কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুক্তিযুদ্ধে নারীর আত্মদান

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • হাবিবুর রহমান মোহাম্মদী

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালীরা ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালিয়ে নিধন শুরু করে। দীর্ঘ নয় মাস তারা বাঙালীদের সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধে হত্যা করে ত্রিশ লাখ বাঙালীকে। এ সশস্ত্র যুদ্ধে তারা বাঙালী পুরুষদের সঙ্গে থরথুরে বুড়ো নারীদেরও নির্বিচারে হত্যা করে। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা কোন যুবতী মেয়েকে সহজে হত্যা করেনি। তারা বাঙালী যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে তাদের ক্যা¤েপ অনবরত ধর্ষণ করেছে। এর কারণ, তারা ধারণা করেছিল যে, তারা যুদ্ধে বাঙালী পুরুষদের শেষ করে দেবে। আর যে সব নারী বেঁচে থাকবে, তাঁদের গর্ভে জন্ম লাভ করা সন্তানরা উর্দুভাষী হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে বিনা বাধায় উর্দু ভাষা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রচলন ঘটানো যাবে।

তারা বেশিরভাগ হিন্দু পুরুষদের হত্যা করত, আর হিন্দু মেয়েদের ধরে নিয়ে যেত এবং ক্যা¤েপ রেখে ধর্ষণ করত। এর মূল কারণ ছিল, হিন্দুদের মুসলমান বানানো। অর্থাৎ ধর্ষিত হিন্দু মেয়েদের গর্ভে যে সব সন্তান জন্ম নেবে, তারা হবে মুসলমান। যাতে পূর্ব পাকিস্তান তথা পাকিস্তানে কোন হিন্দু না থাকে। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান তথা পুরো পাকিস্তানকে একটি মুসলিম রাষ্ট্র বানিয়ে সেখানে উর্দু ভাষীদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি চালু করে পূর্ব পাকিস্তানে তাদের একচেটিয়া শাসন ও শোষণ কায়েম করা।

আর সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানকে একটি একক মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে সেখানে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে চালু করা এবং পাকিস্তানের ভাবধারা অর্থাৎ তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে চালু করার লক্ষ্যেই মুক্তিযুদ্ধে তারা বাংলার অগণিত নারী ধর্ষণ করেছে। যে সব মেয়েকে তারা কোন অবস্থায়ই ধর্ষণ করতে পারেনি, তাদের এমন পৈশাচিকভাবে হত্যা করেছে, যা ভাষায় বর্ণনা করা দুরূহ। তারা অধিকাংশ মেয়ের স্তন কেটে বেয়নেটের মাথায় ঢুকিয়ে উর্ধে তুলে ধরে উন্মাতাল নৃত্য করেছে। অনেককে হত্যা করে পা বেঁধে গাছের সঙ্গে, এমন কি বড় বড় রাস্তার সংযোগ স্থলে উঁচু বাঁশ গেঁড়ে আড় বানিয়ে তার সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছে। এমনকি অনেককে জীবন্ত অবস্থায় তাদের গোপনাঙ্গে জলন্ত লোহার রড বা শিক ঢুকিয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে যার কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই ছিল একটা মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর (তারাও কিন্তু রক্ত মাংসের মানুষ ছিল) সরকারের প্রতি আনুগত্যের ঘৃণিত নজির।

পাকিস্তানীরা যে শুধু বাঙালী পুরুষদেরই বেশি হত্যা করত, তার দু’টি দৃষ্টান্ত পাঠকের তথা নতুন প্রজন্মের অবগতির জন্য তুলে ধরছি। বর্তমান শরীয়তপুর জেলার সদর উপজেলার মনোহরবাজার সংলগ্ন মধ্যপাড়া গ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় একদিন বিকেলে পাক হানাদাররা মধ্যপাড়া গ্রামের তিন/চারশ’ নারী-পুরুষ ধরে নিয়ে যায় মাদারীপুর শহরে, তাদের নির্যাতন ক্যাম্প এ. আর. হাওলাদার জুটমিলে। চার/পাঁচ দিন পর দেখা গেল যে, মাত্র পঞ্চাশ/ষাট জন থুত্থুরে বুড়ো মহিলা ফিরে এসেছে। পরে জানা গেছে যে, সকল পুরুষকে জুটমিলের জেটিতে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। যুদ্ধ শেষে ঐ নির্যাতন ক্যাম্পে বহু নারীর মৃতদেহ এবং কঙ্কাল পাওয়া গেছে।

আরও একটি লোমহর্ষক উদাহরণ এখানে উল্লেখ করছি। বর্তমান শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলায় একটি গ্রাম সোহাগপুর, যার বর্তমান নাম ‘বিধবাপল্লী’ - যে গ্রামে কোন পুরুষ মানুষ নেই, আছে শুধু বিধবা নারীরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঐ গ্রামকে ঘেরাও করে সমস্ত পুরুষকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। ওই বিধবা নারীরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পুরুষ হত্যার সাক্ষী হয়ে আজও বেঁচে আছেন। স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পরও তাঁরা স্বামীহারা অসহ’ায় জীবন-যাপন করছেন। স্বামীর প্রতি অকুণ্ঠ ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় শহীদদের গর্বিত স্ত্রী হিসেবে বৈধব্য জীবন-যাপন করছেন। উল্লেখ্য, এই হত্যাযজ্ঞে এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী চক্র ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ বাহিনী সক্রিয় ও ব্যাপক সহযোগিতা করেছে।

স্বাধীনতার জন্য আমাদের যে কত মূল্য দিতে হয়েছে, তা পাকিস্তানী হায়েনাদের নারী নির্যাতনের ধরন না জানলে হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না। তাই এর উল্লেখ একান্ত অপরিহার্য। এখানে আমি দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের লেখা একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ উল্লেখ করছি (২৯ মার্চ, ২০১৪, পৃ: ৭)।

‘রাবেয়া খাতুন নামে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এক সুইপার এ রকম একটি বিবরণ দিয়েছেন। তাঁকে ২৬ মার্চই হানাদার সেনারা খুঁজে পায় এবং ধর্ষণ শুরু করে। পুলিশ লাইনের ময়লা পরিষ্কার না হতে পারে বিধায় তাকে আর প্রাণে মারা হয়নি। তিনি বলেছেন, এর পর শহরে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কিশোরী, তরুণী, মহিলাদের দলে দলে ধরে আনা হতে লাগল পুলিশ লাইনে এবং এর পরই আরম্ভ হয়ে গেল সেই বাঙালী নারীদের ওপর বীভৎস ধর্ষণ। লাইন থেকে পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মতো জিভ চাটতে চাটতে ব্যারাকে প্রবেশ করে প্রতিটি যুবতী, মহিলা ও বালিকার পরনের কাপড় খুলে একবারে উলঙ্গ করে মাটিতে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বীভৎস ধর্ষণে লেগে গেল।...উন্মত্ত পাঞ্জাবী সেনারা এই নিরীহ বাঙালী মেয়েদের শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয়নি, আমি দেখলাম পাকসেনারা সেই মেয়েদের ওপর পাগলের মতো উঠে ধর্ষণ করছে আর ধারালো দাঁত বের করে বক্ষের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে, ওদের উদ্যত ও উন্মত্ত কামড়ে অনেক কচি মেয়ের স্তনসহ বক্ষের মাংস উঠে আসছিল, মেয়েদের গাল, পেট, ঘাড়, বক্ষ, পিঠের ও কোমরের অংশ ওদের অবিরাম দংশনে রক্তাক্ত হয়ে গেল।’... এরপর রয়েছে আরও পাশবিক ও বীভৎস বর্ণনা।

এমনকি যে সব মেয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য, ওদের অতৃপ্ত যৌনক্ষুধা চরিতার্থ করার জন্য সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে তাদের পিছনে ঘুরে বেড়িয়েছে, হাসি-তামাশায় দেহ দান করেছে, তাদেরও ছাড়া হয় নাই। পদস্থ সামরিক অফিসাররা সেই সকল মেয়ের ওপর সম্মিলিতভাবে ধর্ষণ করত।...

এরপর উলঙ্গ মেয়েদের গরুর মতো লাথি মারতে মারতে, পশুর মতো পেটাতে পেটাতে উপরে হেডকোয়ার্টার, দোতলা, তৃতীয় ও চারতলায় উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পাঞ্জাবী সেনারা চলে যাওয়ার সময় মেয়েদের লাথি মেরে আবার কামরার ভেতর ঢুকিয়ে তালা বন্ধ করে চলে যেত। এরপর বহু যুবতী মেয়েকে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় বারান্দায় মোটা লোহার তারের ওপর চুলের সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়।‘ কিন্তু না, তা সত্ত্বেও পাকিস্তানীরা বাংলার শাসন ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে পারেনি। বাংলার মানুষ দেশপ্রেমিক। দেশের প্রতি তাঁদের ভালবাসা ছিল অত্যন্ত প্রগাঢ়। তাই এত অত্যাচার-নির্যাতনের মুখেও তাঁরা কোন প্রকার নমনীয়তা প্রদর্শন বা মাথা নত করেনি। বরং তাঁরা ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে কিশোর, যুবক-যুবতী, আবাল-বৃদ্ধবনিতা সকলে সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র যুদ্ধ করে বাংলার শাসন ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়াসহ বাংলা ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি পাকিস্তানীদের আগ্রাসনকে রুখে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের বাংলার কাদা-মাটি-জলে নাকানি চুবানি খাইয়ে ইতিহাসখ্যাত শিক্ষা দিয়েছে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সৈন্যকে সামরিক ও গেরিলা কায়দায় এমন কি হাতাহাতি যুদ্ধে হত্যা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ সৈন্যকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে। অন্যায়ভাবে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চাওয়ার কি পরিণতি, তা পাকিস্তানীদের তথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলার মানুষ তথা বাঙালীরা প্রমাণ করে দেখিয়েছে -‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত’।

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: