কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ইইউ’র নেতৃত্বে জার্মানি

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫
  • শাকিল আহমেদ

বছরখানেক আগে একদল অভিজাত জার্মান নিজ দেশের আন্তর্জাতিক পলিসি নিয়ে বিশাল বিতর্কের আয়োজন করে। যেখানে জার্মান প্রেসিডেন্ট গভীর অনুশোচনা করে বলেন, আন্তর্জাতিক পরিম-লে জার্মানিকে কর্তব্যবিমুখ ভাবা হয়। অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতিতে জার্মানির যে দায়িত্ব, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হতেই এড়িয়ে চলছে। নাজি বাহিনীর কর্মকাণ্ড জার্মান ভাবমূর্তিকে যতটুকু বিনষ্ট করেছে, তার ছায়া থেকে জার্মানি এখনও বেরিয়ে আসতে পারছে না। এই বিবৃতির কিছুদিন পর জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার গেল বছরে নিজ দেশের ভূমিকা পর্যালোচনা করতে জনগণের মাঝে আলোচনার ব্যবস্থা করেন।

জার্মানির ছোটবড় ৬০টি শহরে এমন বিতর্ক আয়োজনের পাশাপাশি অনলাইনে বিশেজ্ঞদের মতামত জানতে চাওয়া হয়। প্রত্যককেই জিজ্ঞাসা করা হয়Ñ ‘জার্মান পররাষ্ট্র নীতির সমস্যা ও করণীয়’। এমন প্রশ্নের অসংখ্য উত্তর এখন জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেস্কে রক্ষিত। জার্মানির অবশ্যই আন্তঃসংস্কৃতির মধ্যস্থতাকারী হওয়া উচিত, এমন একটি চিন্তা বিতর্ক থেকে উঠে আসে। অনেকেই আবার রাশিয়া কিংবা আমেরিকার মতো বিশ্ব নেতৃত্বকারী রাষ্ট্র হওয়ার দিকে জোর দিয়েছে। এ ধরনের আলোচনা কিংবা বিতর্কের মূল উদ্দেশ্য বাইরের রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা ও অভ্যন্তরীণ ধারণা সম্পর্কে জানা। ‘করবার ফাউন্ডেশন’ একটি জরিপে জানতে পারে, জার্মানির আন্তর্জাতিক পরিম-লে নেতৃত্বের পক্ষে ৩৭ শতাংশ ও বিপক্ষে ৬০ শতাংশ জনগণ। যদিও উর্ধতন কর্মকতারা মনে করেন, সাধারণ জনগণ খুব অল্পসময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিম-লে জার্মানির সুসংহত অবস্থানের দিকে মতামত দেবেন।

কিন্তু পৃথিবী জার্মান জনগণের মতামতের জন্য অপেক্ষা করবে না। নিজ গতিতেই চলবে পথচলা। রাশিয়া যেমন ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ইউরোপ জুড়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে, তেমনি গ্রীসের ভোটাররা কৃচ্ছ্রতার বিপক্ষে রায় দিয়ে এখন নিজেদের পরিস্থিতির জন্য জার্মান চ্যান্সেলরকে দোষারোপ করছে। ইউরোপের জটিল দুই পরিস্থিতি জার্মানিকে যেখানে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেছে, সেখানে অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি অনুপস্থিত, কিংবা দুর্বল। যুক্তরাজ্য বহুদিন থেকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে নিষ্ক্রিয়। ফ্রান্স ব্যস্ত আফ্রিকায়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বিদ্যমান সমস্যায় জর্জরিত। আমেরিকা মনে করে, ইউরোপ নিজেই নিজের সমস্যা সমাধান করতে পারে। তাই ইউরোপের নেতৃত্বের প্রশ্নে এখন জার্মানির ভূমিকা দেখতে চায় দেশটি। সম্প্রতি কূটনীতিকরা লক্ষ্য করেছেন আন্তর্জাতিক পরিম-লে জার্মানির গুরুত্ব বেড়েই চলেছে। জার্মানি বর্তমানে ক্ষমতার মধ্যমণিতে, যা সম্প্রতি চোখে পড়ে মার্কেলের কূটনীতিতে। কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কেলের শার্টল ডিপলোমেসি তার প্রমাণ। মাত্র অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানেই জার্মান চ্যান্সেলর কিয়েভ, মিউনিক, ওয়াশিংটন, অটোয়া, মিনস্ক এবং ব্রাসেলস সফর করেছিলেন। মিনস্কে মার্কেল টানা ১৭ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় দু’পক্ষকে একটা সমঝোতায় আনতে সমর্থ হয়। এমন ম্যারাথন কূটনীতির ফলেই ইউক্রেনে একটি যুদ্ধবিরোধী চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হয়েছে। যদিও এই চুক্তির বাস্তবায়নে মার্কেল আদৌ আত্মবিশ্বাসী নয়। মার্কেল বিশ্বাস করেন, সংলাপ সংঘাত থেকে উত্তম। তার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে এমন শিক্ষা দেয়। চ্যান্সেলর এ্যাঞ্জেলা মার্কেলের স্মৃতিতে বার্লিন দেয়ালের ঘটনা কখনও ভুলবার নয়। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে মার্কেল সেই প্রাচীর দেখে আসছিলেন। ইউরোপের এমন বিভেদ তিনি আর চান না। বরং আলোচনা করেই সব সমস্যার সমাধানে আগ্রহী। এ কারণে ন্যাটো যখন আফগানিস্তান ও কসোভোর সংঘাতে জড়ায়, তখন জার্মানি কিছুটা ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করে। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য প্রেরণ করলেও তা উভয় রণাঙ্গনেই নিষ্ক্রিয় থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে জার্মান শান্তিকামী যে ভাবমূর্তি, তা তিনি টিকিয়ে রাখতে চান। মার্কিন ও ব্রিটিশ আইন প্রণেতারা তাই ইউক্রেনে জার্মান ভূমিকায় কিছুটা বিরক্ত, কারণ উভয় রাষ্ট্র ইউক্রেন সেনাবাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ দিকে আগ্রহী। কিন্তু জার্মানি অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি তেমন একটা আমলে নেয়নি। ইউরোপের অন্যতম দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও ব্রিটিনের তুলনায় জার্মান সামরিক বাজেট অনেকটা সীমিত। জার্মানি সামরিক শক্তিমত্তার দিকে মনোযোগ না দিয়ে বরং মধ্যস্থতাকারী হিসেবেই টিকে থাকতে চায়। এতে করে বিবদমান দু’পক্ষের মাঝেই নিজের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরির দিকেই বেশি মনোযোগ এখন দেশটির। জার্মানি এখন বেশ কিছু লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো একটা অনাকাক্সিক্ষত সংঘাত চায় না। জার্মানি অতীতের শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী। কেবল নেতৃত্ব কিংবা শক্তিমত্তা প্রকাশ করতে গিয়ে নৈতিকতা বিবর্জিত যে কোন পদক্ষেপের বিরোধী রাষ্ট্রটি। এছাড়া আন্তর্জাতিক আইন ও ভ্রাতৃত্বের প্রতিও গুরুত্ব দিতে চায় জার্মান সরকার। যে কোন উপায়ে ইউ, ইউরো ও পশ্চিমাদের বন্ধন টিকিয়ে রাখার পক্ষে দেশটি।

কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্ব রাজনীতির যে পরিস্থিতি তাতে সংঘাত অনিবার্য। এমন পরিস্থিতিতে জার্মানির ভূমিকা কোন্ শিবিরের দিকে ঝুঁকে, তাই দেখার বিষয়।

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫

১১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: