কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রুবেল- রূপকথার নায়ক

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫
রুবেল- রূপকথার নায়ক
  • মোঃ মামুন রশীদ
  • দু-একটি বলই যথেষ্ট পুরো জাতিকে আনন্দের জোয়ারে ভাসাতে
  • দুটি বলেই বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষকে উচ্ছ্বাসে ভাসালেন রুবেল
  • তাঁর গতির তোপে উড়ে গেল ইংল্যান্ড

মাত্র চারটি বল বদলে দিল সব! সব শঙ্কা কাটিয়ে বাংলাদেশ দল উঠে গেল বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনালে, এক ম্যাচ বাকি থাকতেই। আর সেটা চার বলের ম্যাজিকেই করে ফেললেন বাংলাদেশের পেসার রুবেল হোসেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় এক বিজয় এনে দিলেন অস্ট্রেলিয়ার এ্যাডিলেড ওভাল মাঠে। প্রথম স্পেলে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা ইয়ান বেল ও ইংলিশ অধিনায়ক ইয়ন মরগানকে সাজঘরে ফেরত পাঠালেন এক ওভারে। দ্বিতীয় স্পেলে এসে আরেক ওভারে সরাসরি বোল্ড করে তিনি স্টুয়ার্ট ব্রড ও জেমস এ্যান্ডারসনকে ফিরিয়ে দিয়ে ১৫ রানের জয় এনে দিলেন বাংলাদেশকে। অনেক পরিসংখ্যান, হিসাব-নিকাশের ম্যাচটা নিয়ে আগে থেকেই ছিল উত্তেজনার পারদ। সেটা আরও টানটান হয়ে উঠল ম্যাচ শুরুর পর। সব উত্তেজনা শেষ করে দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর এক ম্যাচ জিতিয়ে দিলেন রুবেল দুই ওভারের ম্যাজিকে। করলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা বোলিং নৈপুণ্যের রেকর্ড। তাঁর বিধ্বংসী বোলিংয়ের কারণে বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো গ্রুপপর্ব থেকেই ছিটকে গেল ক্রিকেটের জনক দেশ ইংল্যান্ড। দু-একটি বলই যথেষ্ট পুরো এক জাতিকে আনন্দের জোয়ারে ভাসানোর জন্য। দুটি বলেই পুরো বাংলাদেশের ষোলো কোটি ক্রিকেটপ্রেমীকে উচ্ছ্বাসে ভাসালেন পেসার রুবেল। যে প্রাপ্তির আশায় বুক বেঁধেছিল বাংলাদেশ দল, সেটা একাই করে দিলেন এ পেসার। তাঁর গতির তোপের কাছে নতজানু হলো শক্তিশালী ইংল্যান্ড। একই ম্যাচে দুটি ম্যাজিক দেখালেন রুবেল। প্রথম ম্যাজিক ২৭তম ওভারের প্রথম বলে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা ইয়ান বেলকে উইকেটের পেছনে ক্যাচে পরিণত করে এবং চতুর্থ বলে ইংলিশ অধিনায়ক ইয়ন মরগানকে সাকিব আল হাসানের ক্যাচে পরিণত করে ঘুরিয়ে দিলেন ম্যাচ। আর দ্বিতীয় ম্যাজিক ৪৯তম ওভারের প্রথম ও তৃতীয় বলে স্টুয়ার্ট ব্রড ও জেমস এ্যান্ডারসনকে সরাসরি বোল্ড করে। রুবেলের ম্যাজিক দুটিই ইংল্যান্ডের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিল আর বাংলাদেশকে ভাসালো বিজয়ের আনন্দে। ৯.৩ ওভারে ৫৩ রান দিয়ে রুবেল শিকার করেন ৪ উইকেট। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে তৃতীয় সেরা বোলিং নৈপুণ্য এটি। আর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে বাংলাদেশী কোন বোলারের সেরা বোলিং নৈপুণ্য। এর আগে ২০১০ সালের ১২ জুলাই বার্মিংহামে মাশরাফি বিন মর্তুজা ৩১ রানে ৩ উইকেট শিকার করেছিলেন ইংলিশদের বিরুদ্ধে। আর বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে তৃতীয় সেরা বোলিং এটি। গত বিশ্বকাপে হল্যান্ডের বিরুদ্ধে শফিউল ইসলাম ২১ রানে এবং ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে মাশরাফি ৩৮ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন। সুদূর অস্ট্রেলিয়ার এ্যাডিলেড ওভালে শুধু লাল-সবুজের পতাকা মর্যাদার সঙ্গে পতপত করে উড়ল রুবেলের ওই দুটি বলের কারণে। ইংলিশদের ২০১১ বিশ্বকাপের পর আবারও পরাজিত করে স্বপ্নের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেল বাংলাদেশ দল।

দুর্দান্ত ব্যাটিং করছিলেন ক্রিস ওকস। বাংলাদেশের স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে দেয়ার সব বন্দোবস্ত একাই করে যাচ্ছিলেন। তবে ৪৮তম ওভারে তাঁকে বধ করেই ফেলেছিলেন তরুণ পেসার তাসকিন আহমেদ। লং-অনে ক্যাচ তুলে দিলেও সহজ সেই ক্যাচটা ধরতে পারেননি তামিম ইকবাল। মুষড়ে পড়েছিলেন এ্যাডিলেডে উপস্থিত বাংলাদেশী ক্রিকেটপ্রেমী দর্শক-ভক্তরা। সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় খেলা চললেও টিভির পর্দায় দুরু দুরু বুকে জয়ের জন্য অপেক্ষা করা বাংলাদেশীরাও নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ ওকস আউট হলেই প্রায় নিশ্চিত হয়ে যেত বাংলাদেশের জয়টা। কিন্তু তামিম ক্যাচটা ছেড়ে দেয়ার কারণে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা গ্রাস করে ফেলেছিল পুরো বাংলাদেশকে। শেষ দুই ওভারে জয়ের জন্য মাত্র ১৬ রান প্রয়োজন ইংল্যান্ডের। শেষ দুই ওভারে বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন বাস্তব করার দায়িত্ব পড়ে রুবেল আর তাসকিনের ওপর। ৪৯তম ওভারে অভিজ্ঞ রুবেলের ওপরই দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকল সবার। বড় দলের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে দুরন্ত বোলিং করে দলকে জেতানোর অতীত রেকর্ডও ছিল এ পেসারের।

২০১০ সালে প্রথমবার রুবেলের গতির ছোবলটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল বাংলাদেশ সফরকারী নিউজিল্যান্ড। সেবারই প্রথম কোন ওয়ানডে সিরিজে টেস্ট খেলুড়ে বড় কোন দলকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। ২০১০ সালের ১৭ অক্টোবর পঞ্চম ওয়ানডেতে ২৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে জিতিয়েছিলেন রুবেল। দারুণ ব্যাটিং করে পেসার কাইল মিলস একাই জিতিয়ে দিচ্ছিলেন কিউইদের। কিন্তু তাঁকে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে সরাসরি বোল্ড করে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন রুবেল। একই কা- তিনি ঘটান তিন বছর পর একই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর দারুণ ব্যাটিং করতে থাকা গ্র্যান্ট ইলিয়টকে বধ করে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন রুবেল। ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে সেদিন দখল করেন মাত্র ২৬ রানে ৬ উইকেট। এছাড়া ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ঢাকায় ৩৩ রানে ৪, ২০১১ সালে বুলাওয়েতে জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে ৩১ রানে ৪ উইকেট শিকার করে দলকে জিতিয়েছিলেন। রুবেল আছেন, স্বপ্ন বেঁচে আছে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জিতলেই কোয়ার্টার নিশ্চিত, প্রায় জয়ের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ। মোক্ষম সুযোগটা আর আসবে না। বাংলাদেশের দেয়া ২৭৬ রানের লক্ষ্যটাকে ছোট করে ফেলছিলেন ভয়ানক হয়ে ওঠা বেল ৬৩ রান করে। ততক্ষণে তেমন কিছুই করতে পারেননি রুবেল, ৫ ওভারে উইকেটশুন্য থেকে দিয়ে ফেলেছিলেন ২৯ রান। বিধ্বংসীরূপে আবির্ভূত হলেন তখনই। ২৭তম ওভারের প্রথম বলে বেলকে এবং চতুর্থ বলে মরগানকে শিকার করলেন। অতীত রেকর্ড এবং এ্যাডিলেডে ম্যাচের ভাগ্য বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য তাইতো রুবেলের ওপর ছিল প্রত্যাশা। ৪৯তম ওভারে ব্যাটিংয়ে ব্রড। মাথা ঠা-া রাখলেন রুবেল। এ্যাডিলেডবাসী এবং পুরো বিশ্ববাসী চমকপ্রদ এ ম্যাচটির দিকে তাকিয়েছিল। কারণ ‘এ’ গ্রুপ থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার ম্যাচ ছিল এটিই। সবাই সাক্ষী হলেন আকর্ষণীয় এক ম্যাচের। সবার মনে ঠাঁই করে নেয়ার মতো একটি বোলিং নৈপুণ্য দেখালেন রুবেল। পুরো বাংলাদেশ, এ্যাডিলেড এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অসংখ্য ক্রিকেট ভক্ত-সমর্থকরা আনন্দে ভেসে উঠলেন। জিতে গেল বাংলাদেশ ১৫ রানে।

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫

১১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: