কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো অপরিহার্য

প্রকাশিত : ১৫ মার্চ ২০১৫
  • ড. মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন খান

অর্থনীতির উন্নয়ন প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি ও শক্তিশালীকরণে অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিকল্প নেই। অবকাঠামো প্রধানত দুই ধরনের। অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং সামাজিক অবকাঠামো। আমরা এখানে মূলত অর্থনৈতিক অবকাঠামো নিয়ে কথা বলব। অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে সাধারণত মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়। মানবদেহে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া কোন কারণে বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ যেমন রুগ্ন হয়ে পড়ে, অচল হয়ে যায়, ঠিক তেমনিভাবে অর্থনৈতিক অবকাঠামো সেকেলে হলে, রুগ্ন হলে, ভঙ্গুর হলে অর্থনীতির স্বাস্থ্যও ভঙ্গুর বা রুগ্ন হতে বাধ্য। অর্থনৈতিক অবকাঠামোর মধ্যে আবার পরিবহন অবকাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এক্ষেত্রে আমাদের দেশে একটা নৈরাজ্যজনক অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের অবশ্যই পরিত্রাণ পেতে হবে। কারণ তা না হলে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ হবে এবং সরকারের সুষম উন্নয়নের স্বপ্ন, সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন কল্পনাই থেকে যাবে। স্থল পরিবহন বিশেষ করে রেল ও সড়ক পরিবহন সম্পর্কে ইতোমধ্যেই কিছুটা আলোচনা আমরা করেছি। এখানে তাই সে সম্পর্কে আর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। এখানে নৌপরিবহন নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। প্রকৃতি নিজ হাতে আমাদের ২৪ হাজার কিলোমিটার নদী বানিয়ে দিয়েছে। অথচ সেগুলো অযতœ ও অবহেলায় প্রায় সবটাই হয় মরে গেছে, না হয় মৃত্যুর কাছাকাছি আছে। এর মধ্যে এখনও পর্যন্ত সারা বছর নাব্য থাকে এমন নদীর দৈর্ঘ্য মাত্র সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার।

আমাদের নদীগুলো অধিকাংশ স্থানেই প্রয়োজনাতিরিক্ত প্রশস্ত। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য বাঁক। এগুলো কমিয়ে নদীগুলোর প্রশস্ততা হ্রাস করে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ জমি (কমপক্ষে মিলিয়ন হেক্টর) উদ্ধার করা সম্ভব, ঠিক তেমনি নদীগুলোর ভাঙ্গন রোধ করে নৌপরিবহনের গতি বৃদ্ধি করা সম্ভব। আর একটা কথা নদীর দু’তীর কংক্রিটে বাঁধাই করে দিতে হবে যা অবশ্যই একটা দীর্ঘমেয়াদী বিষয়। ভুললে চলবে না যে, নদী আমাদের অর্থনীতির জীবন। ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে পারলে আমরা অবশ্যই দেশকে বন্যামুক্ত রাখতে সক্ষম হবো। এটাও অবশ্যই একটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। তবে কাজটি এখনই শুরু করা দরকার। নদী ব্যবস্থাপনা ও নদী খনন মন্ত্রণালয় নামে একটি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এটা সময়ের দাবি। এতে যা খরচ হবে তার তুলনায় আমাদের অর্থনীতি উপকৃত হবে লক্ষ গুণ বেশি। আমি মনে করি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তহবিলের একটা বড় অংশ এখানে খরচ করা উচিত।

এবারে বিমান পরিবহন সম্পার্কে দু’একটি কথা বলতে চাই। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য পরিবহন মাধ্যমের মতো বিমান পরিবহনেরও চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর আছে? নেই! কারণ আমাদের রাষ্ট্রের পরিচালকরা ও নীতিনির্ধারকরা স্বল্প মেয়াদী সমাধানে বিশ্বাসী। কিন্তু আমি মনে করি যে, আমাদের অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদে পরিবহন চাহিদা নিয়ে ভাবতে হবে : ১০০-২০০ বছরে এ চাহিদা কোথায় গিয়ে ঠেকবে বা দাঁড়াবে তা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মতে ঢাকার উপকণ্ঠে অন্তত ২টি (দক্ষিণে ও পশ্চিমে), ৭টি বিভাগীয় শহরের উপকণ্ঠে ৭টি, পর্যটন শহরকেন্দ্রিক আরও কয়েকটি বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, বিমানবন্দরগুলো শহরকেন্দ্র থেকে ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে হওয়া বাঞ্ছনীয়। উৎকৃষ্ট জমি বাঁচানো ও শব্দ দূষণ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার স্বার্থে প্রস্তাবিত বিমানবন্দরগুলো পারতপক্ষে নদীর চরে নির্মাণ করা ঠিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। অবশ্যই এগুলোর সঙ্গে রেল, সড়ক ও নৌপথের সুসমন্বয় থাকতে হবে।

আরেকটি কথা বলা এখানে জরুরী মনে করছি। আর তা হলো এই যে, উপরে বর্ণিত পরিবহন মাধ্যমগুলোর জন্য দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয় বা অনুষদ গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে এগুলোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, মেশিনপত্র ইত্যাদি দেশে উৎপাদনের কথাও আমাদেরকে ভাবতে হবে। সরকারী-বেসরকারী দু’খাতেই এটা হতে পারে। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স সমস্যা সমাধানের জন্যে সম্পূর্ণ পৃথক ও অত্যন্ত শক্তিশালী লাইসেন্সিং অথরিটি গঠন করতে হবে। এতে বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সব জেলাতে এর শাখা থাকবে, তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীতে একাধিক কেন্দ্র থাকতে পারে। আর দুর্ঘটনা রোধে সকল ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় অনবরত ট্রাফিক আইন সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন উদ্ভাবন ও প্রচারণা চালাতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরকার এটা বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে।

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

প্রকাশিত : ১৫ মার্চ ২০১৫

১৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: