মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘প্রক্সি’ যুদ্ধের শেষ কোথায়

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫
  • কামরুল হাসান

কোন একটি রাষ্ট্রে বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বলয় বিস্তৃত করার প্রতিযোগিতা যে কতটা ভয়ঙ্কর ও অবিবেচক হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ সিরিয়া। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে হটানো কিংবা টিকিয়ে রাখার এ সংঘাত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ভূমধ্যসাগরীয় এ দেশটিকে। বিগত চার বছরের গৃহবিবাদে সিরিয়ায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লক্ষাধিক। এক কোটি সিরিয়ান গৃহহীন হয়েছে। সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে জাতিসংঘ যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে পানি-চিকিৎসা, খাদ্য পৌঁছে দিতে পারছে না যার ফলে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশু ধ্বংসস্তূপেই ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এছাড়া আঞ্চলিক সুন্নি রাষ্ট্র, মার্কিন মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নিয়েছে নতুন জঙ্গী সংগঠন আইএসআইএস, যা এখন পুরো বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিরিয়া এখন ফরেন ফাইটারদের কাছে ‘ফেয়ারি ওয়ারে’ পরিণত, যে কারণে জিহাদী জনের মতো অসংখ্য পশ্চিমা নাগরিক এ রূপকথার জেহাদে আকৃষ্ট হয়ে দেশ ছেড়েছে। আরব বসন্তের মরুঝড় যখন উত্তর আফ্রিকায় স্বৈরশাসকদের মসনদ কাঁপিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে, তখন সব কটি রাষ্ট্রে এ বসন্তের হাওয়া লাগে। ইরান-সৌদি আরব-বাহরাইন-ইয়েমেনে বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে যার রেশ। উল্লিখিত প্রতিটি রাষ্ট্র শক্ত হাতেই দমন করে গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাক্সক্ষা।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদও অন্য স্বৈরশাসকদের চেয়ে ব্যতিক্রম ছিলেন না। ২০১১ সালের মার্চে যখন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের শহর দেরায় স্কুলছাত্ররা তাঁর বিরুদ্ধে দেয়ালে সেøাগান লিখছিল, তখন গুলি করে হত্যা করা হয় তরুণ আন্দোলনকারীদের। ২০১১ সালের মার্চ থেকে জুনের মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন রূপ নেয় গৃহযুদ্ধে। ইরানের প্রভাব বলয়ে থাকা আসাদ সরকারকে হটাতে তখন প্রতিবেশী সুন্নি রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করে বিক্ষোভকারীদের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা দুই মিত্র ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঢালাওভাবে সামরিক সহায়তা দেয় আসাদবিরোধী গোষ্ঠীকে। গঠন করা হয় ফ্রি সিরিয়ান আর্মি। আসাদের দুই মিত্র রাষ্ট্র রাশিয়া ও ইরান আন্দোলনের শুরু থেকেই আসাদের পাশে ছিল। ২০১২ সালে সুন্নি উগ্রপন্থী যোদ্ধারা দামেস্কে ও আলেপ্পোতে ঢুকে পড়লে আসাদের পক্ষে যুদ্ধে নামে লেবাননের শিয়া বাহিনী হিযবুল্লাহ ও ইরানের ফরেন ব্রিগেড আল কুদস। জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদা ইরাকের মতো সিরিয়ায়ও নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে এবং জাবাথ আল নুসরা নামের একটি সংগঠন তৈরি করে। জাবাথ আল নুসরা কিংবা আল নুসরা ফ্রন্ট পরিণত হয় জিহাদীদের স্বপ্নের ঠিকানায়। নুসরা ফ্রন্ট ব্যানারে আল কায়েদা সিরিয়ায় তাদের অপারেশন পরিচালিত করে এবং ইরাক থেকে তা নিয়ন্ত্রিত হয়। ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন ও সাদ্দাম পতনের পর আল কায়েদা ইন ইরাকের (ওছও) পতন। ইরাকের সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চলে ছিল তাদের অবস্থান। ইরাকের প্রেসিডেন্ট নুরী আল মালিকীর সুন্নি বিদ্বেষ আইকিউউআইয়ের (ওছও) পালে হাওয়া দেয়। ইরাক জুড়ে বাড়তে থাকে আন্তঃধর্মীয় সংঘাত। সিরিয়া-ইরাক প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ার কারণে আইকিউআই ও নুসরা ফ্রন্ট খুব সহজেই দুই ফ্রন্টে সম্মিলিত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। যার ফলাফল আইএসের মতো জঙ্গী গোষ্ঠীর উত্থান।

আল নুসরা ফ্রন্ট ছাড়াও অসংখ্য সুন্নী জঙ্গী গোষ্ঠী বা যোদ্ধা এখন সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইররত। গৃহযুদ্ধের শুরুতে আসাদকে হটাতে বিবদমান সব পক্ষের মার্কিন অস্ত্র সাহায্য জোটে পাশাপাশি সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলোর অর্থ সাহায্য তো থাকলই। ইরান কিংবা রাশিয়া বসে থাকেনি। ইরানের বহু জেনারেল আসাদকে টিকিয়ে রাখতে তখন দামেস্ক পাড়ি দিয়েছিলেন, সঙ্গে ছিল আল কুদস ব্রিগেড। অন্যদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ার বিরুদ্ধে যে কোন প্রস্তাবের বিপক্ষে দাঁড়ায় রাশিয়া। সিরিয়া এখন বিবদমান আঞ্চলিক ও পরাশক্তির প্রক্সি ওয়ার।

২০১৩ সালে বিদ্রোহীদের বিপক্ষে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। বাসার আল আসাদকে ক্ষমতা থেকে হটাতে তখন যুক্তরাষ্ট্র তোড়জোড় শুরু করলে পাশে দাঁড়ায় রাশিয়া। রাশিয়ার হস্তক্ষেপে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সিরিয়া তখন নিজেদের রাসায়নিক অস্ত্রসমূহ ধ্বংস করে। এবং বিদ্রোহীদের বিপক্ষে যুদ্ধাপরাধের দায় চাপায়। সিরিন গ্যাস ছাড়াও আসাদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যারেল বোমা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বোমা ব্যবহার ছাড়াও বিবদমান দুই পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে সিরিয়ার অন্যতম সমস্যা হলো দেশটির ৪০ লাখ মানুষ প্রতিবেশী দেশসমূহের শরণার্থী শিবিরে উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করছে। অভ্যন্তরীণ গৃহহীনতার শিকার ৮০ লাখ মানুষ। বর্তমানে সিরিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে এবং ৩০ শতাংশ মানুষের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ। দীর্ঘ চার বছরের আর্থিক ক্ষতি ২০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং পুরো দেশ ধ্বংসস্তূপের আবর্জনায় পরিণত।

আরব লীগ, জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থা সিরিয়ার গৃহবিবাদের মতো সঙ্কট নিরসনে ব্যর্থ। ইতোমধ্যে পশ্চিমাদের অবিবেচক পৃষ্ঠপোষকতা বুমেরাং হয়ে নিজ দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঠোর নজরদারির মাঝেও ঠেকানো যাচ্ছে না ফরেন ফাইটারদের ঢল।

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫

১৮/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: