কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

লালগোলাপ ও কিছু স্বপ্ন

প্রকাশিত : ১৪ মার্চ ২০১৫
  • মীম নোশিন নাওয়াল খান

গাড়ির জানালা বন্ধ। আজকে ভীষণ গরম, ভ্যাপসা গরম। ড্রাইভার আঙ্কেলকে এসি বাড়িয়ে দিতে বলেছে মৌ। এসি বাড়িয়ে দিয়ে গরমটা গেছে ঠিকই, কিন্তু জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে কড়া রোদ এসে গায়ে লাগছে। জ্যামে বসে রোদে পুড়তে হচ্ছে। অসহ্য ব্যাপার।

মৌ ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে সেটা দিয়ে মুখ আড়াল করল। ড্রাইভার আঙ্কেলকে বলল, ‘এই জ্যাম ছুটতে কতক্ষণ লাগবে?’

আঙ্কেল দাঁত বের করে হেসে বললেন, ‘সেটা কেমনে কই? তবে জ্যাম যা দেখতেছি তাতে আধা ঘণ্টা তো লাগবই।’

মৌ আঁতকে উঠে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘আধা ঘণ্টা! ততক্ষণে তো আমি কাবাব হয়ে যাব!’

ড্রাইভার আঙ্কেল পেছন দিকে ঘুরে বললেন, ‘তুমি মাঝামাঝি আইসে বসো, রোদ কম লাগব। এই জ্যামের ব্যাপারে তো আমাদের অপেক্ষা ছাড়া কিছু করার নাই।’

মৌ আর কোন কথা বলল না। কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বিরক্ত লাগছে। সে মাঝখানে এসে বসল, তাকিয়ে রইল বাইরের দিকে।

ওদের গাড়ির সামনে-পেছনে, দু’পাশেÑ সবদিকেই গাড়ি আর গাড়ি। দেখতে ভাল লাগছে না। মৌ সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে হাতের বইটা খুলে বসল সময় কাটাতে। এরই মধ্যে জানালার কাঁচে টোকা দেয়ার শব্দ হলো। মৌ তাকিয়ে দেখল একটা মেয়ে কয়েকটা লালগোলাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কথা খুব স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। সম্ভবত ফুল কিনতে বলছে। দেখে মনে হলো সে মৌ-এরই বয়সী। তার পরনের জামাটা খুব পুরনো আর নোংরা, কয়েক জায়গায় ছিঁড়েও গেছে। রুক্ষ উস্কোখুস্কো চুল, অযতেœ লালচে হয়ে গেছে। চেহারাটাও খুব মলিন। গরমে দরদর করে ঘামছে সে। কাতরস্বরে মেয়েটা আবার ফুল কেনার অনুরোধ জানালো। মৌ তখন তার কোন কথা শুনতে পাচ্ছে না, সে অবাক হয়ে দেখছে মেয়েটিকে।

খানিকক্ষণ অনুরোধ করে মেয়েটা চলে গেল। মৌ তখনও তার ঘোরটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছে, এসি ছেড়ে গাড়ির ভেতরে বসে আছে, তবুও রোদের তাপে তার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। জানালা খুললেই ভ্যাপসা গরম এসে ঘামিয়ে দিচ্ছে, অস্থির লাগছে। আর তারই বয়সী আরেকটা মেয়ে হাতে কয়েকটা গোলাপ ফুল নিয়ে ছেঁড়া-নোংরা পোশাক পরে এই তীব্র রোদে হেঁটে হেঁটে ফুল বিক্রি করছে! মেয়েটা বোধহয় স্কুলেও যায় না। দেখে মনে হলো ভাল করে খেতেও পায় না।

মেয়েটা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ঘোরটা কাটিয়ে উঠে মৌ এদিক-ওদিক তাকিয়ে ড্রাইভারকে বলল, ‘আঙ্কেল, ওই যে মেয়েটা গোলাপ ফুল নিয়ে এসেছিল, মেয়েটা কোথায় গেল?’

ড্রাইভার বললেন, ‘কে জানে! অন্য কোন গাড়িতে ফুল বিক্রি করতে গেছে! সমস্যা নাই, তুমি ফুল কিনবা? তাইলে আমরা শাহবাগ দিয়ে যাবনে, এরচেয়ে বেশি ভাল ফুল পাওয়া যাবে। দেখেশুনে কিনতে পারবা।’

মৌ কিছু বলল না। দ্রুত গাড়ির দরজা খুলল। সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাপসা গরম এসে পুরো গাড়িটাকেই যেন ভাসিয়ে নিল। মৌ সেটা নিয়ে মাথা ঘামাল না। গাড়ি থেকে নেমে এলো সে। ড্রাইভার চেঁচিয়ে বলল, ‘আরে আরে! কী কর? কই যাও?’

মৌ উত্তর দিল না। জ্যামের কারণে গাড়িগুলো সব থেমে আছে। সে গাড়িগুলোকে পাশ কাটিয়ে দৌড়াতে লাগল। অনেকটা দূরে গিয়ে দেখল ফুলবিক্রেতা মেয়েটা একটা নীল প্রাইভেটকারের জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে আছে, ফুল বিক্রির চেষ্টা করছে। মৌ দৌড়ে ওর কাছে গিয়ে ডেকে বলল, ‘এই! একটু শুনবে?’

মেয়েটা পেছনে তাকিয়ে বলল, ‘নিবেন আপা? কয়টা নিবেন? একটা ফুল দশ ট্যাকা মাত্র। আমার কাছে সাতটা আছে। পঞ্চাশ ট্যাকায় দিয়া দিমু।’

মৌ মেয়েটার দিকে একটু তাকিয়ে রইল। তারপর স্কুল ড্রেসের পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে মেয়েটার হাতে দিয়ে বলল, ‘দাও।’

মেয়েটা খুশিতে হেসে ফেলল। ফুলগুলো মৌ-এর হাতে দিয়ে টাকাটা নিল সে। মৌ জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম কী?’

মেয়েটা বলল, ‘আসমা।’

‘তুমি স্কুলে যাও না?’ আবার জিজ্ঞেস করল মৌ।

আসমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর করুণভাবে শব্দ করে হেসে বলল, ‘আমি ইস্কুলে কেমনে যাব আপা? ইস্কুলে গেলে কি খাওন জুটব?’

মৌ-এর কান্না পেয়ে গেল। কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাসা কোথায়? বাসায় কে আছে?’

আসমা হাত দিয়ে ফুটপাথ দেখিয়ে বলল, ‘আমি ঐখানে থাকি। আমার বাপ-মা আর তিনটা ভাই আছে। বাপে কামলা খাটে, মায়ে আর আমি ফুল বেচি। ভাইগুলান ছোট।’

মৌ তাকিয়ে দেখল, ফুটপাথে মোটা পলিথিনের কতগুলো তাঁবু। সেগুলোর সামনে কিছু মানুষও বসে আছে। বাচ্চারাও আছে। ধুলোবালিমাখা ফুটপাথের ওপরেই বসে খেলছে। একটা দু-তিন বছরের বাচ্চা স্টিলের বাটিতে রাখা মুড়ি খাচ্ছে, সেগুলো ছড়িয়ে ছড়িয়ে ফুটপাথের ওপরে পড়ছে। সে আবার ধুলোবালির মধ্যে থেকে সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে খাচ্ছে। সেই বাচ্চাটাকে দেখিয়ে আসমা বলল, ‘ওইডা আমার সবচেয়ে ছোট ভাই।’

মৌ-এর মন ভীষণ খারাপ হলো। কাঁদতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু সে পারল না। ড্রাইভার আঙ্কেল কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন কে জানে। বললেন, ‘মৌ, জ্যাম ছাইড়া দিতেছে। চল।’মৌ আসমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। এক মাস পরের কথা। মৌ ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে ঘিরে অনেক ছেলেমেয়ে জটলা পাকিয়ে আছে, চেঁচামেচি করছে। মৌ হাত দিয়ে সবাইকে চুপ করতে বলে বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। সবার জন্যই এনেছি তো।’

তারপর সে আম্মু আর আব্বুর কাছ থেকে প্যাকেটগুলো নিয়ে বাচ্চাদের হাতে দিতে শুরু করল। এগুলোর মধ্যে ওই বাচ্চাগুলোর জন্য স্বপ্ন আছে, অনেক অনেক স্বপ্ন। সবার আগে আসমা তার প্যাকেটটা খুলল। ভেতরে আছে কিছু খাবার, বইখাতা, কলম-পেন্সিল। মৌ আসমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কালকে থেকে এখানকার প্রত্যেকটা বাচ্চা স্কুলে যাবে।’

পেছন থেকে তার আব্বু এসে পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমাদের বাবা-মায়েদের সঙ্গে আমি গত সপ্তাহে কথা বলে গেছি। তাদের রাজি করিয়েছি। এখানে একটা স্কুল হবে, শুধু তোমাদের জন্য। ভাইয়া আর আপুরা তোমাদের পড়াবে।’

মৌ-এর বড় বোন টুসি বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা এখানে, এই খোলা আকাশের নিচেই স্কুল করব। তোমরা পড়বে, তোমরা স্বপ্ন দেখতে শিখবে, তারপর একসময় মৌ-এর মতো স্বপ্ন দেখাতে শিখবে।’

ফুটপাথের সেই বাচ্চাগুলো আর এখন কেউ ময়লা জামা পরে থাকে না। তাদের মৌ নতুন জামা দিয়েছে। তারা এখন সবাই নিজেদের নাম লিখতে পারে, কেউ কেউ দু’চারটে ইংরেজীও বলতে পারে। প্রতিদিন তারা অপেক্ষায় থাকে বিকেলের সময়টার, যখন টুসি, মৌ আর অন্য ভাইয়া-আপুরা এসে হোয়াইট বোর্ডটা কাঠের স্ট্যান্ডের উপরে লাগায়, কালো মার্কার দিয়ে সেই বোর্ডে লেখে অ-আ-ক-খ, লেখে অনেক অনেক স্বপ্ন।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজ, ৯ম শ্রেণী

অলঙ্করণ: নাসিফ আহমেদ

প্রকাশিত : ১৪ মার্চ ২০১৫

১৪/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: