মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

দুই বাংলার নাট্যমেলায় রক্তকরবী

প্রকাশিত : ১২ মার্চ ২০১৫
  • অপূর্ব কুমার কুন্ডু

আগুনের তাপের উষ্ণতা পেয়ে শীতার্ত মানুষের কাছে আগুন যেভাবে ফাগুন হয়ে ধরা দেয়, ঠিক তেমনিভাবে আগুনে দ্বগ্ধ হওয়া নিরীহ মানুষের কাছে আগুন মৃত্যুর বিভীষিকা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। অনেকটা তেমনিভাবে রঞ্জনের ভালবাসাকে অর্থপূর্ণতা দিতে নন্দিনী যেমন রক্তকরবী সাজে সজ্জিত হয়ে বিবাগী হয়, ঠিক তেমনি নিষ্পেষণের প্রতীকী রাজাকে অবমুক্ত করে রক্তপিপাসুদের সঙ্গে শেষ বোঝাপড়া করে নন্দিনীর রক্তস্নাত রক্তকরবী হয়ে প্রতিবাদে প্রতিরোধে মানবমুক্তির পথ দেখায়। মানব সৃষ্ট দুর্যোগের এই দাবানলে নাট্যদল প্রাঙ্গণে মোর গত ৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু করেছে দুই বাংলার নাট্যমেলায় রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য। প্রথম দিনে জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয় নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত, গৌতম হালদার (চলচ্চিত্রকার, অবশ্যই মেঘনাদবধখ্যাত অভিনেতা গৌতম হালদার নয়) নির্দেশিত, পূর্ব পশ্চিম প্রযোজিত নাটক রক্তকরবী।

রক্তকরবী নাটকের কাহিনী কমবেশি সকলের জানা। একদল খোদক মাটির তলের খনি থেকে মাটি খুঁড়ে সোনার চাঙ্গ তোলায় ব্যস্ত। নিরাপত্তার অভাব, মজুরি বেষম্য, ক্ষুধা অনাহার প্রভৃতির কারণে শ্রমজীবী মানুষ কাজে যোগ দিতে অনীহা দেখালে কিংবা খনি ছেড়ে চলে যেতে চাইলে চাবুকের নির্মম কশাঘাত নিয়ে উপস্থিত সর্দার (সৌমিত্র মিত্র), মোড়ল (দীব্যেন্দু নস্কর) প্রমুখ। দৈহিকভাবে দুর্বল করে ফেলা শ্রমজীবীদের স্নায়বিকভাবে দুর্বল করা তোলার জন্য লোকধর্মের আফিম নিয়ে সর্দারের সহযোগী গোসাই (অরূপ রতন গাঙ্গুলী)। হাজার বছরের আধার ঘরে তবু রতা কেউ না কেউ চায় আলো জ্বালাতে, সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে। তেমনি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে আলোকবর্তিকা নিয়ে উপস্থিত রক্তকরবী ফুলে সজ্জিত নন্দিনী (চৈতী ঘোষাল), নন্দিনীর সহযাত্রী বিশু (শুভ্রজিৎ দত্ত), কিশোর (ত্রিগুনা মান্না) কিন্তু সহযোদ্ধা প্রণোচ্ছলে ভরপুর, সময়কে বদলে দেয়া রঞ্জন (তরুণ মাজি)। প্রতিপক্ষ পাওয়ার প্লে বা শক্তির খেলার কেন্দ্রীয় কিন্তু অদৃশ্য চরিত্র রাজা (মলয় সাহা)। খোদকদের পক্ষ নিয়ে রাজার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়ে অদৃশ্য দেওয়াল ভেদ করে জীবন বাজি রেখে নন্দিনীর ত্রগিয়ে চলার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ইঙ্গিতপূর্ণ কিন্তু অমীমাংসিত সমাধানের নাটক রক্তকরবী।

সমাধানের প্রশ্নে কি এ বাংলা কি ওপার বাংলা কিংবা বিদেশ অথবা মহাদেশ, কথাটা হলো মুচিকে যে মানুষটা লাথি মারে সেই মানুষটাই অফিসে যেয়ে বসের পা জড়িয়ে ধরে। ছোটর সামনে বড় সাজা আর বড়র সামনে ছোট সাজা বেশির ভাগ মানুষের কমন বৈশিষ্ট্য। নির্দেশক আর বাদ যাবে কেন। নবীন নাট্যকারের লেখা নাটক, নাট্যকারকে দিয়ে শত সহস্রবার কাটাছেঁড়া করাবেন আর প্রতিষ্ঠিত নাট্যকারের নাটক নির্দেশনা দিতে পেরে নির্দেশক হিসেবে নিজেকে এলিট বানাবেন। তথাপি এ নাটকে নির্দেশক গৌতম হালদার সীমিত সম্পাদনার মধ্যে দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। সমসময়কে মেলাতে গিয়ে খুব বেশি এক্সপেরিমেন্ট (প্রসঙ্গ : পেন্টাগনের অবয়র, যুদ্ধবাজ মানসিকতা) তিনি করলেন না বলে ধন্যবাদ। সঞ্চায়ন ঘোষকে দিয়ে নির্মিত সেটে সমতল, পাতাল এবং উপরিতলের ইঙ্গিতে পূর্ণ ইলিউশান সীমিত উপকরণে তুলে ধরতে পারা নান্দনিক। খান পরিবারের আবহে বদ্ধ দরজা খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়া শুনতে ভাল লাগে। আলোর স্বল্পতায় চোখে চাপ পড়ে দৃশ্যকে ঠিকভাবে দেখতে। মালবিকা মিত্রর পোশাক পরিকল্পনায় সৌন্দর্য আছে যেমন তেমনি বিধাতৃ দেব সরকারের রূপসজ্জায় পলিস ভাবটা প্রাসঙ্গিকে। নির্দেশক গৌতম হালদারের বড় সফলতা তিনি রবীন্দ্রনাথকে বুঝেছেন এবং ভেতর বাহির ও মূর্ত-বিমূর্ততার মাঝ থেকে ভালবাসার মর্মবানীকে যে ফুটিয়ে তুলেছেন সে জন্যে। নির্দেশক শম্ভু মিত্রের ইমেজ গৌতম হালদারের জন্যে যতটা প্রেরণার ঠিক ততটাই গৌতম হালদারের ইমেজ নন্দিনী চরিত্রাভিনেত্রী চৈতী ঘোষাল ও রাজা চরিত্রাভিনেতা মলয় সাহার জন্য প্রেরণার। প্রেরণাকে গ্রহণ ঠিকমতো না করতে পারলে বিশু চরিত্র হয়ে যায় আবেগীর বিপরীতে সচেতন, অধ্যপক কঠিন্যের বিপরীতে সরস ( অভিনেতা দক্ষতা মেনে নিয়েই), ফাগুলাল আদিবাসীর বিপরীতে বিশ্ববাসী, সর্দার নিষ্ঠুরতার বিপরীতে কাঠিন্য ভঙ্গুর, কোরাস হয়ে যায় উপস্থিত থেকেও মাইনাস। মাইনাস প্লাসের টানাপড়নের ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় ধরে মঞ্চস্থ রক্তকরবী নাটকে নন্দিনী এবং রাজা এমন কিছু দৃশ্যের অবতারণ করেছে যা দেখে নিমগ্ন দর্শক সীমিত সময়ের জন্যে ভুলেই গেছে মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ তখনও আড়ালে আবডালে বিরাজমান। ভয়ের কারণ যিনি তিনিই যে এতটা অসহায় এবং অনুতপ্ত তা দেখালো যে রক্তকরবী উপরন্তু ভীতি-ঘৃণার আগুনে শান্তির বারতা ছিটাতে পারে যে ভালবাসা রূপী শান্তির জল সেখানেই দুই বাংলার নাট্যমেলায় রবীন্দ্রনাথের জয়। আর আজ সন্ধ্যায় নাট্যমেলায় অন্যান্য পর্বে দর্শক দেখবে মেঘনাদ বধ এবং বড়দাখ্যাত গৌতম হালদারের নয়নাভিরাম অভিনয় যা দেখতেই হয় নইলে পিছিয়ে পরতে হয়।

প্রকাশিত : ১২ মার্চ ২০১৫

১২/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: