কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্বাধীনতাযুদ্ধে নারী

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • রুখসানা কাজল

আমি দূরবীনের চোখে তাকিয়েছিলাম। যদি একবার মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী প্রীতিলতার বোন, কল্পনা দত্তের সাথী, মাতঙ্গনী হাজরার মানসকন্যা, বেগম রোকেয়ার ভগিনী বাংলা মায়ের মুক্তিযোদ্ধা আর জাতির পিতার দোয়েলকন্যাদের দেখতে পাই কোথাও। আমি কখনও বীরপ্রতীক তারামন বিবিকে দেখিনি। দেখিনি বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন (অব) সেতারা বাগমকে। কত শত মুক্তিযোদ্ধা আসে। কত শত অনুষ্ঠানে তারা তাদের যুদ্ধের কথা, কষ্টের কথা, বেদনার কথা বলে। আমরা শুনি। গর্ব হয়। আমাদের অভাব আছে, দারিদ্র্য আছে, না পাওয়া আর আশা ভঙ্গের খ- খণ্ড স্বপ্ন আছে। দুর্নীতি, দুঃশাসন, কুশাসন আছে। আমরা চোর আছি, বাটপাড় তারও বেশি। বিদেশী সাহায্য খেয়ে ফেলি, জনগণের ভাত মারি। উন্নয়নের কাঁথায় আগুন জ্বালি। আমাদের কিছুই নেই, যা পরিপূর্ণ একজন নাগরিক রাষ্ট্র থেকে আশা করতে পারে। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আছে, ইতিহাস আছে, লাল-সবুজ পতাকা আছে। আছে সেই সব বীর মা জননীরা, যারা আমাদের জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিল। সম্ভ্রম দিয়েছিল। দিয়েছিল নারীর পরম ধন ইজ্জত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাংলা মায়ের সন্তান হিসেবে নারীদের অংশগ্রহন ছিল রাজনৈতিক সচেতনতার বহির্প্রকাশ। এই সচেতনতার বীজ নিহিত ছিল বহুকাল আগে থেকেই। মার্চ ৭, ১৯৭১। রেসকোর্স ময়দান। বিশাল জনসভা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই জনসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালীর প্রাণের কথার প্রতিধ্বনি তুলে ধরেন। ফুটছে বাংলার নারী-পুরুষ, ছাত্র-জনতা। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা। বাংলা মায়ের পাশে তাঁর অতন্দ্র সন্তানেরা। চেতনায় জাগরুক। ছেলেদের পাশে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে চলেছে বাংলার নারীরা। প্রগতির পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে, অন্যায়ের বিপক্ষে এই নারীরা জোরালো থেকেছে সব সময়ে। লৌহমানব আইয়ুব খানের রক্ত চোখকে উড়িয়ে দিয়ে মিছিলে নেমেছে এই মেয়েরা। সুতরাং যদি যুদ্ধ আসে, ভয় নেই। বাংলা মাকে রক্ষা করতে বাংলার ছেলেসন্তানদের পাশে তার মেয়েসন্তানরাও একেকজন অগ্রগামী সৈনিক। তারা তো প্রীতিলতার বোন, কল্পনা দত্তের সাথী, মাতঙ্গিনী হাজরার স্বপ্নকন্যা, বেগম রোকেয়ার ভগিনী। মাতৃঋণ শোধের এই মাহেন্দ্রক্ষণ তারা কি হারায়! তাই জননী জন্মভূমিকে স্বাধীন করতে সবকিছু পণ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই মুক্তিপাগল মেয়েরা।

মুজিব-ভুট্টো আলোচনা চলছে। অন্যদিকে সামান্য উস্কানিতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তরে, ঢাকার বাইরে পাক সেনাদের সঙ্গে বাঙালীদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের খবর আসছিল। হালকা-পাতলা কারণে পাকিস্তানী আর্মিরা মেরে ফেলছে সাধারণ বাঙালীদের। ক্ষমতা ছাড়ার কোন সুলক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়াম মাঠে ছাত্রীরা একজন রেঞ্জারের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করছে। ঢাকার বাইরে চিটাগাং, বরিশাল, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেয়েরা অস্ত্রশিক্ষা নিচ্ছে। মুজিব-ভুট্টোর আলোচনায় কোন সুফল দেখা যাচ্ছিল না তখনও। মার্চের প্রথম সপ্তাহে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশ। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে সুস্পষ্ট ছিল স্বাধীনতার ঘোষণার। বাঙালী প্রস্তত। রাজনৈতিক উপাদানের সব চেয়ে বড় উপাদান সাহস। যার যা আছে তাই নিয়েই লড়াইয়ের মোকাবেলায় একাট্টা হয়ে ওঠে পুরুষের পাশাপাশি বাঙালী নারী। ২৫ মার্চ, ১৯৭১। অবশেষে যুদ্ধ এলো। কাপুরুষের মতো। রাতের অন্ধকারে। অপারেশন সার্চলাইট। যুদ্ধের দুটি লক্ষ্য উল্লেখযোগ্য। এ কারণেই ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ স্থপতি, বাঙালী কসাই নামে পরিচিত টিক্কা খান পাকিস্তানী আর্মি, রাজাকার, আলশামস, আলবদর এবং বিহারীদের প্রথম নির্দেশ দিয়েছিল বাঙালীর ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসাকেন্দ্র লুটতরাজ, আগুনে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে তামা তামা অর্থাৎ মাটিতে মিশিয়ে দিতে। টিক্কা খানের দ্বিতীয় নির্দেশটি ছিল বাঙালী নারীকে ধর্ষণ, হত্যাসহ নানারকম শারীরিক নির্যাতন ও অত্যাচার করে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভূলুণ্ঠন করা। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, পাকিস্তানী আর্মিদের সঙ্গে এ দেশীয় পাকিস্তানী দোসররা শহর, নগর, গ্রাম-গ্রামান্তরে নারকীয় গণহত্যার পাশাপাশি টিক্কা খানের এই নির্দেশ পালনে তৎপর হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অনেক নারী সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। আবার অনেকেই অবরুদ্ধ বাংলাদেশে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। অনেক সাধারণ নারী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে রাজাকারের দৃষ্টিশূল হয়েছে। কেউ কেউ লালসার শিকার হয়ে সম্মান, সম্ভ্রম হারিয়েছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু যাদের মা বলেছিলেন সেই বীরাঙ্গনারাও মুক্তিযোদ্ধা। এই স্বাধীন বাংলাদেশ এবং প্রতিটি বাঙালী সেই সব হারানো মায়েদের কাছে চিরঋণী। সুখের বিষয়, অনেক দেরিতে হলেও স্বাধীনতাযুদ্ধে বাঙালী নারীদের ভূমিকা এবং অবদান সম্পর্কে তত্ত্ব তালাস, তথ্যউপাত্ত সংগ্রহের জন্য এপ্রিল, ২০১০ সালে এই প্রথম কমিটি কাজ শুরু করে দিয়েছে এবং স্মৃতির আড়াল ভেঙ্গে নিরুদ্দেশ থেকে খুঁজে খুঁজে বের করে আনছে এই মুক্তিযোদ্ধাদের। যে কোন যুদ্ধে নারীকে লড়তে হয় দুটি অস্ত্র দিয়ে। এক. সত্যিকারের অস্ত্র, বন্দুক, রাইফেল, গ্রেনেড, মেশিনগান ইত্যাদি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে তার শরীর। যুদ্ধে সর্বদা শিশু এবং নারীদের ওপর অত্যাচার করা হয়। বাংলাদেশের নারীরাও এভাবেই লড়াই করেছে। যে হাত দোলনায় দোল দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে সন্তানকে, সেই হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে মা মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে। পাবনার শিরীন বানু, আলমতাজ বেগম ছবি, ফারকুন বেগম, গীতা কর, আসিয়া, আশালতা বৈদ্য, রাবেয়া, মৌফুল, বাঘারপাড়ার ফাতেমা খাতুন, রোকেয়া খাতুন, সাতক্ষীরার জুলেখা খাতুন, শেরপুরের আমিরজান, শহরজান বেওয়া, মাজলিবালা, সুখুরি, কনক বণিক নামের এই মুক্তিযোদ্ধাদের কি আমরা চিনি? জানি? কেমন আছে বাংলা মায়ের এই সাহসী সন্তানরা? স্বাধীন বাংলার সুফলের সামান্য অর্ঘ্য কি আমরা কখনও এই নারীদের পায়ে অঞ্জলি দিয়েছি? বঙ্গবন্ধু যে নারীদের পিতৃত্ব দিয়েছিলেন, কেমন আছে সেই দোয়েলরা? রাবেয়া খাতুন, সুইপার, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ঢাকা ২৫ মার্চের রাতে ব্যারাকেই ছিল। কামান, গোলা, লাইটবোমা আর ট্যাঙ্কের আক্রমণকে বীরের মতো প্রতিহত করে অনেকেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে, অনেকে পালিয়ে যায় আবার ধরা পড়ে অনেকেই নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়। রাবেয়া খাতুন নিজেও ধর্ষিত হয়। সুইপার বলে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখা হয় তাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র, অষ্টম খ-ে রাবেয়া খাতুন বর্ণনা করেছে, ‘পাঞ্জাবি সেনারা রাজাকার ও দালালদের সাহায্যে রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এবং অভিজাত জনপদ থেকে বহু বাঙালী যুবতী মেয়ে, রূপসী মহিলা এবং বালিকাদের জিপে, মিলিটারি ট্রাকে করে পুলিশ লাইনসের বিভিন্ন ব্যারাকে জমায়েত করতে থাকে। বহু মেয়েকে হেডকোয়ার্টারের উপরতলার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো আর অবশিষ্ট মেয়েদের জায়গার অভাবে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। এরপরই আরম্ভ হয়ে গেল বাঙালী নারীর ওপর সেই বীভৎস ধর্ষণ।’ পাকিস্তান আর্মিদের ক্যান্টনমেন্টগুলোতে যেসব বাঙালী নারীকে ধরে আনা হতো তাদের হাত বেঁধে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে রাখা হতো। পাকিস্তানী নরপশুরা কেবল ধর্ষণেই ক্ষান্ত ছিল না। তাদের পাশবিকতার কোন সীমা ছিল না। তারা এসব নারীকে চাবুক মারত, কামড়ে অথবা ছুরি দিয়ে কখনও স্তন তুলে নিত বা নিতম্বের মাংস কেটে নিত, কখনওবা নারীর যৌনাঙ্গে বেয়োনেট ঢুকিয়ে মেরে ফেলত। মুক্তিযুদ্ধের মাসগুলোতে এরকম বহু নারীর লাশ বাংলার খালে, বিলে, নদীতে ভেসে যেতে দেখা গেছে। হাত বাঁধা মৃত একজন ধর্ষিতা মেয়ের ছবি পুরো বিশ্বটাকে কাঁদিয়ে দিয়েছিল সেই সময়ে। ‘ধর্ষণ’ যুদ্ধক্ষেত্রে একটি বহুল ব্যবহৃত অস্ত্র। আদিম যুগেও বিজয়ী দল পরাজিতের ধন-সম্পদ, ক্ষেতের ফসল জবরদখলের সঙ্গে সঙ্গে নারীদেরও দখল করে নিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও ‘ধর্ষণ’ অস্ত্র ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ধর্ষণের একই পুনরাবৃত্তি ঘটে। চীনের নানজিং প্রদেশের ধর্ষণের সত্য কাহিনী যুদ্ধকালীন অন্ধকার সময়ে নারীদের ওপর সংঘটিত অত্যাচার নির্যাতনের এক মাইলফলক হয়ে আছে বিশ্ব ইতিহাসে। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর যখন পাকিস্তানের এ দেশীয় দোসরদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হচ্ছে এবং তারা তাদের প্রাপ্য শাস্তি পাচ্ছে, সমূহ অপরাধের ন্যায্যতা অনুসারে তখন আমাদেরও কিছু দায়িত্ব থেকে যায় এসব বীরাঙ্গনা নারীদের সঙ্গে সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা নারীদের ওপর। যাদের আমরা নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত মানচিত্রে একঘরে করে রেখেছি। মুক্তিযোদ্ধায়ের কি কোন পুরুষ/নারী ভেদে বিভক্ত করা উচিত? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মুক্তিযোদ্ধাদের কোন জেন্ডারে ব্র্যাকেটবন্দী করা উচিত নয়। আর তাই আমি জোর দাবি জানাচ্ছি উচ্চ মাধ্যমিকের ‘পৌরনীতি এবং সুশাসন’ বিষয়ের দ্বিতীয় পত্রে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বীরপ্রতীক তারামন বিবি এবং বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন (অব) সেতারা বেগমের জীবনী ও কর্ম পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা হোক। আমাদের ছেলেমেয়েরা জানুক আমাদের মায়েরা দোলনা দুলিয়ে যেমন সন্তানকে অমীয় সুধা পান করাতে পারে, তেমনি অস্ত্র হাতে মা মাতৃভূমিকে রক্ষাও করতে জানে। সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে উদ্দীপক তৈরি হোক শিরিন বানু, আলমতাজ বেগম, ফারকুন বেগম, আসিয়া, স্মৃতিকনা, গীতা কর, আলেয়া, রমা মাসিদের নিয়ে। প্রত্যেক বিষয়ের ৪০ নম্বরের বহুনির্বাচনী প্রশ্নে জ্বল জ্বল করে জ্বলুক একটি প্রশ্নÑ বাংলাদেশের কোন জেলার কোন গ্রামকে ‘বিধবাদের গ্রাম’ বলা হয়? বঙ্গবন্ধু যে নারীদের সম্মান দিয়েছিলেন, বীরাঙ্গনা বলে আমরা কতটুকু মনে রেখেছি স্বাধীনতার আহত রক্তাক্ত দোয়েলদের? বাংলাদেশের ইতিহাসে আবছা হয়ে মুছে যাচ্ছে বীরাঙ্গনারা। স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গিত এই বীরাঙ্গনাদের কথা পাঠ্যপুস্তকে লিপিবদ্ধ থাকা একান্ত জরুরী। শ্রদ্ধায় ভালবাসায় নত হতে না শিখলে কী করে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একটি উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তুলবে এই প্রজন্মের সন্তানেরা? কী করে নিজেরা হয়ে উঠবে একটি উন্নত নৈতিক শক্তিসম্পন্ন সুনাগরিক?

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: