কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ওয়ান উইশ

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • এ সপ্তাহের সেরা বই

সখী, ভালবাসা কারে কয়? সেকি কেবলই যাতনাময়? না, তা কেবলই যাতনাময় হতে পারে না। এতে যাতনা থাকতে পারে, বিষাদ থাকতে পারে, তবে আনন্দই এর মূল সুর। বন্ধনই এর মূল গান। সে সুর, সে গান বন্ধুত্বের বন্ধন থেকে উৎসারিত হলে তা জিইয়োয় যুগ থেকে যুগান্তরে, লোক থেকে লোকান্তরে। বন্ধুত্ব আর ভালবাসা তাই একই সুতোয় গাঁথা। এ দুটোকে ঘিরেই মানুষ তৈরি করে আনন্দ-বেদনার কাব্য। সেই কাব্যে বন্ধু কিংবা ভালবাসার মানুষই হয় একমাত্র নির্ভার আশ্রয়। জীবনের এই পরম সত্য রুবিন কার তুলে ধরেছেন থান্ডার পয়েন্ট সিরিজের সপ্তম বই ‘ওয়ান উইশ’ বইটিতে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এ সপ্তাহের বেস্ট সেলার তালিকার শীর্ষে অবস্থানকারী এই বইটিতে নির্লোভ-নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের সঙ্গে পরমাত্মীয়ের স্বার্থপরতার এক বস্তুনিষ্ঠ সমীকরণ দেখিয়েছেন রুবিন। গ্রেস ডিলনের মধ্য দিয়ে রুবিন শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন। দেখিয়েছেন মোহ আর খ্যাতির চূড়ায় আরোহণই মানুষের একমাত্র লক্ষ্য নয়। মানুষ শান্তি চায়। আর সেই চাওয়া পূরণে অনেক সময় পালিয়ে বেড়ায় খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে। গ্রেস ডিলন চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক শান্তিকামী মানুষের সেই চিরন্তন আকাক্সক্ষাকে তুলে ধরেছেন। কাহিনীর সারমর্ম আলোচনা করলেই পাঠকের কাছে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে।

গ্রেস ডিলন সাতাশ বছর বয়সী সুন্দরী নারী। সে জীবনের যান্ত্রিকতাকে এড়িয়ে চলতে চায়। তাই তো অলিম্পিক গেমসে শ্রেষ্ঠ স্কেটার হিসেবে গোল্ড মেডেল অর্জন করেও সে শান্তি খুঁজে পায়নি, যে শান্তি সে থান্ডার পয়েন্টের ছোট্ট শহরটিতে পেয়েছে। খ্যাতির বিড়ম্বনা ডিলনের জীবনকে যারপরনাস্তি করে দিয়েছিল। যে নির্জনতাকে ভালবাসে তারপক্ষে খ্যাতির ঝঞ্ঝা সহ্য করা কঠিনই বৈকি। ডিলনও সহ্য করতে পারেনি। তবে তার জীবনে সে সময়ে সবচেয়ে বড় অসহনীয় ব্যাপারটি ছিল তার মায়ের মাত্রাতিরিক্ত লোভ, স্বার্থ। মায়ের কাছে মেয়ের চেয়েও মেয়ের খ্যাতি, ঐশ্বর্যই বড় হয়ে ধরা দিয়েছিল। মায়ের লোভী চরিত্র ডিলনকে মর্মে মর্মে পীড়া দিয়েছিল। খ্যাতির বিড়ম্বনা আর মায়ের লোভের শিকল থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিল ডিলন। আর তাই সবকিছু ছেড়েছুড়ে আশ্রয় নিয়েছিল সে থান্ডার পয়েন্টে। ডিলনের বয়স যখন মাত্র চার বছর তখনই তার বাবা-মা তাকে স্কেটিংয়ে অনুপ্রাণিত করে। ডিলনেরও বেশ আসক্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল বরফের ওপর স্কেটিং করায়। তার স্কেটিংয়ের প্রতি প্যাশন দেখে বাবা-মা চেয়েছিল এতে খ্যাতিমান হয়ে উঠুক তাদের মেয়ে। এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে তারা মেয়েকে পাঠায়। আর সে টাকা জোগাড় করতে তাদেরকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল। মেয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে বেশ দক্ষ স্কেটার হয়ে ওঠে। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর মা ডিলানকে সব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ আর জয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। অলিম্পিকে সোনা জিতলেও মায়ের অব্যাহত চাপে নাভিশ্বাস উঠে যায় ডিলনের। এ কারণেই একটু শান্তির খোঁজে ছুটে গিয়েছিল থান্ডার পয়েন্টে।

এখানের মানুষজন তেমন টিভিতে অলিম্পিক খেলা দেখে না, এমনকি পত্রিকার এসব খবরও পড়ে না। ফলে ডিলন অতি সহজেই নিজের পরিচয় গোপন করতে পেরেছিল। মিশে গিয়েছিল সাধারণ এক মানুষ হিসেবে। অলিম্পিক মেডেল জয়ী স্কেটার থান্ডার পয়েন্টে খুলে বসে ফুলের দোকান। যে কিনা চাইলেই অনেক টাকার মালিক হতে পারত, সে কিনা শহরটির ফুলের দোকানদার। এতেই শান্তি খুঁজে পায় ডিলান। খ্যাতির বিড়ম্বনা নেই, মায়ের লোভ নেই। আছে কয়েকজন নির্লোভ বন্ধু। এ কারণেই শান্তি খুঁজে পেয়েছে ডিলন। এখানে ডিলনেরই কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছিল আইরিশ। আইরিশ সেখানকার হাইস্কুলের শিক্ষক ছিল। আর তার দীর্ঘদিনের প্রেম চলেছিল সেই স্কুলেরই আরেক শিক্ষক ট্রয় হেডলের সঙ্গে। কিন্তু ভালবাসা যে অনেক সময়ই হয়ে ওঠে যাতনাময়, তা আইরিশ-হেডলের প্রেমের করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইরিশ হেডলের পরিবর্তে স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিল শহরের ডেপুটিকে। এতে হেডলের কাছে জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। সে সময়টাতে আইরিশের বন্ধু ডিলনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তার। এই বন্ধুত্ব তাদের দু’জনের জীবনকেই রংধনুর মতো রাঙিয়ে তুলেছিল। ফুল বিক্রেতা হিসেবে ডিলনের জীবনে শান্তি ছিল, তবে মজা ছিল না। বৈচিত্র্য ছিল না। সেই মজার দায়িত্ব নিয়েছিল হেডলে। মজাই তাদের বন্ধুত্বকে প্রগাঢ় করে তুলেছিল।

নির্লোভ বন্ধুত্ব থেকে দু’জনের মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল পারস্পরিক নির্ভরতার জায়গা। ডিলনের জীবনকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে তুলেছিল যেন হেডলের বন্ধুত্ব। আর হেডল ভুলে গিয়েছিল আইরিশের ভালবাসা হারানোর যাতনা। ডিলনকে হেডল বিশ্বাস করেছিল পরিপূর্ণভাবে। বন্ধুত্ব-বিশ্বাস থেকেই একটা সময় তাদের সম্পর্ক হয়ে ওঠে প্রেমিক-প্রেমিকার। মনের সঙ্গে শরীর মিশে হয়ে যায় একাকার। তাদের দু’জনের কাছে জীবনের মধুময় রূপটি প্রস্ফুটিত হয়। যৌবনের সুখ তাদের বন্ধনকে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করে তোলে। প্রেম দুর্বার। প্রেম উচ্ছল। ডিলন হেডলের সেই দুর্বার উচ্ছল সময়টার বর্ণনা তুলে ধরে রুবেন প্রেমের মাহাত্ম্যই গেয়েছেন বইটিতে। হেডল ডিলনের জীবনকে তৃপ্ত করতে চায়। ডিলনের ইচ্ছাকে পূরণ করতে চায়। কিন্তু হেডল জানে না ডিলনের অতীত। ডিলনের অতীত কী হেডলের সঙ্গে তার সম্পর্কের পরিণতিতে কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে? এই প্রশ্নের উত্তর বইটিতে রুবেন দেননি। থান্ডার পয়েন্টের অন্য বইতে হয়ত আমরা এই রোমান্টিক জুটির পরিণতি জানতে পারব।

বইটিকে আদ্যোপান্ত রোমান্টিক বই বলা যায়। এতে ডিলন হেডলের প্রেমের রসায়ন ছাড়াও গিনজারের প্রেমের কাহিনীও তুলে ধরা হয়েছে। রুবেন কার তাঁর এই বইটিতে ভালবাসার যাতনা আর আনন্দময়তায় অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। প্রেমের আত্মিক আর শারীরিক দিক তুলে ধরে গেয়েছেন প্রেমের জয়গান। প্রেমের সে জয়গানই পাঠকের হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। এ কারণেই বইটি নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলারের শীর্ষে।

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: