মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মার্কিন বলয়ের পাল্টা অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে উঠছে

প্রকাশিত : ১৫ মার্চ ২০১৫
  • চীনের নেতৃত্বে নতুন ব্যাংকে যোগ দিচ্ছে ব্রিটেন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ওবামা প্রশাসনের বিরোধিতা সত্ত্বেও চীনের নেতৃত্বে এশিয়ার নতুন উন্নয়ন ব্যাংকে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটেন, যা অপর মার্কিন সহযোগীদেরও এই নতুন ব্যাংকে যোগদানে উৎসাহিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের নিষেধ সত্ত্বেও ব্রিটেনের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের অপর দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াও আগ্রহী হয়ে উঠেছে চীনের উন্নয়ন ব্যাংকে যোগদানের ব্যাপারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপের আরও অনেক দেশই এখন ব্রিটেনের পথে হাঁটবে। এক্ষেত্রে চীনের উন্নয়ন ব্যাংকের পরবর্তী দুই সদস্য যে লুক্সেমবার্গ ও ফ্রান্স হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। আর যদি তাই হয়, তাহলে বিশ্বে মার্কিন বলয়ের বিপরীতে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রতিপক্ষ গড়ে উঠার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পিছিয়ে পড়া এশিয়ার দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে গঠন করা হচ্ছে চীনের নেতৃত্বে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। চীন শুধু এই ব্যাংকটির উদ্যোক্তাই নয়, ব্যাংকটির বড় মূলধন যোগানদাতাও। এ কারণে ব্যাংকটির ওপর চীনের প্রভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে ওবামা প্রশাসনের উদ্বেগের বিষয় হলো এই ব্যাংকের মাধ্যমে চীন এশিয়ার দেশগুলোর নীতি-নির্ধারণেও প্রভাব বিস্তার করবে।

ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনের শনি ও রবিবারের সংখ্যায় বলা হয়েছে, ব্রিটেন গত বৃহস্পতিবার নতুন এই এশিয়ান অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। আর ব্রিটেনের ওই ঘোষণায় কার্যক্রম শুরুর আগেই এশিয়ার অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকটি পশ্চিমা বিশ্বের আলোচনায় উঠে এসেছে। ওবামা প্রশাসনের ভয় শুধু ব্রিটেনকে নিয়েই নয়, ব্রিটেনের দেখাদেখি যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী অপর দেশগুলো বিশেষ করে কোরিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াও ওই নতুন ব্যাংকে যোগদান করতে পারেÑ এমন শঙ্কাই কাজ করছে।

নতুন এই ব্যাংক ভৌত যোগাযোগ, টেলিযোগাযোগ ও জ্বালানি খাতের প্রকল্পে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থায়ন করবে। ব্রিটেন এই ব্যাংকে যোগদানের সদস্যপদ লাভের চূড়ান্ত চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের আগে নিশ্চিত হতে চায় ব্যাংকটি এসব প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত মান ও অন্যান্য নিরাপত্তা বিষয়ক শর্ত মেনে অর্থায়ন করবে।

তবে যে যাই বলুক, ব্রিটেন এই ব্যাংকে যোগদানকে এশিয়ায় বিনিয়োগ ও একসঙ্গে কাজ করার অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুযোগ হিসেবে দেখছে। আর ব্রিটেনের এ যোগাদনের মধ্য দিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কোন দেশই নয়, জি-৭ অর্থনৈতিক গ্রুপের প্রথম দেশ হিসেবে কোন দেশ এশিয়ান অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই ঘটনাকে চীনের স্বপ্নপূরণের একধাপ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে এই ব্যাংকটির উদ্বোধন করেছেন, যাকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থায়ন সংস্থা বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করা হচ্ছে।

চীনের অর্থ মন্ত্রণালয়ও ব্রিটেনের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলেছে, সবকিছু ঠিকমতো হলে মার্চের শেষ নাগাদ ব্রিটেন হবে এই ব্যাংকের এক ‘সম্ভাবনাময় অর্থায়নকারী সদস্য’।

ওয়াশিংটন নতুন এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে সংরক্ষণমূলক মনোভাব প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, এই প্রতিষ্ঠান থেকে যে সকল প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে সেখানে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের মতো পরিবেশগত মান, ক্রয় নীতিমালা ও অন্যান্য নিরাপত্তামূলক পূর্বশর্ত পরিপালন করা হবে না। তবে প্রকাশ্যে এসব কথা বললেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হুমকি এমন চীনা উদ্যোগে তাদের সহযোগীদের যোগদান না করার ব্যাপারে ওবামা প্রশাসন চাপ সৃষ্টি করছে।

ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল তো সরাসরি ব্রিটেনের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনাই করেছে। কাউন্সিলের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোন প্রকার আলোচনা না করেই সামনের দিকে এগোচ্ছে। তবে এটি যুক্তরাজ্যের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। আমরা শুধু আশা করব, যুক্তরাজ্য ওই ব্যাংকে অর্থায়নের মানের ব্যাপারে সোচ্চার হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া হচ্ছে চীনের বড় বাণিজ্য অংশীদার। এই দুটি দেশও চীনের অবকাঠামো ব্যাংকে যোগদানের ব্যাপারে খুব আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিংটনের সতর্কতার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা এই ব্যাংকে যোগদান না করার ব্যাপারে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার প্রতি আবেদন জানিয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক পিটার ড্রাইসডেল বলেছেন, ‘সম্ভবত অস্ট্রেলিয়া ব্রিটেনের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করতে পারে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’

এর যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া হচ্ছে চীনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য অংশীদার। এ কারণে ব্রিটেন বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর চেয়ে ওই ব্যাংকে যোগদানের ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার অনেক কারণ রয়েছে।

গত বছরের শেষদিকে ওবামা কথা বলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর টনি এ্যাবোটের সঙ্গে। তখন ওবামা এ্যাবোটকে ব্যাংকটিতে যোগদান না করার ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ফলে গত বছরের শেষদিকে চীনের উন্নয়ন ব্যাংকে যোগদান করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান সরকারের এক উর্ধতন সদস্য জানিয়েছেন, সরকার এখন তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছে।

ব্রিটেনের ঘোষণার পর দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। দেশটির বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয় চীনা ব্যাংকের সদস্যপদ গ্রহণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে নেতিবাচক সিগন্যাল দিচ্ছে। তবে চীন দক্ষিণ কোরিয়াকে ব্যাংকটির একটি উদ্যোক্তা সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এ ব্যাপারে দুই রাষ্ট্রপতির মধ্যে কথাও হয়েছে।

তবে ওবামা প্রশাসনের আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ব্রিটেনের ঘোষণার পর এখন অনেক ইউরোপীয় দেশই চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন চীনের প্রধান জর্গ ওয়াট বলেছেন, ‘ব্রিটেন যে পথে হাঁটবে, অন্যরাও তাকে অনুসরণ করবে। আমি নিশ্চিত লুক্সেমবার্গ এবং ফ্রান্সই হবে ইউরোপের পরবর্তী সদস্য দেশ।

প্রকাশিত : ১৫ মার্চ ২০১৫

১৫/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: