কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘আমি জয়ের স্বপ্নই দেখছি’

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫
  • মেলবোর্নে চাপে থাকবে ভারত, ম্যাচটা তাই ফিফটি ফিফটি না বলে সিক্সটি-ফোরটি ধরে নিচ্ছি
  • খন্দকার জামিল উদ্দিন

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলবে আসর শুরুর আগেই প্রত্যাশা করেছিলাম। যদিও স্বপ্নের এই ভেলায় গাঁ ভাসাতে ভয় ছিলেন এবার অনেকে। তবে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল। আগের বিশ্বকাপে হৃদয় ভাঙ্গার তিক্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভর করেছিল অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের মাটিতে খেলার ভয়। তার ওপর সাকিব-তামিমদের ২০১৪ সালটা কেটেছে ঘোর অমানিষার মধ্যে। ঘরের মাঠে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে পারফরম্যান্স, উদ্ভাসিত নৈপুণ্য বিশ্বকাপে টেনে নিয়ে যাওয়াটা ছিল বড় এক চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই অজানা একটা ভয় বাসা বেঁধে ছিল সবার মনে। এখন সব কিছু দূর হয়ে গেছে টাইগারদের গর্জনে। এ্যাডিলেডে লাল-সবুজের উৎসবটা তাই এখনও চোখে ভাসছে। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের শহরে ইংল্যান্ড বধ-কাব্যটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আজীবন সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। বড় ম্যাচে একটা জয় যে সব বদলে দিতে পারে ইংলিশদের হারানোর পর তাই প্রমাণ হচ্ছে। বৃহস্পতিবার যখন নকআউট পর্বে ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ, তখন তাই গর্বিত মন, প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলা উপভোগের সুযোগ থাকছে আমাদের। সবচেয়ে কঠিন গ্রুপ থেকে নকআউট পর্বে খেলাটা সত্যিকার গৌরবের বিষয়। ঠিক যেভাবে চেয়েছিলাম এখনও পর্যন্ত সবকিছু সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডকে হারানোর টার্গেট পূরণ হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও প্রায় জয়ের কাছে চলে গিয়েছিল মাশরাফির দল। এককথায় প্রত্যাশা পূরণে স্বপ্নের মতোই ঘটেছে সবকিছু।

টাইগাররা ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংÑ তিন পজিশনেই অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে গ্রুপ পর্বে। বিশেষ করে মাহমুদুল্লাহ, মুশফিকের কথা না বললেই নয়। লেট অর্ডারে তরুণ সাব্বির তো অসাধারণ। একজন লেট অর্ডার ব্যাটসম্যানকে উইকেটে গিয়েই সেট হতে হয় এবং স্ট্রোক খেলতে হয়। সাব্বির সেই কাজটিই করছে নিখুঁতভাবে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চের ক্রিকেটে যেটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। এবারই তার প্রথম বিশ্বকাপ। অভিষেকেই সাব্বির যেভাবে বলগুলো হিট করছে তাতে বলা যায় একজন কোয়ালিটি প্লেয়ারের মধ্যে যেসব গুণ থাকা দরকার সবই ওর মধ্যে আছে। এত বড় একটা প্লাটফর্মে নতুন হয়েও সে যেভাবে ব্যাট করছে তাতে একটা শব্দই ব্যাবহার করবাÑ অসাধারণ। পজিশনওয়াইজ, অর্থাৎ যে যেখানে খেলছে ভাল করছে। ওপেনিংটা ভাল হচ্ছে না ঠিক। কিন্তু দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় উইকেট জুটি ঠিকই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

তামিম-ইমরুলের ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে খুব। অসলে ওপেনিং জুটি অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রে ফেল করে। অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের মতো জায়গায় অনেক মাঠেই প্রথম দশ ওভারে বল খুব বেশি সুইং করে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আমরা দেখেছি বোল্ট ও সাউদির বল প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে উইকেট সহজ হয়ে ওঠেছিল। সহায়তা পাচ্ছিলেন ব্যাটসম্যানরা। ফলে ওপেনিং জুটি ব্যর্থ হলেও পরের ব্যাটসম্যানরা ঠিকই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, রান পাচ্ছে। এটা দারুণ ব্যাপার। ওয়ান ডাউনে সৌম্য তো চমৎকার খেলছে। ওর ইনিংস সামনে আরও বড় হবে আশা করি। সেই ক্ষমতা-দক্ষতা, মানসিকতা, মনোবল সৌম্যর রয়েছে। নতুন হয়েও যেভাবে খেলছে সেটিকে অসাধারণ বললে কম বলা হয়। মনেই হচ্ছে না সে তার অভিষেক বিশ্বকাপ খেলছে। এমন কন্ডিশনে তার খেলা দেখে মনে হচ্ছে, যেন অনেক অভিজ্ঞ। তার খেলা দেখে মনে হচ্ছে যেন বিগব্যাসের মতো টুর্নামেন্ট খেলে সে নিজেকে প্রস্তুত করে রেখেছে। আর মুশফিক তো অনেক দিন ধরের দলের কান্ডারী। টপ অর্ডারে রিয়াদ তার জীবনের সেরা খেলাটা খেলছে। বিশ্বকাপে যে কোন ব্যাটসম্যানের বেলায়ই এমন পারফরম্যান্স খুব কম দেখা যায়। কোয়ালিটি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কম ব্যাটম্যানই আছে যারা ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি হাঁকাতে পারে। নিউজিল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে সে যেভাবে সেঞ্চুরি করেছে এবং বলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রানটাকে শেষে এক করেছে সেটি এক কথায় অদ্ভুদ। এর চেয়ে ভাল কিছু আসলে হতে পারে না। সর্বোচ্চটাই দিয়েছে রিয়াদ। নাসির নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে চমৎকার বোলিং করেছে। সাকিব যতটুকু দেয়ার দিয়েছে। হয়ত সামনে আরও জ্বলে ওঠবে। আমার বিশ্বাস কোয়ার্টার ফাইনালের জন্যই সে তার সেরা খেলাটা তুলে রেখেছে। তামিমের বেলায়ও একই কথা বলব। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাশরাফি না খেললেও কোয়ার্টার ফাইনালে আবার দলকে নেতৃত্ব দিবে। শেষ ম্যাচে নেতৃত্বে ছোটখাটো যে ভুল চোখে পড়েছিল আশা করি সেগুলো কাটিয়ে ওঠবে দল। সমৃদ্ধ ভারতের ‘টিম বাংলাদেশ’ হয়ে খেলবে।

আমাদের ওপেনিংটা সত্যিই ধারাবাহিক হচ্ছে না। কিন্তু এটাও বুঝতে হবে ওপেনার ইমরুল কায়েস মাত্র ওই কন্ডিশনে পা দিয়েছে। আমাদের আর স্বাগতিকদের কন্ডিশনের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সেখানে দু’দিনের মাথায় মাঠে নামতে হয়েছে ইমরুলকে। ফলে মাঠে নেমেই বড় ইনিংস খেলা মোটেও সহজ নয়। পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেই বড় দলগুলো অনেক বিশ্বকাপ শুরুর আগেই সেখানে পাড়ি জমিয়েছিল। কাজেই ইমরুলের এই ব্যর্থতাকে মেনে নিতেই হবে। কারণ খেলাটার নাম ক্রিকেটে। এমনটা হতেই পারে। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে সে বেশ কয়েকটা দিন পাচ্ছে এবং আশা করি সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে। ওপেনিং জুটিতে কাল তাই কায়েস এবং তামিমকেই চাইব। সৌম্যকে এজন্যই ওয়ান ডাউনে চাই, কারণ সে এই পজিশনে ভাল খেলছে। সৌম্যকে ওপেনিংয়ে পাঠিয়ে একটা বাড়তি স্পিনার নেয়ার চিন্তা কারও মাথায় আসতে পারে। কিন্তু মনে রাখা দরকার ভারতের বিপক্ষে স্পিন দিয়ে কিছুই করা যাবে না। বরং সৌম্যকে দিয়ে ওপেন করালে সেক্ষেত্রে শফিউলকে দলে নেয়া হবে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কারণ ভারতকে পেস দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে। তবে সৌম্য যেহেতু ওয়ান ডাউনে ভাল খেলছে তাই তার যায়গাটা পরিবর্তন করা ঠিক হবে না। কারণ তাকে ওপেনিংয়ে পাঠালে পুরো ব্যাটিং অর্ডারটাই এলোমেলো হয়ে যাবে। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে যা হিতে বিপরীতই হতে পারে। শেষ দুটি ম্যাচ আমরা ভাল করেছি। তাই ব্যাটিং অর্ডার পরিবর্তন না করাই মঙ্গল।

প্রসঙ্গ ক্রমেই তামিমের ব্যাপারটা চলে আসছে আবার। শেষ দুটি ম্যাচে সে খারাপ করেছে। তবে তামিম এমন একজন ব্যাটসম্যান, যে কোন দিনই জ্বলে ওঠতে পারে। একটা কথা না বললেই নয়, তামিমকে নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু বলছে। অথচ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে করা তার ৯৫ রানের ইনিংসটার কথা ভুলে গেলে চলবে না। যে ইনিংসটা না হলে ৩১৮ রান চেজ করে আমরা জিততে পারতাম কিনা সন্দেহ। আর ওই ম্যাচটা জিততে না পারলে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার স্বপ্ন পূরণ হতো কিনা সন্দেহ। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যে ইনিংস দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে গেল সেই স্বীকৃতি কিন্তু তামিম পেল না। বরং দু’ম্যাচে ব্যর্থতার জন্য তাকে সবাই কটূক্তি করছেন। এটা ঠিক না। স্বাভাবিকভাবে এটা একজন প্লেয়ারের মানসিকতায় আঘাত হানতে পারে। বোঝা উচিত আমরা র‌্যাঙ্কিংয়ে কত নম্বর। সবসময়ই আমরা বড় কিছু করব এটা ভেবে বসে থাকলে চলবে না। ভাল খেলতে হলে ছেলেদের নির্ভারভাবে খেলতে দিতে হবে। এ পর্যন্ত এরাই আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছে। অনেক ম্যাচ জিতিয়ে গর্বিত করেছে। এদের জন্যই আজ সারা বাংলাদেশ আনন্দে মেতে ওঠেছে। মাঝেমধ্যে খারাপ সময় যেতেই পারে। তাই বলে কারও মু-ুপাত নির্বোধের কাজ।

আজ যে মাহমুদুল্লাহ নায়ক হয়ে দেখা দিয়েছে, সেই মাহমুদ উল্লাহকে নিয়েও তো গত বছর অনেক সমালোচনা হয়েছে। মুশফিকের ভায়রা এ কারণে সে দলে সুযোগ পায় এমন কথা ছড়িয়ে পড়েছিল। একটা পর্যায়ে দল থেকে বাদও দেয়া হয়েছিল তাকে। সেই মাহমুদুল্লাহকে নিয়েই এখন সবাই মাতামাতি করছি। ইদানীং তামিমের বেলায় আবার বলা হচ্ছে, আকরাম খানের ভতিজা, এ কারণে সে দলে টিকে আছে। এই সমালোচনার সভ্য কোন জবাব খোঁজে পাচ্ছি না। একবার ভাবুন তো বাংলাদেশের ক’জন প্লেয়ারের চার হাজার রান আছে? দু’জনের আছে। একজন সাবিক আল হাসান। আর একজন কিন্তু এই তামিম ইকবাল। লর্ডসে করা তার সেঞ্চুরির কথা ভুলে যাচ্ছি, পোর্ট অব স্পেনের কথা ভুলে গেছি। একটু খারাপ খেললেই প্লেয়ারদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার ঠিক না। সুতরাং একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে দর্শকদের বলব আমাদের সময় এসেছে খেলোয়াড়দের বোঝার। খেলোয়াড়রা ভুল করলে অবশ্যই তাদের জন্য শাস্তি আছে। খারাপ খেললে বাদও পড়বে। সেটি দেখার জন্য নির্বাচক আছে, ম্যানেজম্যান্ট আছে। আমরা এতটা যেন ভেঙ্গে না পরি। ১৫ জন খেলোয়াড় আর সাপোর্ট স্টাপ মিলেই বিশ্বকাপে এক টুকরো বাংলাদেশ। সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকলে আমি নিশ্চিত তারা আরও বেশি করে আমাদের সাফল্যের পথ দেখাবে।

বিশ্বকাপে এই মুহূর্তে আমরা খুব ভাল অবস্থানে আছি। দল খুব চমৎকার ক্রিকেট খেলছে। পুরো পৃথিবী বাংলাদেশকে সমীহ করছে। ছেলেদের সাহস যোগাতে পারলে তারা দলকে সেমিফাইনালেও নিয়ে যেতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে অনেক বেশি আশাবাদী। আমাদের যে ছেলেগুলো ফর্মে আছে তারা শতভাগ মাঠে দিতে পারলে, ওপেনিং জুটি জ্বলে ওঠলে অবশ্যই ভারতকে হারানো সম্ভব। একজন সংগঠন হিসেবে ইতোমধ্যেই আমি তাই সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। সুতরাং এখন আমাদের সবার একাত্ম থাকার সময়। সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে দলটাকে সমর্থন দিয়ে গেলে ইনশাআল্লাহ আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কিছু করে দেখাবে তারা।

আগামীকাল মেলবর্নের ভরা গ্যালারির সিংহ ভাগই হয়ত সমর্থন যোগাবে ধোনিদের। কারণ ওদের দর্শকই ওখানে বেশি। অনেকে হয়ত ভয়ে আছেন এ নিয়ে। তবে আমি বলব ভারতীয় দর্শকের বিপুল উপস্থিতি উল্টো চাপে রাখবে ধনির দলকেই। একটু চাপে পড়লে গ্যালারির চিৎকারে হিতে বিপরীত হতে পারে ভারতের জন্য। আসলে বড় আসরে ওদের বিপক্ষে আমাদের দু-দুটি জয় আমাকে এতটা বেশি স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ২০০৭ বিশ্বকাপ এবং ২০১২ এশিয়া কাপে ভারতের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে। দু’বারই আমরা তাদের পরাজিত করে আসর থেকে বিদায় করে দিয়েছিলাম। এগুলো এটাই ধারণা দেয় যে, বড় আসরে বাংলাদেশের সঙ্গে খেলা পড়লে ভারতই চাপে থাকে। আমি তাই জয়ের স্বপ্নই দেখছি।

ম্যাচটা ফিফটি ফিফটি না বললেও বলব সিক্সটি-ফোরটি। ভারত কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ম্যাচ কন্ডিশন বাংলাদেশের পক্ষেও কথা বলবে। আমরা আমাদের সেরাটা দিতে পারলে আল্লাহ আমাদেরই পুরস্কৃত করবেন। কারণ আল্লাহ তাকেই পুরস্কৃত করেন যে চেষ্টা করে বা যে তার সর্বোচ্চটা দিতে চায়। সাহসের সঙ্গে মোকাবেল করলে ভাগ্য আমাদের সহায় হবেই। আশা করি এ্যাডিলেডের মতো মেলবর্নেও লাল-সবুজের রঙ্গ ছড়াবে টাইগাররা। সেই স্বপ্ন নিয়েই এখন বিভোর আছি।

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫

১৮/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: