আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্ব জন্মত্রুটি দিবস ॥ সমকালীন ভাবনা

প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০১৫

আবির-নওরীনের দু’বছরের সংসার আলো করে এলো ফুটফুটে কন্যাসন্তান আদৃতা। বহু কাক্সিক্ষত সন্তান যখন গর্ভে আসে, আবির-নওরীনের আনন্দের সীমা থাকে না। প্রথম থেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তাঁরা। পুরো নয় মাসের সময়টা শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের সঙ্গেই দেখা যায় উত্তেজনা আর স্বপ্নের মিশেলে কেটে গেল দ্রুত। কিন্তু এ কী? শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পিঠের নিম্নভাগে মাঝামাঝি স্থানে দৃশ্যমান চাকার মতো একটি মাংসপি-। মায়ের কোলে দেয়া সম্ভব হয়নি আদৃতাকে। তৎক্ষণাৎ নিতে হলো নবজাতক ওয়ার্ডে। চলল পরীক্ষা-নিরীক্ষা। চিকিৎসক জানালেন, আদৃতার মস্তিষ্কেও সমস্যা, পানি জমেছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা করতে হবে।

ওপরের কাল্পনিক দৃশ্যপটটি আর কিছুই নয়, এটি একটি জন্মত্রুটি আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারের কাহিনী। শিশুর জন্মের সময় ছোটবড় যে কোন ধরনের ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক যে ত্রুটি দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে ঠোঁটকাটা, তালুকাটা, পায়ের গোড়ালি বাঁকা ইত্যাদি। তাছাড়া কিছু শিশু হƒৎপি-ে অস্বাভাবিক ছিদ্র নিয়ে জন্মাতে পারে? যা সাধারণভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না। স্টেথোস্কোপের মাধ্যমে শারীরিক পরীক্ষা ও ইকোকার্ডিওগ্রামের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়। আবার অনেক সময় ছোট ছোট জন্মত্রুটি যেমন, কানের সামনে একটি ছোট মাংসপি-, হাতে অথবা পায়ে একটি অতিরিক্ত আঙ্গুল ইত্যাদি দেখা যায়, যা তেমন মারাত্মক নয়। এছাড়া, আরও অনেক জন্মত্রুটি রয়েছে, যেগুলো বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, প্রতি ৩৩টা নবজাতকের মধ্যে একজন কিছু না কিছু জন্মত্রুটি নিয়ে জন্মায়। সে হিসেবে বছরে সারাবিশ্বে প্রায় ৩২ লাখ শিশু জন্মত্রুটিজানিত বিকলাঙ্গতায় ভোগে। এদের মধ্যে ২ লাখ ৭০ হাজার শিশু জন্মের প্রথম মাসের মধ্যেই মারা যায়।

কারণ কি?

সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ ক্ষেত্রেই জন্মত্রুটির কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যদের ক্ষেত্রে কিছু কিছু কারণ গবেষণার মাধ্যমে নির্ণয় করা গেছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নে আলোচিত হলো-

১. আর্থ-সামাজিক অবস্থা : তীব্র ধরনের জন্মত্রুটিগুলোর প্রায় ৯৪ শতাংশই মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশেই ঘটে থাকে। এটি বোধগোম্য যে, এসব দেশের মায়েরা নানা ধরনের পুষ্টিহীনতা ও সংক্রমণজনিত সমস্যায় ভোগেন বেশি। তাছাড়া মায়ের বয়স বেশি হওয়ার কারণে, ডাউন সিনড্রোম নামক একটি জন্মত্রুটি অধিক হারে দেখা যায়।

২. মায়ের অসুস্থতা : গর্ভাবস্থায় মা যদি কিছু অসুস্থতায় ভোগেন, তাহলে গর্ভজাত শিশুটি জন্মত্রুটিতে আক্রান্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, থাইরয়েডজনিত সমস্যা ইত্যাদি অসুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

৩. বংশগত : নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলে সন্তানের মধ্যে বিরল বংশগত কিছু রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে মা-বাবা উভয়েই রোগটির অস্তিত্ব প্রচ্ছন্নভাবে ধারণ করেন। আর দুজনের মিলিত প্রচ্ছন্ন লক্ষণ শিশুর মধ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে।

৪. সংক্রমণজনিত রোগ : গর্ভাবস্থায় বিশেষ করে গর্ভের প্রথমাংশে মা বিশেষ কিছু জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে গর্ভস্থ ভ্রণটি আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক বিকলাঙ্গ হয়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে রুবেলা, জলবসন্ত ইত্যাদি জীবাণুর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

৫. মায়ের পুষ্টিজনিত সমস্যা : মায়ের পুষ্টিহীনতা অথবা স্থূলকায় শরীর- দুই ক্ষেত্রেই শিশু জন্মত্রুটি নিয়ে জন্মানোর আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া শরীরে ফলিক এসিড, আয়োডিন ইত্যাদির ঘাটতির জন্যও শিশু মারাত্মক জন্মত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে।

প্রতিরোধ

যদিও অনেক ক্ষেত্রেই জন্মত্রুটি প্রতিরোধ করা সহজ নয়, তবু বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মোটের ওপর এই প্রাণঘাতী সমস্যাগুলো থেকে অনেক ক্ষেত্রে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

প্রজননক্ষম নারীদের সবসময়ই পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। খাবার পছন্দের ক্ষেত্রে খাবারের সব উপাদান বিশেষ করে ভিটামিন ও খনিজ নিশ্চিত করতে হবে। ফলিক এসিড গর্ভের আগে ও গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। ডায়াবেটিস ধরা পড়লে তার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। রক্তে গ্লুকোজের অস্বাভাবিক মাত্রা শিশুর জন্মত্রুটির কারণ হতে পারে। তাছাড়া অন্য অসুখ-বিসুখ (যথা হাইপোথাইরয়েডিজম) থাকলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা করানো অত্যাবশ্যক।

কিছু রোগের বিরুদ্ধে টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে- যাতে করে গর্ভকালে ওই রোগের মাধ্যমে শিশুর জন্মত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

জন্মত্রুটি কোন অভিশাপ নয়। গণ-সচেতনতার মাধ্যমে অনেক জন্মত্রুটিই প্রতিরোধ করা সম্ভব। অধিকাংশ জন্মত্রুটিই উপযুক্ত ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিলে জটিলতা পরিহার করে স্বাভাবিক অথবা প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সক্ষম দম্পতি, তথা জনসাধারণ ও চিকিৎসকের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।

এ লক্ষ্যে বিশ্বের ১২টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এ বছর ৩ মার্চ প্রথম ‘বিশ্ব জন্মত্রুটি দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। প্রতিবছর এ দিবস পালনের মাধ্যমে জন্মত্রুটি আক্রান্ত শিশুদের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করা, তাদের সমস্যার সমাধানে করণীয়, নতুন উদ্ভাবিত চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যবহার, সর্বোপরি এ সমস্ত বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিই হবে দিবসটি পালনের প্রধান উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় বিএসএমএমইউসহ দেশের ৮টি বড় হাসপাতালে জন্মত্রুটি সার্ভিলেন্স নামে একটি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় এই হাসপাতালগুলোতে জন্ম নেয়া ও চিকিৎসার জন্য আগত জন্মত্রুটি আক্রান্ত শিশুদের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে করে আমাদের দেশে জন্মত্রুটির একটি সাধারণ চিত্র পাওয়া যাবে আশা করা যায়। ফলশ্রুতিতে জন্মত্রুটির সম্ভাব্য কারণ নির্ণয় করে এর প্রতিকারের উদ্যোগ গ্রহণে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। এ বিষয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন যেমন- বাংলাদেশ পেরিনেটাল সোসাইটির উদ্যোগে সভা, সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা

চেয়ারম্যান, নবজাতক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

ডা. অর্জুন চন্দ্র দে

সহযোগী অধ্যাপক, নবজাতক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যাল।

প্রকাশিত : ১০ মার্চ ২০১৫

১০/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: