রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্যালুট-প্রিয় মাহমুদুল্লাহ

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫
  • জাহিদ রহমান

এই বিশ্বকাপের আগে মাহমুদুল্লাহ সেই অর্থে তারকা ছিলেন না। ক্রিকেটে বরাবরই যতটা অন্যদের নিয়ে মাতামাতি হতো সেই তুলনায় তিনি ছিলেন ম্রিয়মান। তবে স্বভাবজাত স্টাইলে সবসময় তিনি অন্তরালেই থেকেছেন বললে ভুল হবে না। খানিকটা অন্তর্মুখী স্বভাবি হওয়ার কারণে নিজেকে প্রকাশও করেননি সেভাবে। ফলে মিডিয়াও সেভাবে তাঁর পেছনে কখনও ছুটেনি। কিন্তু সেই মাহমুদুল্লাই এখন মহাতারকা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন পথের সন্ধানদাতা, এক নতুন সঞ্জীবনী শক্তি। নতুন এক ইতিহাসের রচিয়তা তিনি। ময়মনসিংহে জন্ম নেয়া এই তরুণ এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত যা দিয়েছেন তাঁর কোন তুলনা নেই। যে যত হিসাবই করুক না কেন তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স ইতিমধ্যেই তাঁকে অসীম এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আর পুরো বাংলাদেশের মানুষের মনকেই তিনি জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।

বিশ্বকাপের প্রাক্কালে তারকা ক্রিকেটার সাকিব, তামিমদের প্রতিই যেন নজরটা সবার বেশি ছিল। তাঁদের নিয়ে ক্রিকেটভক্তরা কল্পনার আকাশে বেশি বেশি ছবি এঁকেছিলেন। ভেবেছিলেন হারজিত যায় হোক, বাংলাদেশের কপালে যায় থাকুক না কেন অন্তত ব্যাটিং বিনোদনের উপলক্ষ হবে তারাই। আর মুশফিক তো বরবরই এক নির্ভরতার নাম। সবার ভাবনাতেই ছিল- আর কেউ কিছু না পারুক প্রতিপক্ষের বুকে কম্পন ছড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে সাকিব, তামিম আর এ দু’জনের বাইরে মুশফিক। প্রতিপক্ষের ওপর ব্যাটিং খবরদারি তাঁরা করবেনই। কিন্তু সেই প্রত্যাশাকে দূরে ঠেলে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ নামের তরুণটি যে এভাবে ক্রিকেটে বাজিমাত করবেন সেটা কারোর কল্পনাতেই ছিল না। কল্পনাতে থাক বা না থাক মাহমুদুল্লাহ বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য যোগ্যতায়। বিশ্বকাপের গৌরবময় আসরে তার অসাধারণ ব্যাটিং বাংলাদেশ নামের শব্দটিকে ভীষণভাবে সুরভিত করেছে। মাহমুদুল্লাহ যা করেছেন তা কেউই ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না। তবে দুটি শতক হাঁকানোর পর মাহমুদুল্লাহ বলেছেন, বরাবরই তার সংকল্প ছিল বাংলাদেশকে অনেক দূরে নিয়ে যাবেন। সেই সংকল্পের কথা কখনই প্রকাশ করেননি। মনের মাঝেই কেবল পুষে রেখেছিলেন।

এবারের বিশ্বকাপের আগে কোন বিশ্বকাপেই বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটারের সেঞ্চুরি বলে কিছু ছিল না। ফলে সবার মনের মধ্যেই দুঃখ ছিল, বেদনা ছিল, গভীর ক্ষত ছিল। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে অনেকেই বেদনায় ভেঙ্গে পড়তেন। আফসোসেরও সীমা ছিল না। বিশ্বকাপের টানা চতুর্থ আসরে খেলছে বাংলাদেশ অথচ কারও একটা সেঞ্চুরি নেইÑ এটি দুঃখ পাওয়ার মতোই বিষয়ই ছিল। তবে এবারে বিশ্বকাপের জয়-পরাজয় আর পরের ধাপে যাওয়ার হিসাব-নিকাশ করতে গিয়ে কেউ সেভাবে ভাবেনি যে সেই অর্থে তারকা নয় এমন কেউ প্রতিপক্ষের ভীত নড়িয়ে দিয়ে সেঞ্চুরি করে ক্রিকেটে এক অনন্য ইতিহাস গড়বেন। অবশ্য এর অন্তর্গত কারণ এবং অনুষঙ্গও ছিল অনেক। কেননা এর আগে কোন বিশ্বকাপেই খুব একটা ভাল পারফরম্যান্স ছিল না আমাদের। অনেকটাই যাওয়া আর আসার মাঝেই সব সীমাবদ্ধ ছিল।

কিন্তু ৯ মার্চ ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচের দিন এক অসাধারণ ইতিহাসের জন্ম দেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। এদিন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে চমৎকার ব্যাটিং নৈপুণ্য দেখিয়ে প্রথমবারের মতো সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে গড়েন এক মহা ইতিহাস। সেই ইতিহাস যেন আরও পূর্ণাঙ্গতা পায় ইংল্যান্ডকে হারানোর মধ্যে দিয়ে। যে জয় বাংলাদেশকে ঠাঁই করে দিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে। অন্যদিকে এই পরাজয় ইংল্যান্ডকে ছিটকে দিল বিশ্বকাপের লড়াই থেকে।

আর এদিনই এ্যাডিলেডের মাঠে সবাই দেখল মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ নামের তরুণটির এক আসাধারণ ব্যাটিং। এবারের বিশ্বকাপের ৩৩তম ম্যাচে ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সূচনাটা মোটেও ভাল ছিল না। বিশেষ করে শুরুতেই ইমরুল কায়েস এবং তামিম ইকবাল এ দু’জনে মাত্র চার রান উপহার দিয়ে আউট হয়ে মাঠ ছেড়ে চলে গেলে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ক্রিজে আসেন সৌম্য সরকার এবং মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। আস্তে আস্তে দু’জনে অগ্রসর হতে থাকেন। সৌম্য সরকারও বিদায় নেন। কিন্তু ততক্ষণে ক্রিজে সেট হয়ে গেছেন মাহমুদুল্লাহ। দারুণ প্রগ্রেসিভ সব শট খেলছেন। তার ব্যাটিং আর থামছে না। ব্যাটিং করতে করতেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই ভাবছিলেন এই বোধ হয় সাজঘরে ফিরবেন তিনি। না, সে কলঙ্কের পথে না গিয়ে একেবারে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ছাড়েন। ১৩৮ বল খেলে ১০৩ রানের অনন্য সুন্দর একটি ইনিংস উপহার দিয়ে বাংলাদেশকে তিনি দেখান এক নতুন পথ। বিশ্বকাপে এটিই হলো কোন বাংলাদেশীর প্রথম সেঞ্চুরি হাঁকানোর রেকর্ড। এদিকে ১৩ মার্চ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আবারও ভীষণরকম জ্বলে উঠেন মাহমুদুল্লাহ। এদিন ফের সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১২৮ রানে অপরাজিত থাকেন। এদিন কিছুটা ভাগ্য আর কৌশলগত সুবিধা না পাওয়ায় বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডের কাছে হারলেও হারেননি মাহমুদুল্লাহ। বিশ্বকাপের আসরে পরপর দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে তিনি দেশের সব মানুষের মুখে অন্যরকম হাসি ফুটিয়ে তুলেন।

এই বিশ্বকাপে আসলেই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া মাহমুদুল্লাহকে। বলতে দ্বিধা নেই বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের পরপর দুটি ম্যাচে তিনি অনেক দিয়েছেন। স্বভাবতই বিশ্বের নামকরা ক্রিকেট সেলিব্রেটিরাও তাঁর প্রশংসা না করে পারেননি। তাঁর ব্যাটিং সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন সুনীল গাভাস্কার থেকে অসংখ্যজন। মাহমুদুল্লাহর অসাধারণ কীর্তি আমাদের ক্রিকেটকে আরও আলোকময় পথে নিয়ে যাওয়ার জন্যে এক নতুন অধ্যায়। ক্রিকেটে আগামীতে আরও যারা আসবে তাঁদের জন্যে সত্যিই এক অফুরন্ত শক্তির দ্বার উন্মোচন করে গেলেন তিনি। মাহমুদুল্লাহর ইতিহাস-ক্রিকেটে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্ত উৎস হয়ে থাকল। তোমাকে অভিবাদন- প্রিয় মাহমদুল্লাহ।

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫

১৮/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: