কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পদ্মায় অসময়ে অথৈ পানি, নৌকা ভাসিয়েছে মাঝি

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ ২০১৫
  • ফারাক্কার ৪৯ নম্বর গেট ভেঙ্গে গেছে

মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী থেকে ॥ শুষ্ক মৌসুম শুরুর অনেক আগেই শুকিয়ে ‘খাক’ হয়ে যায় উত্তাল পদ্মা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পদ্মার বুকে জেগে ওঠে শুধুই বালুর স্তর। কিন্তু এই চৈত্রে হঠাৎ করেই পানি এসেছে রাজশাহীর পদ্মায়। ‘চৈত্র মাসে পদ্মায় জলরাশি’-এমন দৃশ্য অতীতে দেখা না গেলেও এবার মিলেছে সেই দৃশ্য। গত তিনদিন ধরে পদ্মায় পানি এসেছে। হঠাৎ টলটলে পানিতে ভরে উঠেছে স্রোতহারা পদ্মা।

পদ্মার রাজশাহী অংশে হঠাৎ পানির প্রবাহে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে পারের মানুষের মনে। পদ্মাপারে যে জেলেরা তাদের নৌকা এতদিন গুটিয়ে নিয়েছিলেন তাঁরা আবার নৌকা ভাসিয়েছেন। তিনদিন আগেও পদ্মার বুকজুড়ে যেখানে ছিল শুধুই ধু ধু বালুর স্তর, সেখানে এখন নীল স্বচ্ছ জলরাশি। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার এ রূপ দেখতে মানুষ তাই পদ্মাপাড়ে ভিড় জমাচ্ছেন। হঠাৎ করে পদ্মার বুক ভাসিয়ে পানি আসলেও এ পানির স্থায়িত্ব নিয়েও শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন। গত দু’দিনে পদ্মার রাজশাহী অংশে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৯ সেন্টিমিটার।

হঠাৎ করে এ পানি প্রবাহের উৎস কী তা অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে নতুন তথ্য। জানা গেছে, গত রবিবার ভারতের গঙ্গায় ফারাক্কা ব্যারাজের একটি লকগেট ভেঙ্গে গেছে। সে কারণে ফারাক্কা দিয়ে পদ্মায় হু হু করে পানি প্রবেশ করছে। আর সে কারণেই পদ্মার পানি বেশি প্রবেশ করে শুষ্ক মৌসুমেও প্রবাহিত হচ্ছে অঢেল পানি।

ভারতীয় গণমাধ্যম জানায়, ফারাক্কা ব্যারাজের একটি লকগেট গত রবিবার রাতে ভেঙ্গে গেছে। এ জন্য ব্যারাজ কর্তৃপক্ষকে দুষে ইতোমধ্যে সেদেশের কেন্দ্রীয় জলসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী উমা ভারতীকে পরের দিন সোমবার চিঠিও দিয়েছেন রাজ্যের সেচমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, রক্ষণাবেক্ষণে ব্যারাজ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণেই এই পরিস্থিতি। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ফারাক্কা ব্যারাজের জেনারেল ম্যানেজার সৌমিত্র কুমার হালদার অবশ্য সে অভিযোগ মানেননি। বরং ফারাক্কায় গেট ভাঙ্গা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে ২০১১ সালের জুন ও ডিসেম্বরে দু’টি গেট ভেঙ্গেছিল। জানা গেছে, সর্বশেষ রবিবার যে গেটটি ভেঙ্গেছে তার নম্বর ৪৯। এটি অতি বিপজ্জনক গেটের তালিকায় ছিল।

এদিকে রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী হারুন-অর-রশিদ জানান, পদ্মার পানি বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের গেট ভেঙ্গে যাওয়া। এ কারণে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই শুষ্ক মৌসুমেও পানি এসেছে। এটি মূলত ফারাক্কার বদ্ধ পানি। এ পানি হয়তো কয়েকদিন থাকবে। গেট সংস্কার হলে পানিও হারিয়ে যাবে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডে নিয়োজিত পদ্মার গেজ পাঠক (পানি পরিমাপক) শহিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী রবিবার রাজশাহীতে পদ্মায় পানি ছিল ৮ দশমিক ৯৬ মিটার। পরের দিন সোমবার সেই পানি ৪ সেন্টিমিটার বাড়ে। মঙ্গলবার আরও ৩৫ সেন্টিমিটার বেড়ে সন্ধ্যায় পদ্মা ৯ দশমিক ৩৫ সেন্টিমিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থির নদীতে স্রোত বেড়েছে। এ কারণে যেসব এলাকায় বালুর ঘাট ছিল সেসব এলাকায় ভাঙ্গনও দেখা দিয়েছে।

গত তিনদিন আগেই পদ্মা ছিল একেবারেই শুষ্ক। চরে চলত স্থানীয় শিশু-কিশোরদের ক্রিকেট খেলা। বুধবার সেই পদ্মায় গিয়ে দেখা গেল পানির প্রবাহ। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা চরের বেশিরভাগ এখন পানিতে থৈ থৈ।

বুধবার সরেজমিন পদ্মা নদীর বুলনপুর, টি-বাঁধ, আই-বাঁধ ও পবা এলাকার নবগঙ্গা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় পদ্মায় নীল টলমলে পানির প্রবাহ। খবর পেয়ে অনেকে দেখতে আসছেন পদ্মার এ নতুন রূপ। এরই মধ্যে মাঝিরা ভাসিয়েছেন ছোট ছোট নৌকা। সেগুলোয় ভ্রমণ পিয়াসীদের পারাপার করছেন এপার-ওপার। স্থানীয়রা জানান, তিনদিন আগেও একফোঁটা পানি ছিল না। এখন পানি আসায় নৌকা চলাচল করছে। ইতোমধ্যে চরাঞ্চলের অনেকের ক্ষেত ডুবে গেছে।

স্থানীয় মাঝিরা জানান, এই সময় (চৈত্র মাসে) পদ্মার বুকে বালু ছাড়া কিছু থাকে না। এবারও শুষ্ক মৌসুম শুরুর অনেক আগেই শুকিয়ে খাক ছিল পদ্মা। তবে হঠাৎ পানি পেয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও তারা আশায় বুক বেঁধেছেন। পদ্মায় পানি আসায় এখন নতুনরূপে সেজেছে অনেক আগে থেকেই স্রোতহারা পদ্মা।

এদিকে পদ্মায় হঠাৎ পানির প্রবাহ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পবা উপজেলার কিছু অংশে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য পানি বৃদ্ধিতেই যদি এ অবস্থা হয় তাহলে আগামী বর্ষা মৌসুমে এলাকার মানুষ বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, পদ্মার নবগঙ্গা এলাকায় ছয়টি বালুর ঘাট ছিল। এর মধ্যে নবগঙ্গা এলাকার বাবর মেম্বার ও আতিকুর রহমান সেনার দুটি ঘাটসহ পাঁচটি বালু ঘাট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে বালু মহাল টেন্ডার দেয়া হয়েছে। যারা টেন্ডার পেয়েছে তারা নদীর গভীর থেকে বালু উত্তোলন না করে নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছে। এতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই এলাকা ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে।

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ ২০১৫

১৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: