মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

৯০ কর্মসূচী আসছে একই ছাতার নিচে

প্রকাশিত : ১২ মার্চ ২০১৫
  • বদলে যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী
  • নতুন কৌশলপত্রে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি
  • দ্রুতই মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
  • ২২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৬ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ বদলে যাচ্ছে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী। সেই সঙ্গে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকে উৎপাদনমুখী করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে বর্তমানে চলমান প্রায় ৯০ কর্মসূচীকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা হবে। তাছাড়া আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি চূড়ান্ত করতে সম্মতি দিয়েছেন। অবিলম্বে এ কৌশলপত্রটি মন্ত্রিপরিষদের সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে কৌশলপত্র তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সিনিয়র সদস্য ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে জানান, দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ কৌশলপত্রটির খসড়া চূড়ান্ত করা হলো। নতুন কৌশলপত্র অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী উৎপাদনমুখী হবে। প্রধানমন্ত্রী এটির বেশ প্রশংসা করেছেন। এখন যতদ্রুত সম্ভব মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদনের পরই এটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন পর্যায়ে যাবে। তিনি জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে বন্যা, ঝড় হলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্যশস্যভিত্তিক কর্মসূচীর ব্যবস্থা থাকবে। আর বাকি সব কমর্সূচী হবে নগদ টাকা ভিত্তিক। এ ছাড়া সত্যিকারের দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাতে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় কর্মসূচীর সুবিধা ভোগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে সারাদেশে হতদরিদ্রদের একটি স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

জিইডি সূত্র জানায়, নতুন কৌশলপত্রে যেসব বিষয় যুক্ত হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে, অতিদরিদ্রদের জন্য ভিজিএফ, টিআর, কাবিখা ও বয়স্ক ভাতাসহ যেসব কর্মসূচী রয়েছে, সেগুলোর ধরন ও কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে। কৌশলপত্রে যে বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে, তা হলো ‘লাইফ সাইকেল বা জীবনচক্র’। জিইডি খসড়া কৌশলপত্র বলছে, ২০২১ সালে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে ‘লাইফ সাইকেল’ পদক্ষেপ ছাড়া কোন বিকল্প নেই। এ জন্য জন্ম থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোট পাঁচ লাইফ সাইকেল চালু করতে হবে। অতিদরিদ্র, ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিবন্ধী সবাইকে এই লাইফ সাইকেলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রথমত, সারাদেশে শূন্য থেকে চার বছর বয়সী পর্যন্ত যেসব অতিদরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও ক্ষতিগ্রস্ত শিশু এবং পরিবার রয়েছে, তাদের প্রতি পরিবারকে মাসে ৮শ’ টাকা হারে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাঁচ থেকে ১৮ বছর বয়সী যারা রয়েছে, তাদের মাসিক ২৪০ টাকা করে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও তারা এখন ১২০ টাকা করে পাচ্ছে। তৃতীয়ত, ১৯ থেকে ৫৯ বছর বয়সী যারা অতিদরিদ্র, ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিবন্ধী তাদের ৮শ’ টাকা হারে দেয়া যেতে পারে। চতুর্থত, যাদের বয়স ৬০ থেকে ৮৯ তাদেরও ৮শ’ টাকা করে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, যাদের বয়স ৯০-এর ওপরে তাদের মাসে তিন হাজার টাকা হারে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে কৌশলপত্রে। আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকার যা নির্ধারণ করে দেবে তাই প্রযোজ্য হবে। সরকার এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতিমাসে পাচ হাজার টাকা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পাঁচ লাইফ সাইকেল একসঙ্গে বাস্তবায়িত হবে না। পাঁচ বছরে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এ কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক অর্জন রয়েছে। এই অর্জনের ওপর দাঁড়িয়েই সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শহরায়নের বিষয়ে কৌশলপত্রে নানা উদ্যোগের কথা রয়েছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রে চূড়ান্ত খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীতে বরাদ্দ ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নতুন নীতিমালার আওতায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দ ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়াবে ৬৬ হাজার ২০০ কোটি টাকায়। প্রস্তাবিত এ বরাদ্দের মধ্যে বিভিন্ন পেনশন, ভাতা ও বৃত্তিমূলক কর্মসূচীতে ২১ হাজার ২০০ কোটি টাকা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে আগামী অর্থবছরে, যা ২০২১-২২ তে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। জীবনচক্র পদ্ধতিতে তিন ধরনের কর্মসূচীতে মোট বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১৫ হাজার ৩শ’ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ অর্থ বছরে গিয়ে দাঁড়াবে ২১ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা। বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্যে নাগরিক ভাতা হিসেবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তিন হাজার ১০০ কোটি দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে হবে নয় হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে সরকারী চাকরিজীবীদের ভাতা খাতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে সাত হাজার ৬০০ কোটি টাকা হবে, যা ২০২১-২২ অর্থ বছরে গিয়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। প্রতিবন্ধী ভাতা আগামী অর্থবছরে থাকবে ৬০০ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ সালে গিয়ে দাঁড়াবে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে শিশুদের ভাতা চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২১-২২ সালে গিয়ে দাঁড়াবে নয় হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে স্কুলের শিশুদের বৃত্তি দেয়া হবে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ সালে গিয়ে দাঁড়াবে আট হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অসহায় মহিলাদের জন্য আগামী অর্থবছরে প্রস্তাব করা হয়েছে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ সালে গিয়ে তা দাঁড়াবে চার হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিভিন্ন বিশেষ কর্মসূচীতে থাকবে এক হাজার ৪০০ কোটি, যা ২০২১-২২ সালে বেড়ে দাঁড়াবে দুই হাজার কোটি টাকা। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রস্তাব করা হয়েছে নয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে গিয়ে যা দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকায়। ছোট ছোট কর্মসূচীর জন্য আগামী অর্থবছরে চার হাজার ২০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২১-২২ সালে বেড়ে দাঁড়াবে পাঁচ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র থেকে সুফল পেতে হলে প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ চলমান যেসব কর্মসূচীতে খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে, তাতে অনেক অপচয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে। ২০ কেজির পরিবর্তে ১২ কেজি চাল দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে খাদ্যের পরিবর্তে টাকা হস্তান্তর করা যেতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ও নগদ অর্থের বিষয়ে একমত। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তা বিতরণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকাশিত : ১২ মার্চ ২০১৫

১২/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: