মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিঃশব্দতার চাপাতি ও জীবন বাঁচাতে জীবন

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫
  • ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন

দিনে-দুপুরে কাশিমপুর কারাগার থেকে নেয়ার পথে ভ্যানের পুলিশ গার্ডকে খুন করে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তিনদুর্ধর্ষ জঙ্গীর পলায়ন, ব্লগার রাজীব হত্যায় উস্কানিদাতা হিসেবে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গী শফিউর রহমান ফারাবীর হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ, পরে শিবির ক্যাডারদের নেতা এই ফারাবীই অভিযোগে চট্টগ্রাম শহরে দুই কিশোর ব্লগার রায়হান রাহী ও উল্লাস দত্তের গ্রেফতার, ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’ অনুষ্ঠানে ইসলামী ব্যাংকের ভিক্ষামুষ্টি ও প্যারেড গ্রাউন্ডের সেই অনুষ্ঠানে জামায়াতী মালিকানার ‘ইবনে সিনার’ পক্ষ থেকে স্যালাইন প্রদান, পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচিত সভাপতি ড. মুশফিকের জঙ্গী শিবির ক্যাডারদের আক্রমণে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পরও আঞ্চলিকতার ধুয়া তুলে মূল পরিকল্পনাকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতী শিক্ষকদের বাদ দিয়ে পুলিশের দুর্বল চার্জশীট প্রদানÑ এসব গুরুতর ঘটনার ত্বরিত প্রতিবিধান করে ‘শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমনে’ রাষ্ট্রকে খড়গহস্ত করার জন্য স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলাম।

এক.

অভিজিত হত্যার পর ফারাবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সালের ৩ এপ্রিল তারিখে আমার প্রকাশিত আবেদন ছাড়াও তার আগে পরে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটেজি ফোরাম (আইসিএসএফ), ব্লগার্স কমিউনিটি এলায়েন্স, গণজাগরণ মঞ্চ, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি এবং বিশিষ্টজনরা কত আবেদন করেছেন সরকারের কাছে। তাতে সাড়া দিলে হয়ত বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন ড. অভিজিতকে জামায়াতী জঙ্গীদের চাপাতির আঘাতে জীবন দিতে হতো না।

এসব ভেবে মন বড় বিষণœ হলো। একটু রাত হয়েছে, তারপরও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রিকশায় অজয় স্যারের সঙ্গে দেখা করতে রওনা হই। ফুলার রোড থেকে ভিকারুননিসা স্কুল দূর নয়। জানি তার সামনের একটি হাউজিং সোসাইটির ফ্ল্যাটে থাকেন ড. অজয় রায়। ১৯৬৭-৬৮, এই দু’বছর ফিজিক্স সাবসিডিয়ারিতে স্যার সরাসরি আমার শিক্ষক ছিলেন। ১৯৭০-৭১-এ অজয় স্যার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। রিকশায় পথ চলতে চলতে মুহূর্তে মন চলে যায় গত কয়েকদিনে দ্রুতলয়ে ঘটে যাওয়া নির্মম দৃশ্যাবলীতে। স্কাইপে ছেলের কাছ থেকে সংবাদটি শুনে ফুলার রোড থেকে মেডিক্যালের দিকে রওনা হয়েছি। রিকশা নেই, জোরে হাঁটছি।

কিছুদূর চলার পর খালি একটি রিকশা পেয়ে যাই। তাই মেডিক্যালে পৌঁছে যাই দ্রুতই। গভীর বিষাদ, শঙ্কা ও ক্ষুব্ধতা মেশানো চেহারার মানুষজনকে দেখি ইমারজেন্সির বাইরে, ভেতরে। এত মানুষের ভিড়ে কেমন এক চাপা নিস্তব্ধতা। ইমারজেন্সি অপারেশন কক্ষে ট্রলির ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছেন অভিজিত। মাথায় ব্যান্ডেজ। চাদর সরিয়ে মুখটি দেখান তরুণ ডাক্তার। ছোট্ট ঘরটির মেঝেতে শুধু রক্ত। ডাক্তার বললেন, “এই অল্প আগে মারা গেছেন। ধারালো চাপাতির কোপে মাথার একপাশের খুলি হাড়সহ আলাদা হয়ে গিয়েছিল। মগজও বেরিয়ে এসেছিল তা দিয়ে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হওয়ার কথা। খুব ভাল স্বাস্থ্য বলে এখানে পৌঁছা অবধি জীবন ছিল।” গভীর বিষাদে আরও বললেন ডাক্তার, “তার স্ত্রীর মাথায়ও চাপাতির গুরুতর আঘাত ছিল। হাতের একটি আঙ্গুল ছিল না। মাথা ও হাত থেকে রক্তে পোশাক ভিজে যাচ্ছিল। কিন্তু নিজে কোন চিকিৎসা না নিয়ে পুরো সময়টা তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বামীর পাশে। জানি না তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা। নিউরোলজি ওয়ার্ডে নিয়ে গেছে সিটিস্ক্যান করতে।”

নিউরোলজি ওয়ার্ডটি দূরে নয়। করিডরে অনেকের ভিড়ে অজয় স্যারকে দেখি। অভিজিতের মতো সন্তান হারিয়েছেন এই পিতা। ড. আবুল বারকাত পাশে আছেন। স্যার ফোন করছেন নানা জায়গায়। তাঁকে জড়িয়ে ধরি। “আনোয়ার, তুমি তো ভিসি ছিলে, প্রধানমন্ত্রীর পিএসকে ফোন কর। ওকে বাঁচাতে হলে ভাল হাসপাতালে পাঠাতে হবে।”

হায়রে, পুত্রের মৃত্যু সংবাদ এখনও তিনি জানেন না।

চুপ করে থাকি। মিথ্যা আশ্বাস দিতে ইচ্ছা হয় না। বেষ্টনীর ওপারে দুটো চেয়ার আছে। কিন্তু পায়া শেকল দিয়ে বাঁধা। ভেতর থেকে একজন একটি টুল বের করে দেয়। স্যার যেন একটু বসতে পারেন।

“ওখানে অপারেশন শেষ হয়নি? বন্যার সিটি স্ক্যান তো এখনও হলো না।”

স্যারের এসব আর্ত জিজ্ঞাসায় তেমন উত্তর কেউ দেয় না। এর মধ্যে নিউরোলজির ইমারজেন্সি থেকে ট্রলি বেরিয়ে আসে। কাত হয়ে বন্যা শুয়ে আছেন। মাথায় ব্যান্ডেজ। লাল কামিজ আরও লাল হয়েছে রক্তে। নিজের ও অভিজিতের রক্ত। কেমন কু-লি হয়ে শান্ত মেয়েটির মতো যেন ঘুমিয়ে পড়েছেন। ট্রলি যাবে সিটিস্ক্যান করাতে। করিডরের দরজায় জোরে ধাক্কা খেল ট্রলি। বন্যা নিঃশব্দ।

আরও মানুষজন আসছেন। জেনে গেছেন সবাই। অভিজিত আর নেই। টিভি স্ক্রলে তা দেখেই ছুটে আসছেন। মধ্যবয়সী টকটকে ফর্সা মানুষটি বারবার তাকাচ্ছিলেন আমার দিকে। বিষাদের প্রতিমূর্তি। অজয় স্যারের মতোই চেহারা।

“আপনি কি স্যারের কেউ হন?”

আমার এ জিজ্ঞাসায় ভদ্রলোক বলেন,

“না না আমি আশরাফ। সেনাবাহিনীর রিটায়ার্ড ব্রিগেডিয়ার।”

তারপর চিৎকার করে বলেন,

“ওই পশুরা কি জানে কাকে তারা মেরে ফেলেছে? তাঁর নখের সমান কি হতে পারবে তারা? এমন একজন মানুষ কি আর পাওয়া যাবে?”

করিডর ভর্তি মানুষ নির্বাক হয় সেই আহাজারি শুনে।

যখন অজয় স্যারের ফ্ল্যাটে পৌঁছেছি তখন রাত ৯টা বেজে গেছে। শুনলাম, স্যার একটু ঘুমিয়ে পড়েছেন। চারদিন আগে প্রায় এ সময় অভিজিত ও তাঁর স্ত্রী বন্যা বইমেলা থেকে বের হয়েছেন। মনে বড় একটি প্রশ্ন ছিল। যেখানে খোলাখুলি ব্লগে জানান দিয়ে ফারাবীর মতো জঙ্গীরা তাঁর মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষণা করেছে; মায়ের সাথে দেখা করবেন এবং বইমেলা ঘুরে যাবেন, তার জন্য পুত্র ও পুত্রবধূর দেশে আসবার পরিকল্পনা শুনে পিতা অজয় রায় যেখানে বলেছেন, দেশে অবরোধ-হরতালে মানুষের করুণ মৃত্যুর কথা, দুঃসময়ের কথা এবং তাই সম্ভব হলে যাত্রা স্থগিত করতে, সেখানে কোন বিবেচনায় অভিজিত ও বন্যা এত রাত করে হেঁটে বইমেলা থেকে ফিরছিলেন? আমার এমন কথায় অভিজিতের ছোট ভাই ও তার স্ত্রী জানালেন ভিন্ন কথা।

“ওরা সাবধানেই চলাফেরা করত। গাড়িতে মেলায় যেত। সেদিনও অল্প দূরেই তাদের গাড়ি পার্ক করা ছিল।”

রাজু ভাস্কর্যের উত্তর কোণায় যেখানে ডাঃ মিলনের স্মৃতি ভাস্কর্যটি আছে তার উল্টোদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘেঁষে ফুটপাথটি ঘাতকরা বেছে নিয়েছিল। এখানে ফুটপাথ একটু বাঁকা হয়ে একটা ব্লাইন্ড স্পট তৈরি করেছে। একদম কাছে উদ্যানের প্রবেশপথের বাম পাশের বটগাছটির নিচে অপেক্ষমাণ পুলিশের দৃষ্টির আড়ালে পড়ে গেছে ঘাতকদের বেছে নেয়া ব্লাইন্ড স্পটটি। ঘাতকরা নিশ্চয়ই অভিজিতকে অনুসরণ করেছে। দেখেছে কোথায় তাঁর গাড়িটি পার্ক করা ছিল। তার অদূরেই ব্লাইন্ড স্পটে তারা অপেক্ষা করেছে। ওরা কি শুধু দু’জন ছিল, যারা চাপাতির কোপে অভিজিতের মাথার খুলির কিছু অংশ কেটে ফেলেছিল? তা নিশ্চয়ই নয়। মোবাইলে অপেক্ষমাণ ঘাতকরা বার্তা পেয়েছে, টার্গেট এগিয়ে আসছে। শব্দ সৃষ্টিকারী আগ্নেয়াস্ত্র তারা ব্যবহার করেনি। প্রশিক্ষিত পাকা হাতে মাথায় চাপাতির নিঃশব্দ আঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত করে সরে পড়েছে দ্রুত। যতদূর জানা গেছে, একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। অন্যজন একই ফুটপাথ ধরে মানুষের ভিড়ে। আর অল্প কিছুদূর। তারপরই অভিজিত ও বন্যা হয়ত পার্ক করা গাড়িতে উঠে বসতে পারতেন। সে সুযোগ দেয়নি ঘাতকরা।

‘বাংলার চোখ’ ফটো এজেন্সির তরুণ ফটো সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম জীবন। মাত্র ছ’মাস হলো সে এ পেশায় ঢুকেছে। তার তোলা ছবিটি নিয়ে কথা হলো। রক্তে ভেজা বন্যা দাঁড়িয়ে আছেন। তার সামনে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন স্বামী ও সাথী অভিজিত। খুলির একটি অংশ নেই। কিছু মানুষ হাঁটাচলা করছে। যেন কিছুই হয়নি। ডয়েচে ভ্যালে টিভি চ্যানেলে প্রচারিত ফুটেজে দেখলাম মধ্যবয়সী বাঙালী মহিলা দারুণ ক্ষোভে বলছিলেন,

“চিৎকার করে বলেছি, ওদের ধরেন। কেউ আগায় আসে নাই।”

ওই ঘাতক দু’জনের চারপাশে যারা ছিল তারা হয়ত ওদের দলেরই। এও শোনা গেছে, স্পটের কাছাকাছি অস্থায়ী কয়টি দোকানও জঙ্গী জামায়াতী সংগঠনের।

কথা হয়েছিল জীবনের সঙ্গে। সে ও তার বন্ধু ফোকাস বাংলার ফটো সাংবাদিক রহমান সেদিনের কাজ শেষে স্পটের কাছেই উদ্যানের বেষ্টনীর ওপাশে চা খাচ্ছিল। এক নারীর আর্তচিৎকার শোনে তারা। বেষ্টনীর গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে ফুটপাথের পাশে রাখা একটি মোটরসাইকেলের ওপর এক নারীকে তারা পড়ে থাকতে দেখে। এরপর ফুটপাথে একজন পুরুষকেও উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তারা। তার মাথার খুলির একটি অংশ ছিল না। রক্তে ফুটপাথ ভেজা। মগজের কিছু অংশ পড়ে ছিল সেখানে। উদ্যানের গেট দিয়ে বেরিয়ে স্পটের কাছে আসে তারা। রহমানের অভিজ্ঞতার বয়স মাত্র তিন মাস। ফটো সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণে শেখানো হয়েছে, তাদের কাজ হলো ঘটনার ছবি তোলা, তাতে জড়িয়ে পড়া নয়; বিপন্নজনকে বাঁচানোও নয়। দ্রুত কাজ শেষে অকুস্থল ত্যাগ করে অফিসে রিপোর্ট করাই তাদের একমাত্র কর্তব্য। রহমান তাই করেছিল। দুটো ছবি তুলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিল দ্রুত। সদ্য শেখা প্রশিক্ষণের কথাকেই হয়ত সে গুরুত্ব দিয়েছে। খুব ঘাবড়েও গিয়েছিল সে। জীবন তা করতে পারেনি। (চলবে)

প্রকাশিত : ১১ মার্চ ২০১৫

১১/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: