মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলের প্রভাব

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫
  • কামরুল হাসান

ইরানের পরমাণু ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক জটিল আকার ধারণ করেছে। মার্কিন মিত্রদের মধ্যে ইসরাইলই প্রথম যারা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে এখন চ্যালেঞ্জ জানালো, তাও আবার খোদ মার্কিন কংগ্রেসে। পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা একটি দেশ কি করে এমন ঔদ্ধত্য দেখায়, তা এখন প্রশ্ন। তবে ঔদ্ধত্যের পেছনে যতটানা বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাব, তার চেয়ে বেশি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর (বিবি) ইরান প্রসঙ্গে কংগ্রেসে ভাষণ কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকেই ক্ষুব্ধ করেনি বরং ইসরাইল রাষ্ট্রেও এ নিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। তবে বিক্ষোভ কিংবা ক্ষুব্ধ হওয়ার চেয়ে অবাক হওয়ার ঘটনা ঘটে, যখন বিবির যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের পর মুহূর্তে ৪৭ জন রিপাবলিকান সিনেটর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে সিনেটররা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে সতর্ক উচ্চারণ করে বলেন, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যে কোন চুক্তি আগামীতে বাতিল করা হবে। ভবিষ্যত প্রেসিডেন্ট এ চুক্তি বাতিল করবে। এবং কংগ্রেস আগামীতে এ চুক্তির নবায়নযোগ্য বিষয় যে কোন মুহূর্তে পরিবর্তন করবেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের চিঠি আমাদের বন্ধু কিংবা শত্রু দু’পক্ষকেই ভুল সঙ্কেত দেবে। আমাদের প্রেসিডেন্ট নিজ দেশের কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে অক্ষম, এ চিঠি তারই প্রমাণ। এ চিঠি কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামর্থকে চ্যালেঞ্জ করেনি বরং যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণœ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রেসিডেন্টের যে অধিকার, তা নষ্ট করেছে। এ চিঠি যুক্তরাষ্ট্রকে কোনভাবেই নিরাপত্তা ও শক্তিশালী করবে না, বরং চরমভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করবে। মার্কিন কংগ্রেসে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু (বিবি) এ নিয়ে তৃতীয়বার ভাষণ দিলেন। তবে এবারের ভাষণটি ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত। কারণ মার্কিন কংগ্রেসের স্পীকার জন বোয়েনার হোয়াইট হাউসকে না জানিয়েই বিবিকে কংগ্রেসে ভাষণের আমন্ত্রণ জানান।

মার্কিন কংগ্রেসের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডেমোক্র্যাট ৬০ জন সদস্য বিবির ভাষণে অনুপস্থিত ছিলেন। বেনয়ামিন নেতানিয়াহু অবশ্য বেশ ক’বছর ধরেই জাতিসংঘ ও মার্কিন কংগ্রেসে (২০১৩) ইরান ইস্যুতে তাঁর মতামত জানিয়ে আসছিলেন। জাতিসংঘের ভাষণে নেতানিয়াহু ২০১২ সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন- ইরান পরমাণু বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে। ২০১৩ সালে মার্কিন কংগ্রেসেও বিবি একই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়নি।

তবে বিবির এবারের ভাষণের মূলে কেবল ইরান নয়, বরং আগামী ১৭ মার্চ ইসরাইলের নির্বাচন। ইসরাইলী নির্বাচনের কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতকারে অনীহা দেখান।

নেতানিয়াহুর কারণে দুই ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন অত্যন্ত তিক্ত। ইসরাইল সৃষ্টির পর দুই দেশের মধ্যে কখনও এমন দূরত্ব তৈরি হয়নি। তবে মার্কিন কংগ্রেস যে হর্ষধ্বনি ও করতালির মাধ্যমে বিবিকে স্বাগত জানায়, তা সত্যিই বিরল। বাকপটু নেতানিয়াহু শুরুতেই তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে দুই দেশে যে রাজনীতি শুরু হয়েছে, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এরপর মিনিট পাঁচেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্তুতি গান। বিগত সময়ে প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসরাইল রাষ্ট্রকে কী কী উপায়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, তা তুলে ধরেন। ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিক দুই দলকেই সাধুবাদ জানান ইহুদীবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলকে রাজনীতিক ও সামরিক সাহায্য প্রদানের জন্য। এরপর শুরু হয় ইরান বিরোধী বক্তব্য। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব ও পরমাণু ইস্যু নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইরান কেবল ইসরাইলের সমস্যা নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই হুমকি ইরান । তিনি মার্কিন কংগ্রেসকে আহ্বান জানান, ইরানের সঙ্গে কোন চুক্তি সইতে বিরত থাকতে। বিবি সতর্ক উচ্চারণ করে বলেন, ইরান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের চারটি রাজধানী (বাগদাদ, দামেস্ক, বৈরুত ও সানা) নিয়ন্ত্রণ করছে। পরমাণু চুক্তির পর যদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়, তবে ইরানকে কখনই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

তবে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী অতীতেও বিশ্ববাসীকে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়েছিলেন। ইরাকে মার্কিন হামলার আগে নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, সাদ্দাম বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি ও তার কাছে মরণাস্ত্র রয়েছে। ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান ভাষণ নিয়ে খোদ মোসাদ গোয়েন্দা সংস্থাই সন্দিহান। এ ছাড়া পরমাণু চুক্তি হলে ইরানকে ৫০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার যে তথ্য তিনি জানিয়েছেন, তা ডাহা মিথ্যা বলে জানান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে ১০ বছরের জন্য বোমা তৈরিতে বিরত রাখা সম্ভব। কিন্তু যদি পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো চুক্তি না করে, তবে ইরান পুনরায় তার পরমাণু কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। এ বছরের মাঝামাঝি ছয় পরাশক্তির সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। এ চুক্তির ফলে ইরানের ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হবে।

ইরান প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন নমনীয়তার কারণ মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির প্রভাব। অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে কোন বিরোধে জড়াতে আগ্রহী নয় যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্যক অবগত। আইএস ইস্যুতেই দেশ দুটোর অবস্থান অভিন্ন। অন্যদিকে মিত্রদেশ সৌদি আরবও ইরানের সঙ্গে যে কোন চুক্তির বিষয়ে সতর্ক করেছে। প্রয়োজনে সৌদি আরব ইরানে হামলা চালাতে ইসরাইলকে নিজ আকাশসীমা ব্যবহারে অনুমতি দিতেও দ্বিধা করেনি। ইসাইলের মতো সৌদি আরব যে কোন উপায়ে ইরানের প্রভাব রুখতে বদ্ধপরিকর। সম্প্রতি নিজেদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইয়েমেনে শিয়া মিলিশিয়াদের সানা দখল এ মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। যুক্তরাষ্ট্রর এখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ দশা। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুই মিত্র রাষ্ট্রকে নাখোশ করেই দেশটিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে হচ্ছে। কারণ আসাদকে হটাতে ব্যর্থ আমেরিকা ভাল করেই জানে মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির প্রভাব। কিন্তু ইসরাইল এ বাস্তবতা মানতে নারাজ। সৌদি আরবের মতো ইহুদী রাষ্ট্রটি কোনভাবেই ইরানের আস্ফালন দেখতে চায় না।

এতদিন ধারণা করা হতে,া যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ইহুদীরাই মার্কিন রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক ও নিয়ন্ত্রক। মার্কিন কংগ্রেসে বিবির এবারের ভাষণ ও ইরানকে সিনেটরদের চিঠি আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না। বরং মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলের যে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ, তা স্থুলভাবেই উঠে আসে বিবির সফর ও চিঠি প্রদানকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রের এমন অভ্যন্তরীণ বিভাজন অতীতে কখনই প্রত্যক্ষ করা যায়নি।

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫

১১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: