মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ক্রিকেট বসন্তে, এ্যাডিলেড কাব্য

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫
  • তোফায়েল আহমেদ

বিশ্বকাপে এর আগেও বেশ কয়েকটি কাব্য গাঁথার জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ। ৯৯ বিশ্বকাপে নর্দাম্পটন, ২০০৭ বিশ্বকাপে পোর্ট অব স্পেন ও গায়ানা এবং ২০১১ বিশ্বকাপে চট্টগ্রাম সেগুলোর অন্যতম। এর সঙ্গে এবার নতুন যোগ হলো এ্যাডিলেট ওভাল। সব কীর্তির মহিমাই আসলে অনন্য। কিন্তু এ্যাডিলেডের এই জয় কি আলাদা কোন বার্তা বহন করছে? করতে তো পারেই। এ্যাডিলেডেই হয়ত জন্ম হলো নতুন বাংলাদেশের! বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে? নৈরাশ্যবাদীরা এ নিয়ে রসিকতা করতেই পারেন। কিন্তু ইংরেজ সাংবাদিকদের একবার জিজ্ঞেস করুন না কেন তারা ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনটা বর্জন করেছে। এ নিয়ে আসলে তর্ক হতে পারে অনেক। স্বাভাবিকভাবেই তর্ক হচ্ছে ও হবে। তবে বিলেতি সাংবাদিকরা কিন্তু প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের এই জয় আর দশটা ম্যাচের আবরণ থেকে বেরিয়ে অন্য কিছুর বার্তাই বহন করে। স্বাভাবিকভাবেই সেটি ইংল্যান্ড এবং বাংলাদেশ দুই দলের জন্যই। ইংল্যান্ডের জন্য সেই বার্তাটা কী তা সবার জানা হয়ে গেছে রুবেলের বলে এন্ডারসনের উইকেট পতনের পরই। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বার্তাটা কী হতে পারে আপনি কি তা অনুমান করতে পারছেন? এমনিতে স্যার ডন ব্রাডমনের শহরে ক্রিকেটীয় রূপকথার শেষ নেই। বলতে গেলে এ্যাডিলেড ওভালের পরতে পরতে মিশে আছে ক্রিকেটের সর্বকালের সর্বসেরা মহানায়কের নানা স্মৃতি। স্যার ডন ছাড়াও ক্রিকেটের মহারথীদের নানা ঐতিহাসিক কীর্তির সাক্ষী হয়ে আছে এই এ্যাডিলেড ওভাল। সেই এ্যাডিলেডে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই কিনা ইংলিশদের হারিয়ে দিল বাংলাদেশ! তাও আবার বিশ্বকাপের ম্যাচে। নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় যা নতুন সংযোজনই অথচ কে বিশ্বাস করেছিল এমন কিছুর সাক্ষী হবে ক্রিকেটবিশ্ব? স্পিনে দুর্বল এবং সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন পূরণে হয়ত বড় দলগুলোর মধ্য ইংল্যান্ডই প্রধান টার্গেট হয়ে ছিল টাইগারদের। কিন্তু এ ম্যাচে ক’জনই আর বাংলাদেশকে ফেবারিট ভেবেছিলেন? কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না ইংলিশদের। কিন্তু বাটলারের দল তা পারেনি। বরং নানা বিতর্ক নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা দলটিকে এখন না জানি কোন্ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়! ম্যাচ হেরে হয়ত ঘোর অমানিশার মধ্যে পড়ে গেল ইংল্যান্ড। কিন্তু উল্টোটা হলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি তাই হতো না? হয়ত হতো। কিন্তু যেটি হয়নি তা নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ কী! বরং যা হয়েছে তা নিয়ে কথা বলাটাই শ্রেয়। বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ২০০৭ বিশ্বকাপের পর আবারও দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে এটিই এখন মূল বিষয়। ২০০৭ বিশ্বকাপে পাওয়া সাফল্যকে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। সেবার ভারতকে বিদায় করে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছিল বাংলাদেশ। কোয়ার্টার ফাইনালেও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে হারিয়েছিল টাইগাররা। বড় দুটি জয়ের ফলে সেই বিশ্বকাপ এবারের আসরের আগপর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য সুখের সবচেয়ে বড় নাম অথচ সেবারও খুব কম মানুষের মনেই কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার বিশ্বাস ছিল। সাকিব-মুশফিকরা সেবার সেই অসাধ্যকে সাধন করে বিশ্বকে জানান দিয়েছিল নতুন কিছু করার। বলতে গেলে স্মরণীয় সেই ক্যারিবীয় বিশ্বকাপ থেকেই ক্রিকেট বাংলাদেশের দ্রুত উত্থান এবং একটি দল হয়ে ওঠা। বাংলাদেশের উত্থানটা এমনই ছিল যে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত ২০১১ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন পর্যন্ত দেখেছিলেন অনেকে। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। আবার একেবারে খালি হাতেও ফেরেনি বাংলাদেশ। ঘরের মাঠে সেমিফাইনাল বা পরের রাউন্ডে যেতে না পারলেও আয়ারল্যান্ড এবং হল্যান্ডের পাশাপাশি ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে শেষ পর্যন্ত আর কোয়ার্টার ফাইনালটা খেলা হয়নি আসলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি লজ্জাজনক হারে। তাই দর্শকদের সব স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হয়েছিল সেবার। কিন্তু এক আসর পরই আবার পুরনো স্বপ্ন ডানা মেলার উপলক্ষ তৈরি হলো যেন। এই স্বপ্ন বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্ন!

বিশ্বকাপ শুরুর আগে বাংলাদেশের গ্রুপটা বিবেচিত হচ্ছিল গ্রুপ অব ডেথ হিসেবে। তবে এই গ্রুপ থেকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এবং ইংল্যান্ডকেই হিসাবে ধরেছিল সবাই। বাংলাদেশের জন্য তাই গ্রুপ পর্ব পেরোনো ছিল কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জে জিতে বাংলাদেশ এখন নতুন স্বপ্ন দেখতেই পারে। বিশ্বকাপের আগে টাইগার কোচ হাতুরাসিংহে বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রথমিক লক্ষ্য কোয়ার্টার ফাইনাল। সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এরপর ম্যাচ বাই ম্যাচ চিন্তা করব।’ হাতুরাসিংহে আসলে সেদিন অনেক বড় কিছুরই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। মুখে না বললেও সেটি যে সেমিফাইনাল তা সহজেই অনুমান করা যায়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগেও এটিকে অলিক স্বপ্ন বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এ ম্যাচের পর এখন সবাই নিশ্চয়ই নড়ে চড়ে বসবে। সেমিফাইনালের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ভারতকে হয়ত এ জন্যই সতর্ক করে দিচ্ছেন সুনীল গাভাস্কার, ‘ওদের মোটেও হাল্কাভাবে নেয়ার উপায় নেই। এই কন্ডিশনে ওদের ব্যাটিংটা খুব ভাল হচ্ছে।’ কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতই যদি প্রতিপক্ষ হয় তবে ম্যাচে তারাই ফেবারিট এটা মেনে নিতেই হবে। কিন্তু ২০০৭ সালের পোর্ট অব স্পেনের পুনরাবৃত্তি যে আবার হবে না তার কী কোন নিশ্চয়তা দিতে পারেন আপনি? বিশ্বকাপ নিয়ে জনকণ্ঠের বিশেষ আয়োজনে প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ বলেছিলেন, ‘২০০৩ বিশ্বকাপটা খারাপ ছিল, ২০০৭ ভাল হয়েছে। ২০০৩ বিশ্বকাপের আগে ’৯৯ বিশ্বকাপটা ভাল গেছে আবার ২০০৭ ভাল কিন্তু ২০১১ খারাপ। তাই সেই দিক থেকে চিন্তা করলে আমি বলব আমাদের এবারের সম্ভাবনা খুবই ভাল...।’ সম্ভাবনা ভাল এটি আর এখন নতুন করে বলার নয়। বলার বিষয় আসলে সম্ভাবনাটা কতটা ভাল? ফারুক আহমেদের কথার সূত্র ধরেই বলতে হয় ’৯৯ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের আনন্দ ছাড়া তেমন কিছু চাওয়া ছিল না দর্শকদের। কিন্তু সেবার পুরো বিশ্বকে বিস্ময় উপহার দিয়েছিল বাংলাদেশ। ২০০৭ বিশ্বকাপেও কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার স্বপ্ন খুব কম লোকই দেখেছিলেন। কিন্তু সেবার শুধু কোয়ার্টার ফাইনাল খেলাই নয়, ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকাদের মতো মহাশক্তিধরদের হারিয়ে টুর্নামেন্টের অন্যতম সফল দল ছিল বাংলাদেশ। তাহলে এবার ’৯৯ কিংবা ২০০৭ বিশ্বকাপের মতো স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা তো ঘটতেই পারে। সেটি হলে দেশের ক্রিকেটে জোর হাওয়া লাগবে। যেমনটা লেগেছিল ক্যারিবীয় বিশ্বকাপে। বলা হচ্ছে সামনে খুব কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য। ছোট দলগুলোকে ছেঁটে ফেলে নতুন ফরমেটে দশ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করলে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে টাইগারদের। এই বিশ্বকাপ থেকেই হোক না সেই চ্যালেঞ্জের শুরু। এই বসন্তে বিশ্বকাপই হতে পারে নতুন স্বপ্ন যাত্রা শুরুর বড় মঞ্চ। নিজেদের উজ্জীবিত রেখে কোয়ার্টার ফাইনলে কেবল প্রতিপক্ষকে ধরে দিতে পারলেই হয়। এরপর কী হবে তা আর লেখার দরকার আছে? শুধু এটুকু জেনে রাখুন এই ক্রিকেট বসন্তে এমন কিছু ঘটলে পরের স্বপ্নটা হবে কেবলই সোনালি রঙের কাপটাকে মুঠোবন্দী করার স্বপ্ন। যা আমাদের সুদূর কল্পনাতেও ছিল না। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস এমনই। অতীতে স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা কতবার ঘটেছে। আরেকবার ঘটলে বিস্ময়ের আর কী আছে!

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫

১১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: