কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভারত মহাসাগরে মিত্র বাড়ানোর পদক্ষেপ

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫
  • মোদির শ্রীলঙ্কা সফর
  • আতাউর রহমান রায়হান

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রায় তিন দশক পর শ্রীলঙ্কা সফরে গেলেন নরেন্দ্র মোদি। সফরে দু’দেশের মধ্যে ‘উত্তম প্রতিবেশীসুলভ’ সম্পর্ক বজায় রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আশির দশকে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকারের আমলে শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ অবসানের উদ্যোগ নিয়ে ভারত ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে দু’দেশের সম্পর্কে চির ধরে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শ্রীলঙ্কার ওপর বর্তমানে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব খর্ব করে ভারতীয় প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতেই কলম্বো সফরে গেছেন মোদি। গত কয়েক বছর ধরে শ্রীলঙ্কাকে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়ে আসছে চীন। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধে ভেঙ্গে পড়া যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নেও সাহায্য করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে চীনের সঙ্গে খোলাখুলি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর দুর্নীতির অভিযোগে চীনের সঙ্গে সব ধরনের বড় বড় চুক্তি পুনরায় পর্যালোচনা করার ঘোষণা দেন সিরিসেনা।

গত মাসে ভারত সফরে যান সিরিসেনা। ক্ষমতা গ্রহণের পর যেটা ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। যা ভারতের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সম্পর্ক ঠিকঠাক করার ইঙ্গিত দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার সংসদে এক ভাষণে মোদি বলেন, ভারতের জন্য যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমি দেখেছি, আমি চাই আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোরও তেমন ভবিষ্যত হোক। শনিবার তামিল অধ্যুষিত জাফনা শহরে যান মোদি। এই প্রথম ভারতের কোন প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ বিক্ষুব্ধ এই শহরে পা রাখলেন। সেখানে তিনি যুদ্ধের কারণে গৃহহারা স্থানীয় বেশ কয়েকটি তামিল পরিবারের কাছে বাড়ি হস্তান্তর করেন। ভারতের সহযোগিতায় ওই বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়।

বিদেশনীতিতে নতুন জোয়ার আনতে চাওয়া মোদি ঠিক এই জায়গাটি থেকেই শুরু করতে চাইছেন। কূটনীতিকদের মতে, বিদেশনীতির প্রশ্নে জাতীয় বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ঘরোয়া রাজনীতিকে একই বন্ধনীতে রেখে মোদি এগোতে চাইছেন। শ্রীলঙ্কায় ভারতের যে কর্মকাণ্ড চলছে সেটিকে এবার ভারতের তামিল জনতার সামনেও তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করে মোদি সরকার। চীনের সিল্ক রুটের টক্কর নেবে ভারতের কটন রুট!

ভারত মহাসাগরের একটা বড় অংশে চীন তাদের প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। তাদের নৌবহরের আনাগোনা বাড়ছে এ এলাকায়। এর মোকাবেলায় প্রাচীন ‘কটন রুট’-এর ঐতিহ্য ফেরাতে চাইছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। চাইছে ভারত মহাসাগরের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নিতে। তারই প্রথম ধাপ হিসেবে বছরের প্রথম বিদেশযাত্রায় বেরিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

দ্বীপরাষ্ট্রের নয়া সরকারের সঙ্গে আরও গভীর মৈত্রীর বার্তা দিলেন নরেন্দ্র মোদি।

তবে কলম্বোর নতুন শাসকরা ভারতের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। কিন্তু শ্রীলঙ্কার জলসীমার মধ্যে ভারতীয় ধীবরদের ঢুকে পড়া নিয়ে সম্প্রতি তিক্ত মাহিন্দা রাজাপাকসের পতনের পরে কলম্বো-দিল্লীর মৈত্রীর পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করেছিলেন কূটনীতিকরা। এমনকি রাজাপাকসের পতনের পেছনেও দিল্লীর হাত আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আজ একটি সাক্ষাতকারে সেই অভিযোগ ওঠে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ভারতীয় ধীবরেরা শ্রীলঙ্কার জলসীমায় ঢুকলে তাঁদের গুলি করা হবে বলে হুমকি দেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিঙ্ঘে।

কূটনীতিকদের মতে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল তথা এশিয়ায় মিত্র দেশের সংখ্যা বাড়াতে চাইছে মোদী সরকার। চীনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে গেলে এই ধরনের মিত্র দেশের সমর্থন ভারতের পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয়। ধীবরদের নিয়ে তিক্ততা যাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুর পুরোটা না কেটে দেয় সেই চেষ্টাই করবেন মোদি। সেই হিসেব মেনে শ্রীলঙ্কায় সমাজের সব অংশকে নিয়ে চলার চেষ্টার জন্য প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনার প্রশংসা করেছেন মোদি। কিন্তু সেই সঙ্গে তামিলদের নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথাও জানিয়ে দিয়েছেন সুকৌশলে। তাঁর কথায়, ‘শ্রীলঙ্কার সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী দ্রুত কার্যকর করে তামিলদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দেয়া উচিত।’

শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে তামিল আবেগের অঙ্ক মাথায় রাখতে হয় দিল্লীকে। তামিল অধ্যুষিত উত্তর শ্রীলঙ্কায় ইতোমধ্যেই বড় ধরনের নির্মাণকাজ করছে ভারত। জাফনায় গিয়ে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধন করেছেন মোদি। আবার বৌদ্ধ সিংহলী জাতীয়তাবাদীদের খুশি করতে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের শহর অনুরাধাপুরায় যান তিনি। সেখানে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দক্ষিণ শ্রীলঙ্কার সিংহলী অধ্যুষিত মাতারা জেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামাঙ্কিত প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করবে ভারত।

ধীবরদের বিষয়টি অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর পিছু ছাড়েনি। সিরিসেনার সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মোদি জানান, এই বিষয়টির সঙ্গে দু’দেশের মানুষের জীবিকা ও বেঁচে থাকা জড়িয়ে আছে। তাই এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান প্রয়োজন।

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫

১৮/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: