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

কিছুদিন আগেও সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের অঙ্গরাজ্য ছিল ইউক্রেন। সেখানে রাজনৈতিক ও সামরিক দুরভিসন্ধি নিয়ে হস্তক্ষেপ করতে গিয়ে পুতিন সরকারের দৃঢ়তার মুখে মার্কিন নীতি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জেও কি আমেরিকা জয়ী হবে? আশা কম। তাই একটি মার্কিন ম্যাগাজিনে একজন মার্কিন নাগরিকই প্রশ্ন তুলেছেন, আমেরিকা কোনকালে কোন যুদ্ধে জয়ী হয়েছে, না হবে? আমার মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

লন্ডন, ১৮ মার্চ, বুধবার ২০১৫

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ ২০১৫

১৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: