কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অনেক হয়েছে আর না ...

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫
  • মমতাজ লতিফ

এই লেখা যখন লিখছি তখনও খালেদার আকস্মিক ঘোষিত সংবাদ সম্মেলন হয়নি। তবে সংবাদ সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, তিনি সরকারকে কয়েকটি শর্ত দেবেন তার দেশ ও জাতিবিরোধী হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহারের প্রতিদান হিসেবে। এটি ভাবলে বিস্মিত হতে হয় যে- স্বজাতির দরিদ্র, নিরীহ মানুষকে পেট্রোলবোমা মেরে পুড়িয়ে অঙ্গার করে একজন তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা জনগণের জন্য কি দাবি পূরণ করতে চাইছেন! আজ যদি এই ঘটনা বিদেশের কোন রাজনৈতিক দল স্বজাতির নিরীহ-নিরপরাধ পরিবহন যাত্রী, চালক, চালকের সহযোগী, খাদ্যশস্য, সবজি, পোশাক ভর্তি ট্রাক, বাস, সিএনজি, রেলগাড়িতে পেট্রোলবোমা ছুড়ে, রেলপথ উৎপাটন করে জাতি ও দেশবিধ্বংসী রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে অপরাজনীতি করত, তাহলে এটি অনস্বীকার্য যে, প্রথম বোমা হামলার সঙ্গে সঙ্গেই হামলাকারী, তারপর জেরায় বেরিয়ে আসা ঐ দলের মধ্যম স্তরের নেতাকর্মী ও সবশেষে, সবার ওপরে যাদের নির্দেশে এসব বোমা হামলা করে নিরীহ নাগরিক হত্যা করা হচ্ছে তার মূল পরিকল্পক ও নির্দেশদাতা রাজনীতিকদের আইনের আওতায় আনা হতো। এটি না করলে কি হয় সেটি হিটলারের উত্থানের মাধ্যমে ইউরোপ যেমন জেনেছে, তেমনি আমেরিকা, রাশিয়াকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হিটলার ও তার খুনী জঙ্গী বাহিনীকে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু সংঘটিত হওয়া এক যুদ্ধে পরাজিত করে মানবসভ্যতাকে এক বিশাল মাপের দানবের হাত থেকে মুক্তি দিতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ করতে হয়েছিল। ঐ হিটলার দানবকে দমন পুরো পৃথিবীর মানুষের জন্য যে বার্তা দিয়েছিল সেটি বর্তমান ও ভবিষ্যতের মানবসভ্যতার জন্য আজও সত্য হয়ে আছে। ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছে খালেদা-তারেকের ক্ষেত্রে। তারা দু’জনে হঠাৎই একটি রাজনৈতিক দলের দলনেতা হয়ে গেছেন। তাদের জন্মলগ্নের মিত্র, যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াত ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সব দল, যে সত্যটি প্রমাণ করে গেছে যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনীদের মুক্তিদাতা, পুরস্কৃত করা বাংলাদেশের জিয়াউর রহমান। সুতরাং, জিয়া দ্বারা গঠিত বিএনপি দলটির লক্ষ্য আদর্শ যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত-আদর্শের অনুসারী যে দলের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসলামের নামে পাকিস্তান রক্ষা, পাকিস্তানকে তারা ‘ইসলামের ঘর’ও বলেছিল, অথচ তারা ঐ ‘ইসলাম রক্ষাকারী’দের প্রতি পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছে- বাঙালী তরুণীদের পাকিসেনাদের হাতে তুলে দিয়ে। এরপরও যদি কেউ জামায়াত-শিবিরকে ধর্মভিত্তিক দল বলে দাবি করে তাহলে তার চাইতে বড় রসিকতা আর কি হতে পারে? কথা উঠেছে- খালেদা সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী ১২১ জন নিরীহ নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোরকে পেট্রোলবোমার আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে এতটুকু মর্মাহত না হয়ে আরও পুড়িয়ে মারার কর্মসূচীকে অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে প্রকৃতপক্ষে কি খুনী, অপরাধী হননি? তিনি নিজেকে মিডিয়ার সহযোগিতায় বার বার অপরাধ করেও আইন ও আদালতের উর্ধে মনে করলেও তাকে কি খুনী-অপরাধীর মতোই বিচারের আওতায় আনা উচিত নয়? আজ বড় প্রশ্ন, আইনের চোখে দেশের সব নাগরিক কি সমান নয়? এই সেদিন পর্যন্ত খালেদা অতি অন্যায়ভাবে দেশের উপ-সেনাপ্রধানের সেনানিবাসের সরকারী বাসাটি জবরদখল করে রেখে, অন্য বাড়ি থাকা সত্ত্বেও, বড় অপরাধ করেননি? এটি তিনি করেছেন নিজেকে অবশ্যই অন্য নাগরিকের অনেক উর্ধে গণ্য করেন বলেই। যেটি করতে লজ্জাবোধও তিনি করেননি। বলাবাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার প্রথমত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও দণ্ড কার্যকর করে যেমন জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে, তেমনি যুদ্ধাপরাধীদের অসমাপ্ত বিচার কাজ শুরু করেছে। খালেদা জিয়ার অন্যায়ভাবে দখলে রাখা সরকারী বাড়িটি দখলমুক্ত করে সেখানে ২০০৯-এ বিডিআর বিদ্রোহে নির্মমভাবে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরই সঙ্গে বিডিআর বিদ্রোহের বিচার সম্পন্ন হয়ে তা আপীলে অপেক্ষমাণ রয়েছে। এ পর্যন্ত শত শত জঙ্গী মৌলবাদী বোমাবাজ গ্রেফতার হয়েছে। এইসব গ্রেফতার সরকারের সফলতা প্রমাণ করে। সাধারণ মানুষ হত্যা করে সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গী খুনীদের দ্বারা সারাদেশে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং সরকার পতনের লক্ষ্যে নাশকতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা। শেখ হাসিনা সরকারের সফলতার প্রধান ক্ষেত্র-অর্থনীতি, কৃষি, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতকে ধ্বংস করা। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের মধ্যে নিজেদের ব্যক্তি, অর্থাৎ তারেকের ক্রীতদাসদের অনুপ্রবেশ ঘটানো ও এই বর্বর, জঙ্গী নেত্রী খালেদাকে দমনের কঠিন সময়ে তাদের দ্বারা অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থানে ঠেলে দেয়া। বর্তমান কঠিন সময়ে দলের অভ্যন্তরে প্রকাশ্যে গোলাগুলি করতে পারে সেই ব্যক্তিরা যারা বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা তো করেই না, বরং শেখ হাসিনাকে বিপদে ফেলে খালেদা-তারেকের অবস্থান শক্ত করার কাজই করছে। পাঠক দেখেছেন- যুবলীগ-ছাত্রলীগ নামধারীরা গোলাগুলি করার পাশাপাশি খালেদা নবোদ্যমে উঠে দাঁড়িয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে ঘোষণা দিয়েছেন, যখন তার দলীয় নেতাকর্মীরাও তাকে সমর্থন দিচ্ছে না, দিচ্ছে যুবলীগ-ছাত্রলীগের তারেকের গোলামরা।

খালেদা-তারেক আরও যে কটি মূল্যবান সমাজ উপাদান বিনষ্ট করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম- সন্ত্রাসী জঙ্গীবাদী খুন, হামলাকে রাজনীতি হিসেবে চালানো, যাতে প্রকৃত জনসেবামূলক, দেশপ্রেমের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যায়। বড় কিছু পেতে হলে ক্ষুদ্র কিছু ত্যাগ করা রাজনীতিসম্মত। শাস্তিপূর্ণ হরতাল ও অবরোধ যা হচ্ছে রাজনীতির প্রতিবাদের ভাষা, সে দুটো কর্মপন্থাকে খালেদা জিয়া একেবারেই অকার্যকর করে দিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোন রাজনৈতিক দল অহিংস উপায় অবলম্বন করে রাজনীতি করতে না পারে। বিস্ময় লাগে এই দেখে যে, ঠিক জিয়াউর রহমানও রাজনীতির গণতান্ত্রিক চরিত্রকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে রাইফেল, অর্থ, মোটরসাইকেল, ক্যাডার, ভোট ব্যাংক দখল, ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটদানে বাধা প্রদান ইত্যাদির সূচনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম করেছিলেন। এ বিশ্বাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ‘গণআদালত’ বানচালের চেষ্টা করেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে নিয়োজিত বিচারক-সাক্ষী দেশের ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদোহ’ মামলা করে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। মাগুরা, মিরপুর উপজেলা নির্বাচনগুলোতে ক্যাডারভিত্তিক ব্যালটবাক্স ছিনতাইসহ যা যা অনিয়ম করা হয়েছিল সেসব বিবেচনা করে পরে আওয়ামী লীগ, এমনকি জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনের জন্য ‘নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা দাবি করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, হরতাল করেছিল। ২০০১-এর নির্বাচনী ফলকে দলীয় করার লক্ষ্যে খালেদা-তারেক-নিজামী যত অপকৌশল দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দলীয় করে, সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী-সমর্থকদের ওপর ’৭১-এর আদলে যে খুন, লুট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ পরিচালনা করে, তা ছিল এক কথায় অভাবিত। বর্তমানে সেই ২০১৩-এর পুরো বছরটি এবং ২০১৫-এর জানুয়ারি থেকে খালেদা-তারেক-জামায়াত মিলে যা করছে তাও রাজনীতি, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ধ্বংসের অব্যাহত প্রচেষ্টার ধারা- এটি বাঙালী জনগণ এবং বিএনপি অনুসারী নেতাকর্মী-সমর্থকদেরও বুঝতে হবে। বুঝতে হবে নেতা-নেত্রীর অনেক ওপরে দেশ ও জাতি। যে নেতা জাতিবিরোধী কাজের নির্দেশ দেয়, সে নেতা যা করছে তাকে কোনভাবেই রাজনীতি বলা যায় না, বলতে হবে- সন্ত্রাসী কর্মকা- ও জঙ্গীবাদ। এ কথা বলতে দ্বিধা করলে এ দ্বিধার সুযোগে এ দানবী হিটলার হয়ে উঠবে- এতে কোন সন্দেহ নেই।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বিটিআরসিতে যে জামায়াতপন্থীদের জোরালো উপস্থিতি রয়েছে সেটিকে শূন্যের কোটায় নামিয়ে না আনলে প্রগতিশীলদের ব্লগ বন্ধ হবে। অথচ জামায়াতীজঙ্গীদের ব্লগ বন্ধ হয়েও বার বার জন্ম নেবে এদের সহায়তায়- এ কথাটি জামায়াতী ব্লগাররা প্রকাশ্যে বলেছে। বিটিআরসি, বিটিভি, এনসিটিবি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সরকারী সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে আছে জামায়াত-বিএনপিপন্থীরা, যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে আছে। সংস্থাগুলোর মধ্যম স্তরে এরা বসে আছে এবং মধ্যম স্তরেই কিন্তু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাছাড়াও জামায়াত জঙ্গী-সন্ত্রাসী দল হিসেবে নিষিদ্ধ হলে এদের, বিএনপি নেত্রীরও মনোবল অনেকটাই ভেঙ্গে যাবে। করণীয় এ কাজটি আর ফেলে রাখার কোন যুক্তিপূর্ণ কারণ নেই। সময়ের কাজ সময়েই সম্পন্ন করুন।

এক সময়কার প্রধানমন্ত্রী বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াকে বলব, অনেক তো হলো, অর্থ-সম্পদও প্রয়োজনের বেশি অর্জন করেছেন। এবার হয় জেলে যান, নতুবা দেশান্তরে গিয়ে সুখে থাকেন। বাঙালী ও বাংলাদেশকে বাঁচতে দিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ

প্রকাশিত : ১৮ মার্চ ২০১৫

১৮/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: