আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এই সময়ের প্রার্থনা

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • নাসরীন নঈম

দুঃসহ বেদনার মতো সময় কাটছে। সৃজন বেদন কিছুই হচ্ছে না। অথচ অখণ্ড অবসর। ৩৫ বছর পর নিরবচ্ছিন্ন অবকাশ। এ রকম অবসরের জন্য অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন। মানুষ অবসর শব্দটি নিয়ে চিন্তিত হয়। আতঙ্কিত হয়- আর আমি মনে করতাম ‘অবসর’ মানুষের জন্য কাক্সিক্ষত। মানুষের জীবনে ঘর যেমন দরকার তেমনি দরকার একটি বারান্দারও। টানা লম্বা বারান্দা। অবসর হচ্ছে আমার কাছে তেমনি একটি বারান্দা। সে বারান্দায় সকালের সূর্যের আলোটি বিড়ালের নরম লেজের মতো এসে পড়বে। আমি মোড়া পেতে বসে শিউলিঝরা সকাল দেখব। গাছের ডালে ডালে পাখির কলতান শুনব। কেউ একজন আমার হাতে গরম চায়ের মগটা দিয়ে যাবে। আমি চায়ের মগে চুমুক দেব আয়েশ করে। মুগ্ধতার অনুভবে শরীর মন ভরে উঠবে। ধীরে ধীরে বেলা বাড়বে। রাস্তায় হরতাল স্রোত নামবে। পেশাজীবী মানুষগুলো দ্রুতলয়ে ছুটবে। ওদের ওই ছুটন্ত দৃশ্য দেখে মনে মনে হাসব- যাও। যাও। অফিস আদালত স্কুল-কলেজে যার যেখানে কর্মক্ষেত্র সেখানে যাও। ছুটতে থাক। আমি আছি আরামে। বহু ছুটেছি। কতদিন না খেয়ে সময়কে ধরতে ছুটেছি। এবার আমার ছুটি হয়েছে না ছোটার। এখন আমি সময়কে লেজ ধরে টেবিলে বসাব। লিখব। অনেক লিখব। এতদিন লিখতে পারিনি শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনের অজুহাতে। আমি রাত জাগতে পারি না- তাই লেখা হয় না। এখন তো আর রাত জাগতে হবে না। দিনেই প্রচুর অবসর। ছেলেরা অফিসে। নাতিরা স্কুলে দুটো পর্যন্ত। অতএব সকাল ৮টা থেকে শুরু করলেও তো টানা পাঁচ ছ’ ঘণ্টা সময় হাতে। কমপক্ষে দশপাতা লেখা হবেই। মাসে একটি উপন্যাস তো দাঁড় করানোই যায়।

পুরুষ লেখকরা তো সে রকমই করেন। দরজা বন্ধ করে শুরু করে দেন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভেতর থেকে প্রেরণাদায়িনী কেউ চা-কফি, শরবত, ডাবের জল, কেক বিস্কুট রেখে যান ছায়ার মতো নিঃশব্দে। সৃষ্টি হয় মহৎ কাব্যকথা। যা হোক। হোকগে যা। আমার ওসব কিছু লাগবে না। গলা শুকালে বোতলে পানি থাকে- পান করে নেব।

তবু কিছু লেখা হোক অন্তত। কিন্তু হচ্ছে না। আজ ছ’মাস অবসরে আছি। শরীর মন শুকনো ডাল পালার মতো বেঁকে যাচ্ছে। অবসন্ন আলস্যে মনজুড়ে হতাশা। ডিপে মাছ নেই। মুরগি নেই। আলু-পেঁয়াজ কাঁচামরিচ ধনেপাতা কিছুই নেই। রাঁধুনি মেয়েটার লাল মোরগের মতো কটকটানি শুনে বিরক্ত হয়ে শান্তিনগর বাজারে গিয়ে দাঁড়াই। কোন মাছেই তো হাত দেয়া যায় না। কী গরম। একদিন পাঙ্গাশ ছিল সবচেয়ে সস্তা মাছ। আশি থেকে এক শ’ টাকা কেজি। সেই পাঙ্গাশ এখন তিন শ’ টাকা কেজি। ইলিশ জোড়া বারো শ’। দুই কেজি রুই মাছ পাঁচ শ’ টাকা। গুঁড়ামাছ সব চার শ’ টাকা কেজি। তিন শ’ টাকায় এক কেজি কই কিনে দু’বেলা চালানো যায় বটে ১০ জনের সংসারে। কিন্তু সেখানে বিধি নিষেধের ধাক্কা আছে কড়া। চাষের মাছ খাই না। কর্তাব্যক্তির আস্ফালন। যাব কোথায়। সবই তো চাষের মাছ। পনের শ’ টাকায় ৮টা মুরগি কিনি ফেরিওয়ালার কাছ থেকে। কিন্তু বিড়ম্বনা রয়েছে সেখানেও দেশী মুরগি ছাড়া খাব না। এগুলো কক। অর্থাৎ কিনা পাকিস্তানী আর বাংলাদেশী মেশানো। খাবার বেলায় কক খাব না। বেশ ভাল কথা। কিন্তু ফ্যাশনের বেলায় দেখছি তোমার মেয়েরা আজ পাকিস্তানী থ্রি-পিস ছাড়া চলতে পারে না। একটা ড্রেসের জন্য ছ’ সাতটা টুকরা জোড়া দিয়ে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আলখাল্লা বানায় সানা-সাফিনা আর ফানা-ফাসিনা মার্কা পাকিস্তানী ড্রেস কেনে দশ থেকে বারো হাজার টাকায়। সেটা গায়ে লাগে না। কেবল খাওযার বেলায় খক্ খক্...। অবসর নিয়ে তো ভালই মরেছি। তিন বেলার মেন্যু বানাতে বানাতে জীবন ওষ্ঠাগত। শিশুদের জন্য প্রোটিন সংযুক্ত খাবার চাই। বড়দের জন্য এক রকম। সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক হচ্ছে বুড়োদের জন্য। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এ মজানা, ও মজানা। রান্না টেস্ট হয় না। শাক খাই না। করল্লা খাও। ওটাও খাওয়া যাবে না। সবজি দু’চোখের বিষ। তা খাবেটা কী? আমার কলজে চিবাতে পারলে খুশি হয়। এই রকম প্রতিদিন খাওয়া নিয়ে হুজ্জতি কত সহ্য করা যায়। তারপর লেখার টেবিলে মন বসবে কার? সে মন এক সময় তৈরি হচ্ছিল একটু অবসরের জন্য এখন তো দেখছি অবসর টুকু গজবের টুকরা হয়ে বুকের ওপর বসে আছে। সেই কবে ‘মৈত্রেয় জাত’ পড়ব বলে যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা রঞ্জুন বন্দোপাধ্যায়ের সবক’টি বই কিনেছি অবসরে মন দিয়ে পড়ব- ওমা! ওসব ক্লাসিক বিষয়গুলো পড়বার মন তো আর তৈরি করতে পারছি না। সারারাত ঘুম আসে না। ‘তারা মিউজিকে’ গান শুনে মন ভাল করতে চেষ্টা করি। শরীর শুধু নেতিয়ে যায়। কে যেন অলক্ষে সিঁথির চুলগুলো গুছি ধরে তুলে নিচ্ছে। চোখের দু’পাশে কাকের পায়ের ছাপ। শরীরে চিনিরোগ বেড়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। আগে রমনা পার্কে হাঁটতে যেতাম। অবসরের পর আর তেমন যাই না। যেতে ইচ্ছে করে না। সারারাত নির্ঘুম থেকে সকালে বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে হয় না। বিকেলে পথে গাড়ি-ঘোড়ার যন্ত্রণায় হাঁটতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু হাঁটতে হবে। না হাঁটলে সুস্থ থাকা যাবে না- বেশ বুঝতে পারছি। কত আর ওষুধের ওপর থাকা যায়। বয়সকে আমি অস্বীকার করি না। বয়সী দহন যেটুকু হবার হোক না। আমার মতো বয়সী লোক তো পৃথিবীতে রয়েছে- তাদের কি এত যন্ত্রণা হয়? বুঝি না আমার কেন এত দুঃসময় মনে হয় সব সময়। কেমন যেন চারদিকে একটি বৈরী পরিবেশ। সেই একাত্তরের বন্দী দিন বন্দী রাতের মতো। কিন্তু এখন তো একটি আশা ছিল- মাত্র ন’মাস রুদ্ধশ্বাসে সহ্য করেছি। কিন্তু এখন এই স্বাধীন বাংলায় মুক্ত পরিবেশে কেন মনে হচ্ছে আমি নিষ্ফলা মাঠের কৃষক- কেন মনে হচ্ছে এভাবে বাঁচা যায় না। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় ভীষণ। আমি কি শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমার কি আর উত্তরণ হবে না? কোথায় যাব? হাওয়া বদলে? গেছিলাম তো কলকাতার পথে পথে হেঁটে এসেছি। নিউমার্কেটের কাছে দাঁড়িয়ে পানি, পুরি, দাহি বড়া আর মুমু খেয়েছি। দক্ষিণাপনে একদিন সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছি- দু’হাত ভরে কেনাকাটা করেছি। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাঠে চুপচাপ বসে থেকেছি- ইতিহাসকে স্মরণে এনেছি। বিদ্যাসাগর ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আনমনা হয়েছি। লেখার উপাত্ত সংগ্রহের জন্য গরের মাঠে বসে থেকেছি। সাত দিন পর আবার ফিরে আসতে হয়েছে আপন আলয়ে। কিন্তু কই মন তো ঠিক হচ্ছে না- কেন? শুধুমাত্র একটি কষ্ট আমাকে পীড়া দেয়। এ সংসারে আমাকে কেউ বুঝল না। আর আমি ৩৫ বছর ধরে যে কাজটি করার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম সেটুকু হচ্ছে না- এই না হওয়ার কারণ পরিবার, সমাজ, পারিপার্শ্বিকতাই কি দায়ী? যদি না হয় ইচ্ছে পূরণ তা হলে কেন এমন বেঁচে থাকা? অন্ধকারে ডুব সাঁতার দিতে দিতে আমি কোথায় গিয়ে থামব। তাহলে কি আমার এখন বৃদ্ধাবাসে চলে যাওয়া উচিত? কিন্তু ওখানে কি। আমি যা চাই তা পারব? নাকি শুধুই করুণা! আসলে আমি চাই যতদিন বাঁচি- সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়েই বাঁচি। বিছানায় পড়ে থেকে নয়। এক একবার মনে হয় কেন এত কষ্ট পাচ্ছি। কেন কিছু না লেখার জন্য শরীর মনে যন্ত্রণা হচ্ছে লিখে কি হবে।

১৭টা বই তো রয়েছেই। আর কত! এবার একটু আনন্দে জৌলুসে জীবন কাটাই। মন সায় দেয় না। ওগুলো কিছুই হয়নি। আবার খুব কাছের বন্ধু আবিদ আজাদের মতো কবিকে আজ কে-ই বা মনে রেখেছে। ভাইসাব কবি সামসুল ইসলামকে নিয়ে কোন আলোচনাই হচ্ছে না। শামসুর রাহমানকেও একদিন যদি সবাই ভুলে যায়! উফ্ আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। আমি কিভাবে আনন্দে থাকব? আমি তো ব্যক্তিসত্তাকে অবমাননা করতে পারি না- এটাই আমার কষ্টের একটি কারণ। সে আমাকে সম্মান শ্রদ্ধা আর যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করবে না- তার কাছে আমি মাথা নত করতে পারি না। আমার ঘাড়টা বড় শক্ত। যেখানে সেখানে যখন তখন নত হয় না। তাই আমার কষ্টও বেশি। কারণ আমি নিজেকে একজন সৃষ্টিশীল, মায়াবী এবং প্রতিবাদী মানুষ মনে করি। অভিজিতের মতো ছেলের নৃশংস মৃত্যু সহ্য করা যায় না। থতমতো জীবন থেকে এই ভঙ্গুর সময়গুলোকে জোড়া লাগিয়ে দাও প্রভু। আমার সব দুঃসময়কে সুসময় করে দাও প্রভু। আমাকে ভাল লাগার দোলায় দুলতে দাও প্রভু। আমার চোখের ওপর থেকে কালো কালো পর্দাগুলো সরিয়ে দাও প্রভু। আমি আলোকিত হয়ে বাঁচতে চাই।

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: