আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

লোকহিতৈষী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • রাজশেখর বসু

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রকে আপনারা যত জানতেন, অন্য অল্প লোকেই তাঁকে ততটা জানত, এজন্য তাঁর সম্বন্ধে নতুন বেশি কিছু বলার নেই। কোন লোক যখন নানা কারণে বিখ্যাত হন তখন অনেক ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে বড় গুণটি অন্যান্য গুণের আড়ালে পড়ে যায়। আমার মনে হয়, প্রফুল্ল চন্দ্রের বেলায় তাই হয়েছে। তিনি বিখ্যাত বিজ্ঞানী, বিখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠাতা- এই কথাই লোকে বেশি বলে। এ দেশে অনেক বড় বড় বিজ্ঞানী আর শিল্পকর্তা আছেন, সুতরাং এই দুই দলে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রকে ফেললে তাঁর গৌরব বাড়ে না। তাঁর মহত্ত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয়- তিনি নিঃস্বার্থ লোকহিতৈষী। এই গুণে তিনি অদ্বিতীয়। তাঁর বৈজ্ঞানিক আর সাহিত্যিক বিদ্যা, শিল্পপ্রসারের জন্য তাঁর আগ্রহ- এসব তিনি শিক্ষা বা চর্চার দ্বারা পেয়েছিলেন। কিন্তু লোকহিতের প্রবৃত্তি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ছিল। তিনি বেশি রোজগার করেননি, সেজন্য তাঁর দানের পরিমাণ ধনকুবেরদের তুল্য নয়। তথাপি তিনি দাতাদের অগ্রগণ্য, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মহাশয় তাঁকে দধীচির সঙ্গে সার্থক তুলনা করেছেন। সংসার চিন্তা এবং সবরকম বিলাসিতা ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজের সমস্ত ক্ষমতা ভাবনা আর অর্থ জনহিতে লাগিয়েছিলেন। দেশে দুর্ভিক্ষ বা বন্যা হয়েছে, আচার্য তৎক্ষণাৎ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। কোন হাসপাতাল বা অনাথ আশ্রম বা স্কুল বা কলেজে টাকার অভাব, আচার্য তাঁর নিজের পুঁজি নিঃশেষ করে দান করলেন। কোন ছোকরা এসে বললে, আমার মাথায় একটা ভাল মতলব এসেছে, ময়রার দোকান খুলব কিংবা ট্যানারি করব কিংবা কাপড়ের ব্যবসা করব, কিন্তু হাতে টাকা নেই। আচার্য তখনই মুক্তহস্ত হলেন। নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য তিনি অনেক লিমিটেড কোম্পানিতে টাকা দিয়েছিলেন, ডিরেক্টরও হয়েছিলেন। অনেক কোম্পানি ফেল হওয়ায় বিস্তর টাকা খুইয়েছেন, সময়ে সময়ে বদনামও পেয়েছেন, কিন্তু ভ্রুক্ষেপ করেননি। কোন কোম্পানি টাকা ধার করবে, উনি অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে জামিন হয়ে দাঁড়ালেন।

তারপর কোম্পানি ফেল হলে অম্লানবদনে দ- দিলেন। অনেক ক্ষেত্রে আইন অনুসারে তিনি টাকা দিতে বাধ্য ছিলেন না, তাঁর হিতার্থীরাও তাঁকে বারণ করেছিলেন, তবু তিনি টাকা দিয়েছিলেনÑ পাছে তাঁর সাধুতায় কলঙ্ক হয়। মহাভারতে আছেÑ সকল শৌচের মধ্যে অর্থশৌচ শ্রেষ্ঠ। এ কথা তাঁর চেয়ে কেউ বেশি বুঝত না, টাকাকড়ির দায়িত্ব সম্বন্ধে তিনি শুচিবায়ুগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে টাকা ধার নিয়ে পাপ করার লোকের অভাব হয়নি।

বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাংক ফেল হওয়ায় আমাদের কোম্পানির অনেক টাকা মারা যায়। শেয়ারহোল্ডার মিটিংয়ে একজন বলেছিলেনÑ দেশি ব্যাংকে বিশ্বাস নেই, সেখানে আর যেন টাকা না রাখা হয়। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র উত্তর দিলেনÑ অবশ্যই রাখা হবে, দশবার টাকা মারা গেলেও রাখা হবে; আমাদের এই দেশি কারবারকে লোকে বিশ্বাস করে, আমাদেরও অন্য দেশি কারবারকে বার বার বিশ্বাস করতে হবে।

তাঁর স্মৃতিরক্ষা বা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আমরা কী করতে পারি? এই কারখানায় তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠা বা চিতাভস্ম রক্ষার জন্য চৈত্য স্থাপন বেশি কিছু নয়। কিন্তু মৃত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় তাঁর প্রিয় কার্যসাধন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের অনেক ইচ্ছার মধ্যে একটি ছিলÑ এই কোম্পানি বড় থেকে আরও বড় হবে, এতে নানা রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি হবে, এতে বহু লোক শিক্ষিত উৎসাহিত পুরস্কৃত প্রতিপালিত হবে। এই ইচ্ছার পূরণ কেবল ডিরেক্টরদের চেষ্টায় হবে না, শেয়ারহোল্ডাররা লাখ লাখ টাকা মঞ্জুর করলেও হবে না, আপনাদের সকলের সমবেত চেষ্টাতেই তা হতে পারবে।

[আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মৃত্যুর (১৬.০৬.১৯৪৪) পর বেঙ্গল কেমিক্যালে শোকসভায় পঠিত।]

সূত্র : রাজ শেখর বসু রচনাবলি

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: